- readaim.com
- 0
উত্তর।।প্রস্তাবনা: আমাদের দৈনন্দিন জীবনে চলার পথে আমরা প্রতিনিয়ত এমন অনেক নিয়মনীতির সম্মুখীন হই যা আমাদের আচার-আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই নিয়মকানুনগুলো সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং সকলের অধিকার নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। এই সমস্ত নিয়মনীতির সমষ্টিকেই আমরা সাধারণত আইন বলে থাকি। আইন ছাড়া একটি সুসংগঠিত সমাজ কল্পনা করা কঠিন, কারণ এটি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে।
শাব্দিক অর্থ আইন শব্দটি আরবি ‘আইন’ (عين) শব্দ থেকে এসেছে, যার আভিধানিক অর্থ হল – নিয়ম, বিধান, কানুুন, রীতি, পদ্ধতি, নীতি, ইত্যাদি। ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Law’।
পরিচয় আইন হলো এমন কিছু প্রতিষ্ঠিত নিয়ম বা বিধান, যা রাষ্ট্র বা নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত ও স্বীকৃত এবং যা ভঙ্গ করলে শাস্তির বিধান থাকে। এটি সমাজের প্রতিটি স্তরে ব্যক্তির আচরণ, অধিকার, কর্তব্য এবং রাষ্ট্রের সাথে তার সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করে। আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, শান্তি বজায় রাখা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা।
সাধারণ ভাষায় আইন সাধারণভাবে আমরা আইন বলতে বুঝি কিছু অবশ্য পালনীয় নিয়মকানুন, যা মেনে চললে সমাজে শান্তি বজায় থাকে এবং মেনে না চললে শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। এটি যেন একটি অদৃশ্য বাঁধন যা আমাদের সবাইকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখে এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়। যখন কেউ আইন অমান্য করে, তখন তাকে তার কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হয়, যা থেকে অন্যরা শিক্ষা গ্রহণ করে।
১. জন অস্টিন (John Austin): “আইন হলো একজন সার্বভৌম শাসকের আদেশ, যা আনুগত্যের শর্তাধীন।” (Law is a command of a sovereign, backed by a sanction.)
২. স্যার জন সালমন্ড (Sir John Salmond): “আইন হলো ন্যায়বিচারের প্রশাসন পরিচালনার জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত ও প্রয়োগকৃত নীতিসমূহের সমষ্টি।” (Law is the body of principles recognized and applied by the state in the administration of justice.)
৩. হোমল্যান্ড ডিফিনেশন (Holland’s Definition): “আইন হলো মানুষের বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত সাধারণ নিয়মাবলী।” (Law is a general rule of external human action enforced by the sovereign political authority.)
৪. উইলিয়াম ব্ল্যাকস্টোন (William Blackstone): “আইন হলো একটি উচ্চতর শক্তি কর্তৃক নিম্নতর শক্তির জন্য নির্ধারিত একটি বিধি।” (Law is a rule of action prescribed by some superior, and which an inferior is bound to obey.)
৫. হান্স কেলসেন (Hans Kelsen): “আইন হলো বাধ্যবাধকতা আরোপকারী কিছু আদর্শিক নিয়ম, যা একটি মৌলিক নর্ম থেকে উদ্ভূত।” (Law is a system of norms, coercively enforced, ultimately derivable from a basic norm.)
৬. রস্কো পাউন্ড (Roscoe Pound): “আইন হলো সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সামাজিক প্রকৌশল।” (Law is a social engineering for the establishment of social control.)
৭. অ্যারিস্টটল (Aristotle): “আইন হলো নিরাবেগ যুক্তি।” (Law is reason free from passion.)
উপরের সংজ্ঞাগুলির আলোকে আমরা আইনকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি: উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, আইন হলো রাষ্ট্র বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত ও স্বীকৃত এমন একদল বাধ্যতামূলক নিয়মকানুন, যা সমাজের প্রতিটি সদস্যের বাহ্যিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে, শৃঙ্খলা বজায় রাখে এবং এর লঙ্ঘন করলে শাস্তির বিধান থাকে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, আইন মানব সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি শুধু একটি দণ্ডবিধি নয়, বরং এটি একটি পথনির্দেশিকা যা আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনকে সুসংগঠিত করে তোলে। আইনকে সম্মান করা এবং মেনে চলা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব, কারণ এর মাধ্যমেই একটি স্থিতিশীল, ন্যায়ভিত্তিক এবং প্রগতিশীল সমাজ গড়ে ওঠে। আইন যেমন সমাজের রক্ষাকবচ, তেমনি এটি ব্যক্তি স্বাধীনতারও নিশ্চয়তা প্রদান করে।
আইন হলো সমাজের শৃঙ্খলা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত বাধ্যতামূলক নিয়মের সমষ্টি।
প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় খ্রিস্টপূর্ব ১৭৫০ অব্দে হাম্মুরাবির আইন সংহিতা বিশ্বের প্রথম লিখিত আইনগুলোর অন্যতম। ১২১৫ সালে ইংল্যান্ডে ম্যাগনা কার্টা রাজাদের ক্ষমতাকে সীমিত করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা আধুনিক আইনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক।

