- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি দেশের সার্বিক অগ্রগতি ও পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হলো তার নেতৃত্বস্থানীয় গোষ্ঠী বা এলিট শ্রেণী। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে এই এলিটদের ভূমিকা অত্যন্ত গভীর। তাদের সিদ্ধান্ত, দৃষ্টিভঙ্গি এবং কর্মকাণ্ডই নির্ধারণ করে দেয় একটি অনুন্নত বা উন্নয়নশীল রাষ্ট্র আধুনিকতার মহাসড়কে কতটা সফলভাবে এগিয়ে যাবে।
১। নীতি নির্ধারণ: উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক এলিটরা রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করে থাকেন। তারা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং জনগণের চাহিদার কথা বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই নীতিগুলোর সঠিক বাস্তবায়নের ওপরই দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ অগ্রগতি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে। তাদের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত একটি পিছিয়ে পড়া জাতিকে দ্রুত উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে।
২। অর্থনৈতিক নেতৃত্ব: দেশের শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক এলিট বা ব্যবসায়ী শ্রেণী প্রধান ভূমিকা পালন করে। তারা নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে বিশাল অবদান রাখেন। একই সাথে তারা জাতীয় আয় বা জিডিপি বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা পালন করে দেশের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করেন। তাদের বাণিজ্যিক দূরদর্শিতা দেশকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সাহায্য করে।
৩। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: রাজনৈতিক এলিটদের প্রধান কাজ হলো দেশে একটি টেকসই ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মতাদর্শের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট থাকেন। একটি দেশে বিনিয়োগ ও উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো রাজনৈতিক শান্ত পরিবেশ, যা বজায় রাখা এলিটদের দায়িত্ব। তাদের পরিপক্ব নেতৃত্ব অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সহিংসতা রোধে ঢাল হিসেবে কাজ করে।
৪। সামাজিক সংস্কার: সমাজকে কুসংস্কার, অন্ধত্ব এবং প্রাচীন অনগ্রসর চিন্তাধারা থেকে মুক্ত করতে সামাজিক এলিটরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তারা নারী শিক্ষা, মানবাধিকার রক্ষা এবং জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাদের আধুনিক ও প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে তারা সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করেন। এর ফলে সমাজে এক ধরনের ইতিবাচক ও বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটে।
৫। শিক্ষা বিস্তার: দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক বা শিক্ষক এলিট সমাজ শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন। তারা মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এবং নতুন প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করেন। গবেষণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাথে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করার দায়িত্বও তারা পালন করেন। একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে তাদের এই অবদানের কোনো বিকল্প নেই।
৬। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন: কারিগরি ও বিজ্ঞানী এলিটরা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উদ্ভাবনকে ত্বরান্বিত করে থাকেন। তারা কৃষিকাজ, শিল্প উৎপাদন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা দেশকে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে বিশেষভাবে সাহায্য করে থাকে। এর ফলে দেশ ডিজিটাল ও স্মার্ট রূপান্তরের দিকে দ্রুত এগিয়ে যায়।
৭। সম্পদ বণ্টন: রাষ্ট্রের সম্পদ যেন কেবল গুটিয়েক মানুষের হাতে কুক্ষিগত না থাকে, তা নিশ্চিত করা এলিটদের অন্যতম দায়িত্ব। তারা কর নীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পথ সুগম করেন। সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য কমিয়ে আনতে তারা নীতিগতভাবে সরকারকে বিভিন্ন পরামর্শ দেন। সুষম সম্পদ বণ্টন একটি শান্ত ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে সাহায্য করে।
৮। বৈদেশিক সম্পর্ক: কূটনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক এলিটরা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের স্বার্থ রক্ষা এবং ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে কাজ করেন। তারা বিভিন্ন উন্নত দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদনে মূখ্য ভূমিকা রাখেন। এর ফলে দেশে বৈদেশিক সাহায্য, ঋণ এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের পথ সুগম হয়। তাদের দক্ষ কূটনীতি দেশকে বিশ্বমঞ্চে একটি মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত করতে পারে।
৯। আইন শৃঙ্খলা: প্রশাসনিক এবং বিচার বিভাগীয় এলিটরা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অবদান রাখেন। তারা অপরাধ দমন, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে কাজ করে থাকেন। একটি সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ গঠনে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত স্পষ্ট ও অনস্বীকার্য। আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেই তারা সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখেন।
১০। সংস্কৃতি রক্ষা: সাংস্কৃতিক এলিট বা লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে কাজ করেন। তারা সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশের মাধ্যমে তরুণ সমাজকে অপসংস্কৃতির হাত থেকে রক্ষা করেন। জাতীয় চেতনা এবং দেশপ্রেম জাগ্রত করতে তাদের সৃষ্টিশীল কাজগুলো দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ করে। তাদের কর্মকাণ্ডের ফলেই একটি দেশের মৌলিক পরিচয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করে।
১১। অবকাঠামো নির্মাণ: দেশের যাতায়াত, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতের মতো বড় বড় অবকাঠামো উন্নয়নে এলিটরা সরাসরি যুক্ত থাকেন। প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদ এলিটরা মেগা প্রকল্পগুলোর নকশা তৈরি এবং তা বাস্তবায়নে কারিগরি নেতৃত্ব প্রদান করেন। এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শহরের মূল ধারার সাথে যুক্ত করে। এর ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক অভাবনীয় গতিশীলতা আসে।
১২। স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন: চিকিৎসা ক্ষেত্রের এলিট বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা দেশের স্বাস্থ্য খাতের মানোন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে থাকেন। তারা মহামারি নিয়ন্ত্রণ, উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি প্রবর্তন এবং চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে নেতৃত্ব দেন। গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য তারা সরকারি নীতি বাস্তবায়নে সাহায্য করেন। একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে তাদের এই ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৩। মানবসম্পদ তৈরি: উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিশাল জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করার দায়িত্ব এলিটদের ওপর বর্তায়। তারা বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কর্মমুখী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন। দক্ষ মানবসম্পদ দেশের অভ্যন্তরে যেমন উৎপাদন বাড়ায়, তেমনি বিদেশে কর্মী পাঠিয়ে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি করে। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো অনেক বেশি শক্তিশালী ও স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে।
১৪। কৃষি আধুনিকায়ন: কৃষিপ্রধান উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কৃষিবিজ্ঞানী ও গবেষক এলিটরা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করেন। তারা উচ্চফলনশীল জাতের বীজ উদ্ভাবন, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং সঠিক সার ব্যবস্থাপনার কৌশল সাধারণ কৃষকদের শেখান। এর ফলে সনাতন কৃষি ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং দেশে খাদ্য উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তাদের এই ভূমিকা দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে আমূল বদলে দিতে সক্ষম হয়েছে।
১৫। পরিবেশ সংরক্ষণ: জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষা করতে পরিবেশবাদী এলিটরা অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তারা টেকসই উন্নয়ন, বনায়ন এবং পরিবেশ দূষণ রোধে জনসচেতনতা তৈরি ও নীতি নির্ধারণে চাপ সৃষ্টি করেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা বাড়াতে তারা আন্তর্জাতিক তহবিল আনায়নেও ভূমিকা রাখেন। তাদের এই দূরদর্শী প্রচেষ্টা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করে।
১৬। সুশাসন প্রতিষ্ঠা: দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সরকারি কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনা এলিটদের অন্যতম প্রধান একটি দায়িত্ব। সুশীল সমাজের এলিটরা সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে এবং গঠনমূলক সমালোচনা করে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় চাপ সৃষ্টি করেন। তারা তথ্য অধিকার এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় প্রতিনিয়ত সোচ্চার ভূমিকা পালন করে থাকেন। তাদের এই নজরদারি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী ও জনমুখী করে তোলে।
১৭। উদ্যোক্তা সৃষ্টি: তরুণ সমাজকে কেবল চাকরির পেছনে না ছুটিয়ে নতুন নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে এলিটরা মেন্টর হিসেবে কাজ করেন। তারা নতুন ব্যবসার আইডিয়া, স্টার্ট-আপ ফান্ডিং এবং ব্যবসায়িক কৌশল প্রদান করে তরুণদের স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেন। এই নতুন উদ্যোক্তারাই দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাদের হাত ধরেই দেশে নিত্যনতুন উদ্ভাবন এবং অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ সম্ভব হয়।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায় যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি মূলত এলিট শ্রেণীর দায়িত্বশীলতার ওপরই নির্ভর করে। এলিটরা যখন ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেন, তখন দেশের উন্নয়ন অবশম্ভাবী হয়ে ওঠে। তাদের সততা, দেশপ্রেম ও সঠিক দিকনির্দেশনাই একটি অনুন্নত রাষ্ট্রকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তাই একটি শোষণহীন ও উন্নত সমাজ গঠনে এলিটদের ইতিবাচক ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই।