- readaim.com
- 0
উত্তর::উপস্থাপনা: নিকোলো ম্যাকিয়াভেলী, রেনেসাঁ যুগের এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দার্শনিক, যিনি তাঁর যুগান্তকারী চিন্তাধারার মাধ্যমে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি স্থাপন করেছেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য প্রিন্স’-এ তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা ও ক্ষমতা দখলের এক বাস্তববাদী এবং নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন, যা সেই সময়কার প্রচলিত নৈতিক ও ধর্মীয় চিন্তাভাবনাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। ম্যাকিয়াভেলীর চিন্তাভাবনা কেবল তার সময়ের জন্যই নয়, বরং আজও রাজনৈতিক নেতাদের জন্য প্রাসঙ্গিক। তার অবদান আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গতিপথকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দিয়েছে।
১। ধর্ম ও রাজনীতি পৃথককরণ: ম্যাকিয়াভেলী সর্বপ্রথম রাষ্ট্রকে ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিকতার বন্ধন থেকে মুক্ত করার পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, শাসকের প্রধান লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রকে সুরক্ষিত রাখা এবং ক্ষমতা ধরে রাখা। এক্ষেত্রে ধর্মীয় নীতি বা ব্যক্তিগত নৈতিকতা কোনো বাধা হতে পারে না। তার মতে, শাসকের কর্মকাণ্ডের বিচার তার সাফল্যের উপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত, ধর্মের উপর নয়। এই চিন্তাধারাই আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ধারণার জন্ম দেয়। তিনি যুক্তি দেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কৌশল প্রয়োজন যা ব্যক্তিগত জীবনের নৈতিকতা থেকে আলাদা।
২। বাস্তববাদী রাষ্ট্রচিন্তা: ম্যাকিয়াভেলীর চিন্তাভাবনা সম্পূর্ণভাবে বাস্তবতার উপর নির্ভরশীল। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, একজন শাসককে মানুষ যেমন হওয়া উচিত, সেভাবে না দেখে মানুষ যেমন, সেভাবেই দেখা উচিত। তিনি রাজনীতিকে একটি শিল্প হিসেবে বিবেচনা করতেন, যেখানে ক্ষমতা লাভ ও তা ধরে রাখার জন্য যেকোনো কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। তাঁর মতে, একজন শাসককে কখনও কখনও নিষ্ঠুর, ধূর্ত ও কপট হতে হতে পারে, যদি তা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য জরুরি হয়। এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিই আধুনিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মূল ভিত্তি।
৩। ক্ষমতা লাভের কৌশল: ম্যাকিয়াভেলী তার ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন কীভাবে একজন নতুন শাসক ক্ষমতা দখল করতে পারে এবং তা ধরে রাখতে পারে। তিনি বলেন, শাসককে অবশ্যই জনগণ এবং সেনাবাহিনীর সমর্থন পেতে হবে। তার মতে, ভয় এবং ভালোবাসা দুটোই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে যদি একটিকে বেছে নিতে হয়, তাহলে ভয়কেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কারণ, মানুষের ভালোবাসা সহজে পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু ভয় মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী হয়।
৪। রাষ্ট্রকে সর্বশক্তিমান হিসেবে দেখা: ম্যাকিয়াভেলীর মতে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অসীম এবং তার ক্ষমতা প্রশ্নাতীত। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্রের স্বার্থই সর্বোচ্চ এবং এই স্বার্থ রক্ষার জন্য শাসক যেকোনো পদক্ষেপ নিতে পারেন। এই ধারণার মধ্য দিয়েই আধুনিক সার্বভৌম রাষ্ট্রের ধারণা বিকশিত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের রক্ষা করার জন্য সব ধরনের শক্তি প্রয়োগ করতে পারে এবং তার এই ক্ষমতাকে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারে না।
৫। রাজনীতির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ: ম্যাকিয়াভেলীর অন্যতম বড় অবদান হলো রাজনীতিকে একটি বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তিনি কোনো আদর্শ বা তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে নয়, বরং মানব প্রকৃতি এবং ঐতিহাসিক ঘটনার উপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও শাসনের নিয়মাবলী বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণ ছিল যুক্তিনির্ভর এবং পর্যবেক্ষণভিত্তিক। এর মধ্য দিয়ে তিনি রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মের অধীনে এনেছেন, যা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে একটি স্বতন্ত্র জ্ঞানশাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করেছে।
৬। শাসকের দ্বৈত চরিত্র: ম্যাকিয়াভেলী মনে করতেন, একজন সফল শাসককে একইসাথে সিংহ এবং শিয়ালের মতো হতে হবে। শিয়াল যেমন ধূর্ততা দিয়ে ফাঁদ এড়াতে পারে, সিংহ তেমন শক্তি দিয়ে শত্রুদের পরাজিত করতে পারে। তিনি বলেন, শাসককে প্রয়োজনে মিথ্যা বলতে বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে দ্বিধা করা উচিত নয়, যদি তা তার রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক হয়। এই দ্বৈত চরিত্র ধারণ করে একজন শাসক তার ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রকে কার্যকরভাবে রক্ষা করতে পারে।
৭। ক্ষমতা রাজনীতির প্রবক্তা: ম্যাকিয়াভেলীই প্রথম রাজনৈতিক চিন্তাবিদ যিনি রাজনীতিকে ক্ষমতা লাভ ও তা ধরে রাখার লড়াই হিসেবে দেখেছিলেন। তার মতে, রাজনীতিতে নৈতিকতা বা আদর্শের কোনো স্থান নেই; এখানে কেবল জয়-পরাজয়ই মূল বিষয়। এই চিন্তাধারাই পরবর্তীতে ‘পাওয়ার পলিটিক্স’ বা ক্ষমতা রাজনীতির জন্ম দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখনও ব্যাপকভাবে প্রাসঙ্গিক। ম্যাকিয়াভেলীর এই ধারণা আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
৮। জনগণের সমর্থন লাভ: ম্যাকিয়াভেলী তার লেখায় বারবার জনগণের সমর্থন লাভের গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, একজন শাসক যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন, জনগণের সমর্থন ছাড়া সে তার শাসন দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে না। তিনি পরামর্শ দেন যে, শাসককে অবশ্যই এমনভাবে শাসন করতে হবে যেন জনগণ তাকে ভালোবাসে এবং একই সাথে ভয়ও পায়। তিনি আরও বলেন, জনগণের বিশ্বাস অর্জন করার জন্য শাসককে অবশ্যই তাদের সম্পদ ও সম্মান রক্ষা করতে হবে।
৯। ভাগ্যের উপর বিশ্বাস: ম্যাকিয়াভেলী বিশ্বাস করতেন যে, ভাগ্যের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না, তবে মানুষের কর্ম এবং প্রজ্ঞা দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তিনি বলেন, মানুষ তার জীবনের প্রায় অর্ধেক ভাগ্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, কিন্তু বাকি অর্ধেক সে তার নিজের প্রচেষ্টায় পরিবর্তন করতে পারে। এই ধারণার মধ্য দিয়ে তিনি মানুষকে তার ভাগ্যের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না থেকে নিজের ক্ষমতা এবং প্রজ্ঞা ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার কথা বলেছেন।
১০। সামরিক শক্তির গুরুত্ব: ম্যাকিয়াভেলী সামরিক শক্তিকে একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য মনে করতেন। তিনি মনে করতেন, একটি শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী ছাড়া কোনো রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। তিনি বিদেশি ভাড়াটে সৈন্যদের উপর নির্ভর না করে দেশীয় নাগরিকদের নিয়ে গঠিত একটি স্থায়ী সেনাবাহিনী গড়ে তোলার পক্ষে মত দেন। তার মতে, একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী কেবল অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা করে না, বরং বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকেও রাষ্ট্রকে রক্ষা করে।
১১। যুদ্ধকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখা: ম্যাকিয়াভেলী মনে করতেন, যুদ্ধ কেবল আত্মরক্ষার জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। তিনি বলেন, একজন শাসককে সবসময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এবং প্রয়োজন হলে তা ব্যবহার করতে দ্বিধা করা উচিত নয়। তার মতে, যুদ্ধ হলো রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি মাধ্যম এবং একজন সফল শাসককে অবশ্যই যুদ্ধের কৌশল সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতে হবে।
১২। প্রজাতান্ত্রিক শাসনের ধারণা: যদিও ম্যাকিয়াভেলী ‘দ্য প্রিন্স’-এ রাজতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করেছেন, তার অন্য গ্রন্থ ‘ডিসকোর্সেস অন লিভি’-তে তিনি প্রজাতান্ত্রিক শাসনের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, একটি প্রজাতন্ত্র জনগণের স্বাধীনতা এবং ভালো শাসনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। তার মতে, একটি প্রজাতন্ত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং নাগরিকদের জন্য বেশি কল্যাণকর হয়।
১৩। শাসকের জন্য বিশেষ নৈতিকতা: ম্যাকিয়াভেলী মনে করতেন, একজন শাসকের জন্য ব্যক্তিগত জীবনের নৈতিকতার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নৈতিকতা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত জীবনে একজন মানুষ যেমন দয়ালু, সৎ ও পরোপকারী হতে পারে, রাষ্ট্র পরিচালনায় তা সবসময় সম্ভব নয়। তার মতে, রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার জন্য শাসককে নিষ্ঠুরতা, প্রতারণা এবং মিথ্যাচারের আশ্রয় নিতে হতে পারে। এই চিন্তাই রাজনৈতিক নৈতিকতা এবং ব্যক্তিগত নৈতিকতার মধ্যে বিভাজন তৈরি করে।
১৪। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব: ম্যাকিয়াভেলী মনে করতেন, একটি রাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, এই স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য শাসককে যেকোনো পদক্ষেপ নিতে হবে। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বা অস্থিরতা একটি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। তাই, একজন শাসককে অবশ্যই এমন কৌশল অবলম্বন করতে হবে যাতে তার শাসনের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিতে না পারে।
১৫। ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ: ম্যাকিয়াভেলী তার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও পরামর্শের জন্য ইতিহাসের উপর ব্যাপক নির্ভরশীল ছিলেন। তিনি রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস এবং সমসাময়িক ইতালির রাজনৈতিক ঘটনাবলী থেকে অসংখ্য উদাহরণ তুলে ধরেছেন। তার মতে, ইতিহাস হলো রাজনৈতিক শিক্ষার একটি বড় উৎস এবং একজন শাসককে অবশ্যই অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ঐতিহাসিক পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপন করে।
১৬। মানব প্রকৃতির নির্মোহ বিশ্লেষণ: ম্যাকিয়াভেলী মানুষকে স্বভাবতই স্বার্থপর, অকৃতজ্ঞ, ভীরু এবং লোভী হিসেবে দেখেছেন। তিনি মনে করতেন, একজন শাসককে অবশ্যই এই মানব প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে তার শাসন পরিচালনা করতে হবে। মানুষের ভালো দিকগুলোর উপর নির্ভর না করে তার খারাপ দিকগুলো নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল অবলম্বন করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এই নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তার চিন্তাভাবনা এত বাস্তবসম্মত।
১৭। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের বিরোধিতা: ম্যাকিয়াভেলী মনে করতেন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ রাষ্ট্রের দুর্বলতার কারণ হতে পারে। তিনি একটি এককেন্দ্রিক ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের পক্ষে ছিলেন, যেখানে সকল ক্ষমতা শাসকের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকবে। তার মতে, ক্ষমতা যদি বিভিন্ন গোষ্ঠীর হাতে বিভক্ত থাকে, তাহলে তা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জন্ম দিতে পারে। এই ধারণা আজও অনেক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রাসঙ্গিক।
১৮। শাসকের জনসমক্ষে আচরণ: ম্যাকিয়াভেলী একজন শাসককে জনসমক্ষে কেমন আচরণ করা উচিত সে বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, শাসককে সবসময়ই শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী এবং বিচক্ষণ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে। তাকে এমনভাবে আচরণ করতে হবে যাতে তার ক্ষমতা এবং বিচক্ষণতার প্রতি জনগণের আস্থা থাকে। এটি কেবল শাসকের ভাবমূর্তিই নয়, রাষ্ট্রের সম্মানও বৃদ্ধি করে।
১৯। অর্থনৈতিক নীতির গুরুত্ব: যদিও ম্যাকিয়াভেলী সরাসরি অর্থনীতির উপর খুব বেশি কিছু লেখেননি, তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা একে অপরের সাথে জড়িত। তিনি বলেন, শাসককে অবশ্যই এমনভাবে তার অর্থনৈতিক নীতি পরিচালনা করতে হবে যাতে জনগণের উপর অতিরিক্ত করের বোঝা না চাপে। কারণ, অতিরিক্ত কর জনগণের অসন্তোষের কারণ হতে পারে, যা শাসকের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।
২০। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক: ম্যাকিয়াভেলীর চিন্তাভাবনা এতটাই যুগান্তকারী ছিল যে, তাকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তিনি ধর্ম ও নৈতিকতা থেকে রাজনীতিকে সম্পূর্ণ আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র জ্ঞানশাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার বিশ্লেষণধর্মী এবং বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি আজও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের জন্য গবেষণার মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
২১। রাজতন্ত্রের পক্ষে যুক্তি: ‘দ্য প্রিন্স’-এ ম্যাকিয়াভেলী একজন নতুন শাসকের জন্য রাজতন্ত্রকে সবচেয়ে কার্যকর শাসনব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি মনে করতেন, একজন শক্তিশালী ও একক শাসকের অধীনে রাষ্ট্র দ্রুত শক্তিশালী হতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা মোকাবিলা করতে পারে। তার মতে, যখন কোনো রাষ্ট্র নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হয় বা সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলা করে, তখন রাজতন্ত্রই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
২২। রাজনৈতিক দর্শনের নতুন দিগন্ত: ম্যাকিয়াভেলীর চিন্তাভাবনা কেবল তার সময়ের জন্যই প্রাসঙ্গিক ছিল না, বরং তা রাজনৈতিক দর্শনে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, রাজনীতির উদ্দেশ্য কি কেবল ভালো শাসন প্রতিষ্ঠা করা, নাকি ক্ষমতা লাভ ও তা ধরে রাখা? তার এই প্রশ্ন আজও রাজনৈতিক তত্ত্ববিদদের মধ্যে বিতর্কের জন্ম দেয় এবং রাজনৈতিক দর্শনের গতিপথকে পরিবর্তন করে দেয়।
উপসংহার: নিকোলো ম্যাকিয়াভেলীর অবদান আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তার বাস্তববাদী, নির্মোহ এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ রাজনীতিকে ধর্মীয় ও নৈতিকতার প্রভাব থেকে মুক্ত করে একটি স্বতন্ত্র জ্ঞানশাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ম্যাকিয়াভেলীর চিন্তাধারা বিতর্কিত হলেও, তার রাজনৈতিক দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপর এর গভীর প্রভাব রয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্র, সার্বভৌমত্ব এবং ক্ষমতা রাজনীতির ধারণা বোঝার জন্য ম্যাকিয়াভেলীর চিন্তাভাবনা অপরিহার্য।
- ১। ধর্ম ও রাজনীতি পৃথককরণ
- ২। বাস্তববাদী রাষ্ট্রচিন্তা
- ৩। ক্ষমতা লাভের কৌশল
- ৪। রাষ্ট্রকে সর্বশক্তিমান হিসেবে দেখা
- ৫। রাজনীতির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ
- ৬। শাসকের দ্বৈত চরিত্র
- ৭। ক্ষমতা রাজনীতির প্রবক্তা
- ৮। জনগণের সমর্থন লাভ
- ৯। ভাগ্যের উপর বিশ্বাস
- ১০। সামরিক শক্তির গুরুত্ব
- ১১। যুদ্ধকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখা
- ১২। প্রজাতান্ত্রিক শাসনের ধারণা
- ১৩। শাসকের জন্য বিশেষ নৈতিকতা
- ১৪। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব
- ১৫। ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ
- ১৬। মানব প্রকৃতির নির্মোহ বিশ্লেষণ
- ১৭। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের বিরোধিতা
- ১৮। শাসকের জনসমক্ষে আচরণ
- ১৯। অর্থনৈতিক নীতির গুরুত্ব
- ২০। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক
- ২১। রাজতন্ত্রের পক্ষে যুক্তি
- ২২। রাজনৈতিক দর্শনের নতুন দিগন্ত
ম্যাকিয়াভেলী ১৫৩২ সালে তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য প্রিন্স’ প্রকাশের পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। ১৫১৩ সালে লেখা এই বইটি ১৫৩২ সালে তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। এই সময়ের মধ্যে ইতালি অসংখ্য ছোট রাজ্যে বিভক্ত ছিল, যা প্রায়শই একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকত। ম্যাকিয়াভেলী ফ্লোরেন্সের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্ষমতার পালাবদল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৪৯৮ সালে ফ্লোরেন্স প্রজাতন্ত্রের দ্বিতীয় চ্যান্সেলারির সচিব হিসেবে। ১৫১২ সালে মেদিচি পরিবারের ক্ষমতা ফিরে আসার পর তিনি তার পদ হারান এবং দেশ থেকে নির্বাসিত হন। এই নির্বাসনকালে তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থটি রচনা করেন। ১৫২৫ সালে তার আরেক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘ডিসকোর্সেস অন লিভি’ প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি রাজতন্ত্রের পাশাপাশি প্রজাতন্ত্রের পক্ষেও যুক্তি দেন। তার চিন্তাভাবনা পরবর্তীতে হেগেল এবং রুশোর মতো দার্শনিকদের উপরও প্রভাব ফেলেছিল।

