- readaim.com
- 0
উত্তর::উপস্থাপনা: প্রথাগত প্রশাসন এবং উন্নয়ন প্রশাসন হলো দুটি ভিন্ন ধরনের শাসন ব্যবস্থা, যা দেশ ও সমাজের উন্নতির জন্য কাজ করে। প্রথাগত প্রশাসন পুরোনো ধ্যানধারণা এবং গতানুগতিক নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যেখানে উন্নয়ন প্রশাসন সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তনশীল এবং আধুনিক ধ্যানধারণার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই দুটি ব্যবস্থার মধ্যেকার পার্থক্য বোঝা আমাদের দেশের প্রশাসনিক কাঠামো এবং তার লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেবে।
১। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: সনাতন বা প্রথাগত প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হলো স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। এটি সাধারণত বিদ্যমান কাঠামোকে ধরে রাখতে চায় এবং এর লক্ষ্য হলো আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখা। তারা সমাজের স্থিতাবস্থা রক্ষা করতে চায় এবং পরিবর্তনকে খুব বেশি উৎসাহিত করে না। এর বিপরীতে, উন্নয়ন প্রশাসনের মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটানো। এটি পরিবর্তনকে স্বাগত জানায় এবং নতুন নতুন নীতি ও কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজের উন্নয়ন নিশ্চিত করে। তাদের লক্ষ্য শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা নয়, বরং জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।
২। দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য: সনাতন প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি মূলত রক্ষণশীল এবং গতানুগতিক। তারা সাধারণত ‘উপরে থেকে নিচে’ (top-down) পদ্ধতিতে কাজ করে, যেখানে সিদ্ধান্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দ্বারা নেওয়া হয় এবং তা সাধারণ জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। এতে জনগণের অংশগ্রহণ খুব কম থাকে। অন্যদিকে, উন্নয়ন প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি হলো প্রগতিশীল ও আধুনিক। তারা ‘নিচে থেকে উপরে’ (bottom-up) পদ্ধতি অনুসরণ করে, যেখানে জনগণের চাহিদা এবং মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তারা দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।
৩। প্রশাসনিক কাঠামো: প্রথাগত প্রশাসনের কাঠামো খুবই কঠোর এবং আমলাতান্ত্রিক। এখানে পদাধিকারক্রম খুব স্পষ্ট এবং প্রতিটি কাজ একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনেক দেরি হয় এবং কার্যকারিতা ব্যাহত হয়। এই ধরনের কাঠামোতে দায়িত্ব ও ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট এবং সাধারণত পরিবর্তনশীল নয়। অন্যদিকে, উন্নয়ন প্রশাসনের কাঠামো নমনীয় এবং বিকেন্দ্রীভূত। এখানে ক্ষমতা ও দায়িত্বের বন্টন করা হয় যাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় এবং স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী কাজ করা যায়। এই নমনীয়তা প্রশাসনকে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহায্য করে এবং কাজকে আরও গতিশীল করে তোলে।
৪। কর্মকর্তাদের ভূমিকা: সনাতন প্রশাসনে কর্মকর্তাদের ভূমিকা মূলত নিয়ম-নীতি প্রয়োগ করা এবং সরকারি আদেশ পালন করা। তারা অনেকটা যান্ত্রিকভাবে কাজ করেন, যেখানে সৃজনশীলতা বা উদ্যোগের সুযোগ কম থাকে। তাদের প্রধান দায়িত্ব হলো স্থিতাবস্থা বজায় রাখা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা। কিন্তু উন্নয়ন প্রশাসনে কর্মকর্তাদের ভূমিকা অনেক বিস্তৃত ও বহুমুখী। তাদের শুধু নিয়ম পালন নয়, বরং সমস্যা সমাধানকারী, উন্নয়ন পরিকল্পনাকারী এবং জনগণের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার দায়িত্বও থাকে। তারা নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করেন এবং সমাজের উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখেন।
৫। পরিবর্তনের প্রতি মনোভাব: প্রথাগত প্রশাসন সাধারণত পরিবর্তনকে সন্দেহের চোখে দেখে এবং দ্রুত কোনো নতুন ব্যবস্থা বা পদ্ধতির সাথে মানিয়ে নিতে পারে না। তারা মনে করে যে বিদ্যমান নিয়ম-কানুন ও পদ্ধতিই সবচেয়ে নিরাপদ এবং কার্যকর। এই মানসিকতার কারণে তারা অনেক সময় সামাজিক বা অর্থনৈতিক পরিবর্তনের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়। এর বিপরীতে, উন্নয়ন প্রশাসন পরিবর্তনকে একটি ইতিবাচক শক্তি হিসেবে দেখে। তারা নতুন প্রযুক্তি, পদ্ধতি ও ধারণা গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকে এবং সমাজের পরিবর্তনশীল চাহিদা অনুযায়ী নিজেদেরকে মানিয়ে নেয়। তারা মনে করে যে পরিবর্তনই উন্নয়নের চাবিকাঠি।
৬। জনগণের অংশগ্রহণ: সনাতন প্রশাসনে জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ খুবই সীমিত। তারা সাধারণত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার বাইরে থাকে এবং কেবল আদেশ-নির্দেশ মেনে চলে। এই ব্যবস্থায় জনগণ প্রশাসনের কাছে কেবল একজন সুবিধাভোগী হিসেবে গণ্য হয়, যাদের কোনো সক্রিয় ভূমিকা নেই। পক্ষান্তরে, উন্নয়ন প্রশাসন জনগণের অংশগ্রহণকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। তারা মনে করে যে উন্নয়নের প্রক্রিয়াতে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ না থাকলে তা সফল হতে পারে না। স্থানীয় সরকার, এনজিও এবং বিভিন্ন কমিউনিটি গ্রুপের মাধ্যমে জনগণকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত করা হয়, যা উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকরী করে তোলে।
৭। উন্নয়ন পরিকল্পনা: সনাতন প্রশাসনের অধীনে সাধারণত কোনো সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকে না। তাদের কাজ কেবল দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা। যদি কোনো পরিকল্পনা থাকেও, তা সাধারণত স্বল্পমেয়াদী এবং খুব বেশি সুদূরপ্রসারী নয়। অন্যদিকে, উন্নয়ন প্রশাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ও বিস্তারিত উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকে। এই পরিকল্পনায় সমাজের বিভিন্ন সেক্টরের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামো ইত্যাদি। এই পরিকল্পনাগুলি সাধারণত নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং বাজেট নিয়ে তৈরি করা হয়, যা উন্নয়নের অগ্রগতি পরিমাপ করতে সাহায্য করে।
৮। দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা: প্রথাগত প্রশাসনের দায়বদ্ধতা মূলত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রতি। তারা তাদের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেই জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে, এবং জনগণের কাছে তাদের দায়বদ্ধতা অনেক কম থাকে। এই ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব প্রায়ই দেখা যায়, কারণ তথ্য জনসাধারণের জন্য সহজে উন্মুক্ত থাকে না। কিন্তু উন্নয়ন প্রশাসন জনগণের কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ থাকে। তারা মনে করে যে তাদের কাজের স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি, কারণ এটি জনগণের আস্থা অর্জন করতে সাহায্য করে। তথ্য অধিকার আইন এবং বিভিন্ন অডিট সিস্টেমের মাধ্যমে তারা নিজেদের কাজকে আরও স্বচ্ছ করার চেষ্টা করে।
৯। প্রযুক্তি ব্যবহার: প্রথাগত প্রশাসনে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার খুব কম। তারা পুরোনো ফাইলভিত্তিক ব্যবস্থা এবং ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই অভ্যস্ত। এর ফলে কাজ করতে অনেক সময় লাগে এবং তথ্যের সংরক্ষণও কঠিন হয়ে পড়ে। প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে থাকার কারণে তারা আধুনিক যুগের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়। কিন্তু উন্নয়ন প্রশাসন প্রযুক্তি ব্যবহারে অনেক বেশি আগ্রহী। তারা ই-গভর্নেন্স, ডিজিটাল ডেটাবেজ, অনলাইন পরিষেবা ইত্যাদি ব্যবহার করে প্রশাসনিক কাজকে আরও সহজ ও দ্রুত করতে চায়। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার তাদের কাজকে আরও দক্ষ ও কার্যকরী করে তোলে।
১০। উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতা: প্রথাগত প্রশাসনে উদ্ভাবন বা সৃজনশীলতার কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে। কর্মকর্তারা একটি নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে কাজ করতে বাধ্য থাকেন এবং এর বাইরে চিন্তা করার খুব বেশি সুযোগ পান না। কোনো নতুন আইডিয়া বা প্রস্তাব সাধারণত আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়। কিন্তু উন্নয়ন প্রশাসনে উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করা হয়। কর্মকর্তারা নতুন নতুন সমস্যার সমাধান খুঁজতে এবং ব্যতিক্রমী উপায়ে কাজ করার জন্য অনুপ্রাণিত হন। এই সৃজনশীলতা নতুন নতুন কর্মসূচির জন্ম দেয়, যা সমাজের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখে।
১১। সংরক্ষণশীলতা বনাম গতিশীলতা: প্রথাগত প্রশাসন মূলত রক্ষণশীল। তারা স্থিতিশীলতা এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার সুরক্ষাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। নতুন কোনো পদক্ষেপ নিতে বা প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে যেতে তারা কুণ্ঠাবোধ করে। এই রক্ষণশীলতা অনেক সময় সমাজের অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এর বিপরীতে, উন্নয়ন প্রশাসন অত্যন্ত গতিশীল। তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে এবং পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের মানিয়ে নিতে সক্ষম। এই গতিশীলতা তাদের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং সমাজের চাহিদা পূরণে সাহায্য করে। তারা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারে।
১২। অর্থনৈতিক লক্ষ্য: সনাতন প্রশাসনের অর্থনৈতিক লক্ষ্য সাধারণত কর সংগ্রহ এবং বাজেট বন্টন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে। তাদের লক্ষ্য থাকে কেবল সরকারের আর্থিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখা। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনা তাদের থাকে না। অন্যদিকে, উন্নয়ন প্রশাসনের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অনেক বিস্তৃত। তারা দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তারা অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাহায্য করে।
১৩। মানবসম্পদ উন্নয়ন: প্রথাগত প্রশাসনে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ সাধারণত কেবল নিয়ম-কানুন ও পদ্ধতি শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি থাকে না। কিন্তু উন্নয়ন প্রশাসন মানবসম্পদ উন্নয়নকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখে। তারা কর্মকর্তাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মশালা এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগের ব্যবস্থা করে যাতে তারা আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে। তারা মনে করে যে প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ জনবলই উন্নয়নের চালিকাশক্তি।
১৪। ঝুঁকি গ্রহণের মনোভাব: প্রথাগত প্রশাসন ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক। তারা একটি নির্দিষ্ট এবং নিরাপদ পথের মধ্যে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কোনো নতুন বা অপ্রচলিত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা দ্বিধাগ্রস্ত হয়, কারণ এতে ব্যর্থতার ঝুঁকি থাকে। এই ঝুঁকির কারণে তারা অনেক নতুন সুযোগ হারাতে পারে। উন্নয়ন প্রশাসন তুলনামূলকভাবে ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত থাকে। তারা মনে করে যে ঝুঁকি না নিলে নতুন কিছু করা বা বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তারা নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে এবং পরীক্ষামূলক কর্মসূচি নিতে আগ্রহী থাকে, যা উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
১৫। মূল্যায়ন পদ্ধতি: প্রথাগত প্রশাসনে কাজের মূল্যায়ন সাধারণত নিয়ম-কানুন সঠিকভাবে পালিত হয়েছে কিনা তার উপর ভিত্তি করে করা হয়। ফলাফলের চেয়ে প্রক্রিয়া বা পদ্ধতিগত দিকটি এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই মূল্যায়নে সমাজের উপর কাজের প্রকৃত প্রভাব খুব কমই বিবেচনা করা হয়। পক্ষান্তরে, উন্নয়ন প্রশাসনে কাজের মূল্যায়ন করা হয় তার বাস্তব ফলাফলের উপর ভিত্তি করে। এখানে কার্যকারিতা, প্রভাব এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়েছে কিনা, তা যাচাই করা হয়। তারা লক্ষ্যভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে, যা তাদের কাজের অগ্রগতি এবং সাফল্য পরিমাপ করতে সাহায্য করে।
১৬। স্থানীয় সরকারের সাথে সম্পর্ক: প্রথাগত প্রশাসন সাধারণত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কম গুরুত্ব দেয়। তারা মনে করে যে কেন্দ্রীয় প্রশাসনই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। স্থানীয় সরকার এখানে কেবল কেন্দ্রীয় প্রশাসনের নির্দেশনা পালন করে। এটি স্থানীয় উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে। উন্নয়ন প্রশাসন স্থানীয় সরকারকে খুবই গুরুত্ব দেয়। তারা স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন এবং বিকেন্দ্রীকরণের উপর জোর দেয়। তারা মনে করে যে স্থানীয় সরকারই জনগণের চাহিদা সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে পারে। তাই তাদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করা হয়।
১৭। যোগাযোগের ধরন: প্রথাগত প্রশাসনে যোগাযোগ সাধারণত আনুষ্ঠানিক এবং শ্রেণিবদ্ধ হয়। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে আদেশ ও নির্দেশ পাঠান, এবং এর বাইরে খুব বেশি দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ হয় না। এই যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক সময় তথ্য প্রবাহকে ধীর করে দেয়। কিন্তু উন্নয়ন প্রশাসনে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্মুক্ত এবং অনানুষ্ঠানিক হয়। কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে এবং জনগণের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেন। এই উন্মুক্ত যোগাযোগ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে এবং সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে, যা প্রশাসনিক কার্যকারিতা বাড়ায়।
১৮। জনগণের কল্যাণ: প্রথাগত প্রশাসন সরাসরি জনগণের কল্যাণ নিয়ে খুব বেশি কাজ করে না। তাদের প্রধান দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা ও রাজস্ব আদায় করা। তারা মনে করে জনগণের কল্যাণ সরকারের অন্য কোনো বিভাগের দায়িত্ব। অন্যদিকে, উন্নয়ন প্রশাসনের মূল লক্ষ্যই হলো জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা। তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান, এবং আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে সরাসরি কাজ করে। তারা এমন নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়ন করে যা সমাজের দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে।
১৯। সংকট মোকাবিলা: প্রথাগত প্রশাসন সাধারণত হঠাৎ করে আসা সংকট মোকাবিলায় ধীর ও অকার্যকর হতে পারে। কারণ তারা একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার বাইরে কাজ করতে অভ্যস্ত নয়। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অর্থনৈতিক সংকটের মতো পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দিতে ব্যর্থ হতে পারে। কিন্তু উন্নয়ন প্রশাসন সংকট মোকাবিলায় অনেক বেশি নমনীয় এবং দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সক্ষম। তারা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং কার্যকরভাবে সম্পদ বন্টন করতে পারে। এই নমনীয়তা এবং গতিশীলতা সংকটকালীন সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শেষকথা: সনাতন প্রশাসন যেখানে স্থিতাবস্থা রক্ষা এবং নিয়মের উপর জোর দেয়, উন্নয়ন প্রশাসন সেখানে গতিশীলতা, জনগণের অংশগ্রহণ এবং সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের উপর মনোযোগ দেয়। একটি দেশ যখন উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়, তখন প্রথাগত প্রশাসনের কঠোরতা ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠে উন্নয়ন প্রশাসনের আধুনিক ও গতিশীল কাঠামো গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তনশীলতাই একটি জাতিকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
১। 🎯 লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ২। 🧠 দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ৩। 🏛️ প্রশাসনিক কাঠামো ৪। 🧑💼 কর্মকর্তাদের ভূমিকা ৫। 🔄 পরিবর্তনের প্রতি মনোভাব ৬। 👥 জনগণের অংশগ্রহণ ৭। 📈 উন্নয়ন পরিকল্পনা ৮। 🤝 দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা ৯। 💻 প্রযুক্তি ব্যবহার ১০। 💡 উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতা ১১। 🐢 সংরক্ষণশীলতা বনাম গতিশীলতা ১২। 💰 অর্থনৈতিক লক্ষ্য ১৩। 🧑🎓 মানবসম্পদ উন্নয়ন ১৪। ⚠️ ঝুঁকি গ্রহণের মনোভাব ১৫। 📊 মূল্যায়ন পদ্ধতি ১৬। 🏠 স্থানীয় সরকারের সাথে সম্পর্ক ১৭। 🗣️ যোগাযোগের ধরন ১৮। ❤️ জনগণের কল্যাণ ১৯। 🚨 সংকট মোকাবিলা
উন্নয়ন প্রশাসনের ধারণাটি ১৯৫০-এর দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেতে শুরু করে, যখন অনেক উন্নয়নশীল দেশ স্বাধীনতা লাভ করে এবং দ্রুত সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। এই সময়কালে, প্রথাগত ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৬৫ সালের দিকে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে এই ধারণা নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়। ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো ১৯৫০ থেকে ১৯৭০-এর দশকে তাদের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় উন্নয়ন প্রশাসনের নীতিগুলো অন্তর্ভুক্ত করে। এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে এই পরিবর্তনগুলো প্রশাসনের ভূমিকা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বাইরে নিয়ে আসে, যা বৈশ্বিক উন্নয়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। সাম্প্রতিক সময়ে, ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনে উন্নয়ন প্রশাসন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

