- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: আধুনিকতার অতি-যান্ত্রিকতা, যুক্তি ও একক সত্যের ধারণার বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিক্রিয়া হিসেবে উত্তর আধুনিকতাবাদের জন্ম। এটি কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম বা তত্ত্ব নয়, বরং চেনা জগতকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার একটি সাহসী প্রয়াস। সাহিত্য, শিল্প ও দর্শনে এটি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, যা আমাদের চিরন্তন চিন্তাধারাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।
১। পটভূমি ও সূচনা: বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বাস্তবতায় উত্তর আধুনিকতাবাদের সূচনা ঘটে। আধুনিক সভ্যতার চরম বিপর্যয়, যুদ্ধ এবং পারমাণবিক বোমার ধ্বংসলীলা মানুষকে প্রচলিত যুক্তির প্রতি সন্দিহান করে তোলে। এই সময়কাল থেকেই মানুষ একক কোনো ধ্রুব সত্যের বদলে বহুবিধ সত্যের সন্ধান করতে শুরু করে। ফলে জ্ঞান ও চিন্তার জগতে এক নতুন ধারার জন্ম হয়, যা উত্তর আধুনিকতাবাদ নামে পরিচিত।
২। নামকরণ ও বিস্তার: ‘পোস্টমডার্নিজম’ বা উত্তর আধুনিকতাবাদ শব্দটি প্রথম দিকে স্থাপত্য ও সাহিত্য সমালোচনায় ব্যবহৃত হতে শুরু করে। পরবর্তীতে ফরাসি দার্শনিকদের হাত ধরে এই তত্ত্বটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। এটি কেবল কোনো একক দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। কালক্রমে এটি মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও দর্শনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়।
৩। আধুনিকতার বিরোধিতা: উত্তর আধুনিকতাবাদ মূলত আধুনিকতাবাদের মূল ভিত্তি বা নিয়মকানুনের চরম বিরোধিতা থেকে গড়ে উঠেছে। আধুনিকতাবাদ যেখানে বিজ্ঞান, যুক্তি এবং সুশৃঙ্খল কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত জোর দিত, এই মতবাদ তাকে অস্বীকার করে। এটি মনে করে যে, অতিরিক্ত যুক্তিবাদ মানুষকে একঘেয়েমি এবং যান্ত্রিকতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। তাই এই মতবাদটি আধুনিকতার সেই কঠোর ও কৃত্রিম নিয়মকানুন ভেঙে ফেলার আহ্বান জানায়।
৪। গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের প্রত্যাখ্যান: ফরাসি দার্শনিক জঁ-ফ্রাঁসোয়া লিওতার্দ উত্তর আধুনিকতাবাদকে ‘মহা-আখ্যান’ বা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ধর্ম, বিজ্ঞান বা মার্ক্সবাদের মতো যে তত্ত্বগুলো মহাবিশ্বের সবকিছু এক সূত্রে ব্যাখ্যা করতে চায়, এটি তার বিরোধিতা করে। উত্তর আধুনিকতাবাদ বিশ্বাস করে যে, কোনো একক তত্ত্ব দিয়ে পৃথিবীর সব মানুষের বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তাই এটি সব ধরনের চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম বা মতবাদকে সরাসরি বর্জন করে।
৫। বহুমাত্রিক সত্যের ধারণা: এই মতবাদ অনুসারে পৃথিবীতে কোনো চিরন্তন, একক বা ধ্রুব সত্য বলে কিছু নেই। সত্য সবসময় আপেক্ষিক, যা স্থান, কাল, পাত্র এবং সংস্কৃতির পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে পারে। আপনার কাছে যা সত্য, অন্য সংস্কৃতির মানুষের কাছে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন বা অসত্য বলে মনে হতে পারে। উত্তর আধুনিকতাবাদ তাই একক সত্যের পরিবর্তে বহু সত্য এবং বহুবিধ দৃষ্টিভঙ্গিকে সমানভাবে সম্মান জানাতে শেখায়।
৬। ভাষার ভূমিকা ও বিনির্মাণ: উত্তর আধুনিক চিন্তাধারায় ভাষা কেবল মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং এটি আমাদের বাস্তবতাকে তৈরি করে। ফরাসি দার্শনিক জাক দেরিদা এই ক্ষেত্রে ‘বিনির্মাণ’ বা ডিকনস্ট্রাকশন তত্ত্বের অবতারণা করেন, যা পাঠ্যের ভেতরের লুকানো অর্থ প্রকাশ করে। যেকোনো লেখার বা শব্দের কোনো একটি নির্দিষ্ট বা চূড়ান্ত অর্থ থাকতে পারে না, তা এখানে দেখানো হয়। পাঠক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে একটি পাঠ্যের নতুন নতুন অর্থ তৈরি করতে পারেন।
৭। সংস্কৃতির মেলবন্ধন: উচ্চাঙ্গ সংস্কৃতি এবং গণ-সংস্কৃতির মধ্যে যে কৃত্রিম দেয়াল ছিল, উত্তর আধুনিকতাবাদ তা পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে। আগে অভিজাতদের শিল্প আর সাধারণ মানুষের লোকজ সংস্কৃতির মধ্যে একটি বিশাল দূরত্বের প্রাচীর তৈরি করে রাখা হতো। এই মতবাদ পপ সংস্কৃতি, সিনেমা, বিজ্ঞাপন এবং লোকশিল্পকে উচ্চাঙ্গ শিল্পের সমকক্ষ মর্যাদা এনে দিয়েছে। ফলে সংস্কৃতির জগতে এক ধরনের গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং বৈচিত্র্যের চমৎকার মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়েছে।
৮। অনুকৃতি বা সিমুলেশন: দার্শনিক জঁ বোদরিয়ার উত্তর আধুনিক সমাজের এক অদ্ভুত রূপ তুলে ধরেছেন, যাকে তিনি ‘সিমুলেশন’ ও ‘হাইপাররিয়েলিটি’ বলেছেন। বর্তমান যুগে মিডিয়া এবং প্রযুক্তির কল্যাণে আসল বাস্তবের চেয়ে কৃত্রিম বা নকল বাস্তব আমাদের কাছে বেশি সত্য মনে হয়। আমরা আসল পৃথিবীর চেয়ে টিভির পর্দা বা ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল জগতের সাথে নিজেকে বেশি যুক্ত ভাবি। এর ফলে আসল এবং নকলের মধ্যকার পার্থক্যটি সমাজে পুরোপুরি মুছে যাচ্ছে এবং এক নতুন পরাবাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।
৯। বহুত্ববাদ ও বৈচিত্র্য: উত্তর আধুনিকতাবাদ সমাজে সব ধরনের প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে উচ্চকিত করতে সাহায্য করে। এটি শ্বেতাঙ্গ বা পশ্চিমা সংস্কৃতির একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে কৃষ্ণাঙ্গ, নারী ও তৃতীয় বিশ্বের মানুষের সংস্কৃতিকে সামনে আনে। এই তত্ত্ব বিশ্বাস করে যে, পৃথিবীর সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর বৈচিত্র্য এবং ভিন্ন ভিন্ন মতামতের সহাবস্থানের মধ্যে। কাউকে ছোট না করে সবাইকে সমানভাবে গ্রহণ করাই এই মতবাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ও বৈশিষ্ট্য।
১০। খণ্ডতার উদ্যাপন: আধুনিকতাবাদ যেখানে জীবনের সামগ্রিকতা বা একটি সুনির্দিষ্ট সুশৃঙ্খল কাঠামোর খোঁজ করতো, উত্তর আধুনিকতাবাদ সেখানে খণ্ডতাকে উদ্যাপন করে। মানুষের জীবন ও মনস্তত্ত্ব যে ভাঙাচোরা, অগোছালো এবং এলোমেলো হতে পারে, এটি সেই সত্যকে সানন্দে মেনে নেয়। সাহিত্য ও শিল্পে তাই সাজানো-গোছানো কাহিনীর বদলে ভাঙা গল্প বা খণ্ডিত চরিত্রের উপস্থিতি বেশি দেখা যায়। জীবনকে তার সমস্ত বিশৃঙ্খলাসহ মেনে নেওয়ার মধ্যেই এই মতবাদ এক ধরনের আনন্দ খুঁজে পায়।
১১। ব্যঙ্গ ও কৌতুক: উত্তর আধুনিক সাহিত্যের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং জনপ্রিয় হাতিয়ার হলো ব্যঙ্গ, কৌতুক ও প্যারোডি। জীবনের চরম হতাশা, বিষাদ এবং জটিল পরিস্থিতিকে এই মতবাদে হালকা বা হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়। গম্ভীর বা তাত্ত্বিক আলোচনার পরিবর্তে চটুল ও মজার ছলে সমাজের গভীর অসঙ্গতিগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে কঠিন এবং দুর্বোধ্য বিষয়গুলোও সাধারণ মানুষের কাছে খুব সহজে ও আকর্ষণীয়ভাবে ধরা দেয়।
১২। বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তি: বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বিশ্বায়ন এবং তথ্য প্রযুক্তির অভূতপূর্ব দ্রুত বিকাশ এই মতবাদকে আরও বেগবান করেছে। ইন্টারনেটের আবিষ্কারের ফলে পৃথিবীর এক প্রান্তের সংস্কৃতি অন্য প্রান্তের সাথে খুব সহজে মিশে গেছে। ভৌগোলিক সীমানা মুছে গিয়ে পুরো পৃথিবী এখন একটি বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত হয়েছে, যা উত্তর আধুনিকতার অন্যতম লক্ষণ। প্রযুক্তির এই জোয়ার মানুষের চিন্তাভাবনা এবং জীবনযাত্রার গতিকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।
১৩। সাহিত্যে নতুন ধারা: উত্তর আধুনিক সাহিত্যের জগতে এক বিশাল এবং বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জোয়ার নিয়ে এসেছে এই নতুন চিন্তাধারা। ঔপন্যাসিকরা প্রথাগত রৈখিক গল্প বলার ধরণ ত্যাগ করে অতীত ও বর্তমানকে একসাথে মিশিয়ে গল্প বলা শুরু করেন। উপন্যাসের ভেতরে লেখকের নিজের উপস্থিতি বা গল্প লেখার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করার প্রবণতাও এই সময়ে বেশ বাড়তে থাকে। ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি বা এক লেখার সাথে অন্য লেখার পরোক্ষ সংযোগ ঘটিয়ে সাহিত্যকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়।
১৪। স্থাপত্যের নতুন রূপ: স্থাপত্যশিল্পে উত্তর আধুনিকতাবাদ আধুনিকতার একঘেয়ে, সরল এবং জ্যামিতিক নকশার কঠোর নিয়মগুলোকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। স্থপতিরা প্রাচীন ঐতিহাসিক নকশার সাথে আধুনিক উপাদানের এক চমৎকার ও অদ্ভুত মিশ্রণ ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ শুরু করেন। এর ফলে ভবনগুলো কেবল কাজের উপযোগী না হয়ে বেশ রঙিন, আলঙ্কারিক এবং দৃষ্টিভন্দন রূপ ধারণ করতে থাকে। বিভিন্ন সংস্কৃতির স্থাপত্যশৈলীর এই মিশ্রণ চারপাশের পরিবেশকে আরও বেশি প্রাণবন্ত এবং বৈচিত্র্যময় করে তোলে।
১৫। পুঁজিবাদ ও ভোক্তা সমাজ: উত্তর আধুনিক যুগের অর্থনীতি মূলত অতি-পুঁজিবাদ এবং বিশ্বজনীন ভোক্তা সংস্কৃতির ওপর শক্তভাবে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান সমাজে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হয় সে কী পণ্য ব্যবহার করছে বা কত বেশি কেনাকাটা করছে তার ওপর ভিত্তি করে। বিজ্ঞাপন এবং করপোরেট ব্র্যান্ডগুলো মানুষের মনের অবচেতন স্তরকে নিয়ন্ত্রণ করে নতুন নতুন কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করছে। এর ফলে মানুষের জীবনযাত্রা অনেক বেশি ভোগবাদী এবং বাহ্যিক চাকচিক্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
১৬। পরিচয় সংকটের প্রকাশ: এই মতবাদে মানুষের নিজস্ব বা স্থায়ী পরিচয় বলে কিছু থাকে না, বরং পরিচয় সবসময় পরিবর্তনশীল। লিঙ্গ, জাতি বা ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের যে চেনা পরিচয় ছিল, তা বর্তমান সমাজে এসে বারবার প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। একজন মানুষ একই সাথে বিভিন্ন পরিচয়ের অংশ হতে পারে এবং সময়ের সাথে তা বদলে যেতে পারে। এই চিরন্তন পরিবর্তনশীলতার কারণে আধুনিক মানুষের মনে এক ধরনের সূক্ষ্ম পরিচয় সংকট বা অস্তিত্বের দোলাচল তৈরি হয়।
১৭। সমালোচনা ও বিতর্ক: উত্তর আধুনিকতাবাদ যেমন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছে, তেমনি এর তীব্র সমালোচনা ও নানা বিতর্কও কম হয়নি। অনেক সমালোচক মনে করেন, সবকিছুকে আপেক্ষিক ভাবার কারণে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় এবং চরম শূন্যতাবাদের সৃষ্টি হতে পারে। কোনো কিছুকেই চূড়ান্ত সত্য না মানলে সঠিক ও ভুলের মধ্যকার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে তারা দাবি করেন। এত সমালোচনা সত্ত্বেও মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চায় এই মতবাদের অবদানকে অস্বীকার করা যায় না।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, উত্তর আধুনিকতাবাদ হলো মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা এবং প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক চিরন্তন প্রতিবাদের নাম। এটি আমাদের শেখায় কোনো কিছুকে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে প্রশ্ন করতে এবং অপরের ভিন্ন মতকে শ্রদ্ধা জানাতে। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই মতবাদ আজও মানবসভ্যতা, শিল্প ও সাহিত্যকে নানাভাবে সমৃদ্ধ ও আলোড়িত করে চলেছে।