- readaim.com
- 0
উত্তর::উপক্রমণিকা: ১৬৮৮ সালের গৌরবময় বিপ্লব ইংল্যান্ডের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এটি কোনো রক্তাক্ত যুদ্ধ বা বিদ্রোহ ছিল না, বরং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। এই বিপ্লবের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় জেমসের স্বেচ্ছাচারী শাসনের অবসান ঘটে এবং তার কন্যা মেরি ও জামাতা উইলিয়াম অফ অরেঞ্জ সিংহাসনে আরোহণ করেন। এর ফলস্বরূপ, পার্লামেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং রাজতন্ত্রের ক্ষমতা সীমিত হয়, যা ভবিষ্যতে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের পথ খুলে দেয়।
১। দ্বিতীয় জেমসের স্বৈরাচারী শাসন: ক্যাথলিক রাজা দ্বিতীয় জেমস ১৬৮৫ সালে সিংহাসনে বসার পর থেকেই তার স্বৈরাচারী শাসনের জন্য পরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি পার্লামেন্টের অনুমতি ছাড়াই নতুন আইন প্রণয়ন করতেন এবং ক্যাথলিক ধর্মকে প্রাধান্য দিতে শুরু করেন। তার এই আচরণ প্রোটেস্ট্যান্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ ইংল্যান্ডের জনগণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি করে। জেমস রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে ক্যাথলিকদের বসানো শুরু করেন, যা প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে। এই সব পদক্ষেপের ফলে পার্লামেন্ট এবং জনগণের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। জেমসের এই স্বেচ্ছাচারী মনোভাবই বিপ্লবের মূল কারণ ছিল।
২। উইলিয়াম অফ অরেঞ্জের আগমন: ইংল্যান্ডের পরিস্থিতি যখন উত্তপ্ত, তখন প্রোটেস্ট্যান্ট নেতারা গোপনে নেদারল্যান্ডসের শাসক উইলিয়াম অফ অরেঞ্জকে আমন্ত্রণ জানান। উইলিয়াম ছিলেন জেমসের জামাতা এবং তার কন্যা মেরির স্বামী। তিনি প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মাবলম্বী ছিলেন এবং ইংল্যান্ডের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় অধিকার রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন। ১৬৮৮ সালে তিনি একটি বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে ইংল্যান্ডে অবতরণ করেন। তার এই আগমনকে ইংল্যান্ডের জনগণ সাদরে গ্রহণ করে এবং তারা জেমসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। উইলিয়ামের এই সিদ্ধান্ত ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক পটভূমিকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দেয়।
৩। রাজা জেমসের পলায়ন: উইলিয়াম অফ অরেঞ্জের আগমনের পর রাজা দ্বিতীয় জেমস প্রতিরোধের কোনো চেষ্টা করেননি। তার নিজের সেনাবাহিনীও তার প্রতি অনুগত ছিল না। বেশিরভাগ সেনা উইলিয়ামের পক্ষ নেয়। জেমসের এই দুর্বলতা এবং সেনাবাহিনীর অসহযোগিতা তাকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে। তিনি গোপনে ইংল্যান্ড ছেড়ে ফ্রান্সে চলে যান। জেমসের এই পলায়নের ফলে সিংহাসন কার্যত শূন্য হয়ে যায়। এই ঘটনাটি বিপ্লবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, কারণ এটি কোনো রক্তপাত ছাড়াই ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটায়।
৪। বিল অফ রাইটস (অধিকারের বিল) প্রণয়ন: দ্বিতীয় জেমসের প্রস্থানের পর পার্লামেন্ট উইলিয়াম এবং মেরি’কে যৌথভাবে সিংহাসনে আরোহণের প্রস্তাব দেয়। তবে শর্ত ছিল যে, তাদের একটি নতুন আইন মেনে চলতে হবে, যা পরবর্তীতে ‘বিল অফ রাইটস’ নামে পরিচিত হয়। এই বিলে রাজার ক্ষমতা সীমিত করা হয় এবং পার্লামেন্টের অধিকার ও ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এর মাধ্যমে পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়া রাজা কোনো নতুন কর আরোপ করতে পারতেন না, বা কোনো স্থায়ী সেনাবাহিনী রাখতে পারতেন না। এটি ইংল্যান্ডের ইতিহাসে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করে।
৫। ধর্মীয় সহনশীলতার আইন: বিল অফ রাইটস-এর পাশাপাশি ‘অ্যাক্ট অফ টলারেশন’ বা ধর্মীয় সহনশীলতার আইনও প্রণীত হয়। এই আইন প্রোটেস্ট্যান্টদের ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করে, যদিও ক্যাথলিকদের ধর্মীয় অধিকার সীমিত রাখা হয়। এই আইনের ফলে প্রোটেস্ট্যান্ট ভিন্নমতাবলম্বীরা (যেমন ব্যাপটিস্ট, কোয়েকার) সরকারি চাকরির জন্য যোগ্য না হলেও প্রকাশ্যে তাদের ধর্ম পালন করতে পারতেন। এটি ইংল্যান্ডের ধর্মীয় সহনশীলতার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল এবং সমাজে স্থিতিশীলতা আনতে সাহায্য করে।
৬। পার্লামেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি: গৌরবময় বিপ্লবের সবচেয়ে বড় ফলাফল ছিল পার্লামেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাজার ক্ষমতা হ্রাস। বিল অফ রাইটস-এর মাধ্যমে পার্লামেন্ট দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে। ভবিষ্যতে কোনো রাজাই পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়া এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। এর ফলে, সংসদীয় গণতন্ত্রের পথ উন্মোচিত হয় এবং জনগণের প্রতিনিধিরা দেশের শাসনব্যবস্থায় আরও বেশি ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। এই পরিবর্তন ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে একটি নতুন দিকে পরিচালিত করে।
৭। সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের সূচনা: এই বিপ্লব ইংল্যান্ডে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের সূচনা করে। এর আগে রাজা ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু বিল অফ রাইটস-এর পর রাজা বা রানীকে পার্লামেন্টের আইন মেনে চলতে হতো। ফলে, রাজা কেবল নামমাত্র শাসক হিসেবে গণ্য হন এবং রাষ্ট্রের আসল ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে চলে আসে। এটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যা আজও ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় বিদ্যমান।
৮। আর্থিক ব্যবস্থার পরিবর্তন: এই বিপ্লবের পর ইংল্যান্ডের আর্থিক ব্যবস্থায়ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। ১৬৯৪ সালে ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড প্রতিষ্ঠিত হয়, যা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। উইলিয়াম অফ অরেঞ্জ তার সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থার প্রয়োজন অনুভব করেন। এর ফলস্বরূপ, রাষ্ট্রীয় ঋণের ধারণার জন্ম হয় এবং সরকার জনসাধারণের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়। এই পরিবর্তন ইংল্যান্ডকে একটি অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে।
৯। প্রোটেস্ট্যান্ট উত্তরাধিকারের নিশ্চিতকরণ: গৌরবময় বিপ্লব প্রোটেস্ট্যান্ট উত্তরাধিকারের নীতিকে নিশ্চিত করে। বিল অফ রাইটস-এর মাধ্যমে এটি স্পষ্ট করা হয় যে, ভবিষ্যতে কোনো ক্যাথলিক রাজা বা রানী ইংল্যান্ডের সিংহাসনে আরোহণ করতে পারবেন না। এর ফলে ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয় এবং ধর্মীয় বিভাজন কিছুটা কমে আসে। এই নীতিটি পরবর্তী শতাব্দীগুলোতেও ব্রিটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
১০। ইউরোপীয় রাজনীতিতে প্রভাব: গৌরবময় বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডের পররাষ্ট্রনীতিতেও পরিবর্তন আসে। উইলিয়াম অফ অরেঞ্জ ছিলেন নেদারল্যান্ডসের শাসক, তাই তার আগমনের পর ইংল্যান্ড ফ্রান্সের বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়। এই জোট ইউরোপের ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ড একটি শক্তিশালী সামুদ্রিক শক্তিতে পরিণত হয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তার প্রভাব বৃদ্ধি পায়। এটি আধুনিক ইউরোপের রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উপসংহার: ইংল্যান্ডের গৌরবময় বিপ্লব কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল একটি আদর্শিক পরিবর্তন। রক্তপাতহীন এই বিপ্লব দেখিয়ে দেয় যে, একটি জাতির রাজনৈতিক পরিবর্তন শান্তিপূর্ণ উপায়েও সম্ভব। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইংল্যান্ডের নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপিত হয়। বিল অফ রাইটস, যা বিপ্লবের ফলস্বরূপ এসেছিল, তা আজও ব্রিটিশ সাংবিধানিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বিপ্লব ইংল্যান্ডের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে, যা আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হয়।
১. দ্বিতীয় জেমসের স্বৈরাচারী শাসন ২. উইলিয়াম অফ অরেঞ্জের আগমন ৩. রাজা জেমসের পলায়ন ৪. বিল অফ রাইটস (অধিকারের বিল) প্রণয়ন ৫. ধর্মীয় সহনশীলতার আইন ৬. পার্লামেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি ৭. সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের সূচনা ৮. আর্থিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ৯. প্রোটেস্ট্যান্ট উত্তরাধিকারের নিশ্চিতকরণ ১০. ইউরোপীয় রাজনীতিতে প্রভাব।
এই বিপ্লবের ফলে ১৬৮৯ সালে টমাস হবস রচিত ‘লেভিয়াথান’ বইটির গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়, যেখানে সামাজিক চুক্তির তত্ত্বের কথা বলা হয়েছে। ১৬৮৫ সালের জেমসের সিংহাসনে আরোহণের পর থেকেই ইংল্যান্ডে অসন্তোষ দানা বাঁধছিল, যা তিন বছরের মধ্যে বিপ্লবের জন্ম দেয়। এই বিপ্লবের পর ১৬৮৯ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিল অফ রাইটস আইন হিসেবে পাস হয়। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভবিষ্যতের পথ খুলে দেয় এবং অন্যান্য দেশেও গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে প্রভাবিত করে।

