- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: আদিম সাম্যবাদ মানব সমাজের বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। এই ধারণাটি সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট চিন্তাবিদদের মধ্যে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। মূলত, এই ব্যবস্থাটি এমন এক সময়কে নির্দেশ করে যখন ব্যক্তিগত মালিকানার ধারণা প্রায় ছিল না এবং গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মধ্যে সকল সম্পদ ও সম্পদ থেকে প্রাপ্ত সুবিধা সমানভাবে বণ্টন করা হতো। এটি মানব ইতিহাসের প্রথম দিকের সমাজ কাঠামো, যেখানে মানুষ শিকার ও খাদ্য সংগ্রহের মাধ্যমে জীবন ধারণ করত।
শাব্দিক অর্থ: আদিম সাম্যবাদ কথাটির শাব্দিক অর্থ হলো ‘প্রাচীন বা প্রারম্ভিক সময়ের সমতার নীতি’। এখানে আদিম বলতে মানব সভ্যতার প্রথম দিকের সময়কালকে বোঝানো হয়, এবং সাম্যবাদ বলতে বোঝানো হয় সেই নীতি, যেখানে সকল মানুষ সমান এবং কোনো ধরনের শ্রেণি বৈষম্য নেই।
আদিম সাম্যবাদ বলতে মানব সমাজের এমন এক পর্যায়কে বোঝানো হয়, যেখানে মানুষ ছোট ছোট গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ে বসবাস করত। এই ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা ব্যক্তিগত মালিকানার ধারণা ছিল না। জমি, খাদ্য এবং শিকার থেকে প্রাপ্ত সকল সম্পদ ছিল গোষ্ঠীর সম্মিলিত সম্পদ। এই সমাজে কেউ কারোর ওপর শোষণ বা আধিপত্য বিস্তার করত না। বরং, সবাই মিলেমিশে কাজ করত এবং নিজেদের মধ্যে সমতার ভিত্তিতে সবকিছু ভাগ করে নিত। আদিম সাম্যবাদের মূল ভিত্তি ছিল সম্মিলিত শ্রম ও সম্মিলিত ভোগ।
আধুনিক সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিকগণ এই বিষয়ে বিভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান করেছেন।
১। কার্ল মার্কস (Karl Marx): মার্কস ও এঙ্গেলস-এর মতে, আদিম সাম্যবাদ হলো এমন এক সামাজিক অবস্থা যেখানে উৎপাদনের উপকরণের ওপর কোনো ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না, এবং সকল সম্পদ সমগ্র সমাজের সম্মিলিত সম্পদ হিসেবে গণ্য হতো। (Primitive communism is a social state where there was no private ownership of the means of production, and all resources were considered the collective property of the whole society.)
২। ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস (Friedrich Engels): এঙ্গেলস তার ‘The Origin of the Family, Private Property and the State’ গ্রন্থে আদিম সাম্যবাদের কথা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, আদিম সাম্যবাদ হলো সেই সমাজ, যেখানে পরিবারভিত্তিক গোষ্ঠীগুলো যৌথভাবে খাদ্য উৎপাদন ও সংগ্রহ করত এবং কোনো ধরনের শ্রেণিভেদ ছিল না। (Primitive communism is the society where family-based groups collectively produced and gathered food, and there was no class distinction.)
৩। লুইস হেনরি মর্গান (Lewis Henry Morgan): এই মার্কিন নৃতত্ত্ববিদ তার ‘Ancient Society’ গ্রন্থে আদিম সাম্যবাদের ধারণাটি তুলে ধরেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, আদিম সমাজগুলোতে পারিবারিক সম্পত্তি বলে কিছু ছিল না, বরং সকল সম্পদ গোত্রের সকলের জন্য ছিল। (In ancient societies, there was no such thing as family property, but all resources belonged to the entire clan.)
৪। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary): অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুসারে, আদিম সাম্যবাদ হলো একটি তাত্ত্বিক ব্যবস্থা যেখানে সামাজিক সংগঠন সম্পূর্ণরূপে গোষ্ঠীভিত্তিক ছিল এবং উৎপাদনের কোনো উদ্বৃত্ত ছিল না। (Primitive communism is a theoretical system in which social organization was entirely based on the group and there was no surplus production.)
৫। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber): ম্যাক্স ওয়েবার সরাসরি আদিম সাম্যবাদ নিয়ে আলোচনা না করলেও, তিনি সমাজের বিবর্তন ও ক্ষমতার বণ্টন নিয়ে কাজ করেছেন। তার মতে, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি ধারণা থেকেই শ্রেণি সমাজের জন্ম। (The concentration of power and the concept of private property led to the birth of class society.)
৬। হ্যারল্ড জে. লাস্কি (Harold J. Laski): এই ব্রিটিশ রাজনৈতিক তাত্ত্বিক সমাজতন্ত্রের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার লেখায় পরোক্ষভাবে আদিম সাম্যবাদের ধারণা পাওয়া যায়, যেখানে তিনি ব্যক্তিগত মালিকানাকে ক্ষমতার উৎস হিসেবে দেখেছেন। (The concept of private ownership is the source of power.)
৭। সাইমন, স্মিথবার্গ ও থাম্পসন (Simon, Smithburg and Thompson): এরা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছেন। তাদের মতে, আদিম সমাজগুলোতে গোষ্ঠীভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ছিল, যা পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্ম দেয়। (In primitive societies, there was a group-based decision-making process, which later gave birth to the state structure.)
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে আমরা আদিম সাম্যবাদকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি যে, এটি হলো মানব সমাজের সেই আদিম পর্যায়, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তির কোনো ধারণা ছিল না, উৎপাদনের উপকরণ ও উৎপাদিত পণ্য ছিল সমগ্র সমাজের সম্মিলিত সম্পদ, এবং কোনো শ্রেণিভেদ বা শোষণ ছিল না। এই সমাজে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে জীবনধারণ করত এবং নিজেদের মধ্যে সকল সম্পদ সমতার ভিত্তিতে ভাগ করে নিত।
উপসংহার: আদিম সাম্যবাদ হলো মানব ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা পরবর্তী সমাজ কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করেছে। এই ধারণার মূলকথা হলো সমতা, যেখানে মানুষ শোষণমুক্তভাবে জীবনধারণ করত এবং নিজেদের মধ্যে সকল কিছু ভাগ করে নিত। এটি কোনো তাত্ত্বিক মডেল নয়, বরং ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত একটি বাস্তব চিত্র। আধুনিক সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার একটি প্রধান অনুপ্রেরণা হলো এই আদিম সাম্যবাদের ধারণা, যেখানে সমাজের সকল সদস্য সমানাধিকার এবং সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত।
আদিম সাম্যবাদ হলো এমন এক সমাজব্যবস্থা যেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না এবং সকল সম্পদ ছিল গোষ্ঠীর সম্মিলিত সম্পদ।
আদিম সাম্যবাদের ধারণাটি বিশ শতকে সমাজবিজ্ঞান ও নৃতত্ত্বের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯২০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে এই ধারণা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। ১৯৮০-এর দশকে কিছু গবেষণায় দেখানো হয়, আদিম সমাজে মানুষ কেবল শিকার ও খাদ্য সংগ্রহ করত না, বরং উন্নত হাতিয়ার ও সামাজিক কাঠামো গড়ে তুলেছিল, যা তাদের জীবনকে আরও সহজ করে তুলেছিল। ২০০২ সালের এক জরিপে দেখা যায়, আদিম সমাজের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ছিল আধুনিক সমাজের চেয়ে অনেক বেশি।

