- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: উপসংস্কৃতি হলো সংস্কৃতির একটি ক্ষুদ্র অংশ। কোনো বৃহৎ সংস্কৃতির মধ্যে যখন কোনো গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব বিশ্বাস, আচার-আচরণ, ঐতিহ্য, ভাষা বা মূল্যবোধ নিয়ে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলে, তখন তাকে উপসংস্কৃতি বলে। এটি মূল সংস্কৃতিরই একটি অংশ, তবে এর নিজস্ব কিছু বিশেষত্ব আছে, যা একে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।
শাব্দিক অর্থ: ‘উপসংস্কৃতি’ শব্দটি দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত: ‘উপ’ এবং ‘সংস্কৃতি’। ‘উপ’ শব্দের অর্থ হলো ‘ক্ষুদ্র’ বা ‘আংশিক’, আর ‘সংস্কৃতি’ বলতে বোঝায় কোনো মানবগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার সামগ্রিক রূপ। সুতরাং, উপসংস্কৃতি মানে হলো কোনো বৃহৎ সংস্কৃতির মধ্যে বিদ্যমান একটি ছোট বা আংশিক সংস্কৃতি।
সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, উপসংস্কৃতি হলো এমন একটি দল বা গোষ্ঠী, যারা নিজেদের মূল সংস্কৃতির পাশাপাশি কিছু স্বতন্ত্র প্রথা, মূল্যবোধ এবং জীবনশৈলী অনুসরণ করে। সাধারণত, বয়স, জাতি, ধর্ম, ভৌগোলিক অবস্থান, পেশা বা আগ্রহের ভিত্তিতে এই ধরনের উপগোষ্ঠী গঠিত হয়। যেমন, রক মিউজিক ভক্তদের একটি দল, বা বাইকারদের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী — এরা সবাই মূল সমাজের অংশ হলেও তাদের নিজস্ব কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে যা তাদের একটি উপসংস্কৃতি হিসেবে চিহ্নিত করে।
উপসংস্কৃতি নিয়ে সরাসরি সংজ্ঞা প্রদানকারী কয়েকজন উল্লেখযোগ্য গবেষক হলেন:
১. মিল্টন ইয়েঙ্গার (Milton M. Yinger): তিনি উপসংস্কৃতির সংজ্ঞায় বলেন, “উপসংস্কৃতি হলো কোনো সমাজের এমন একটি দল বা গোষ্ঠী, যার সদস্যদের মধ্যে এমন কিছু প্রথা বা বিশ্বাস বিদ্যমান, যা তাদের সমাজের মূল সংস্কৃতি থেকে কিছুটা আলাদা।” (A subculture is a social group with a distinctive pattern of beliefs, values, and norms that set it apart from the larger culture.)
২. জন সি. ম্যাটিও (John C. Macionis): তিনি উপসংস্কৃতিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে, “কোনো সংস্কৃতির অংশ, যা একই সমাজের অন্যদের থেকে কিছু স্বতন্ত্র মূল্যবোধ ও আচরণ দ্বারা আলাদা।” (A cultural pattern that sets apart some segment of a society’s population.)
৩. আলবার্ট কে. কোহেন (Albert K. Cohen): তিনি বলেন, “উপসংস্কৃতি হলো নির্দিষ্ট দলগুলোর মধ্যে প্রচলিত রীতিনীতির একটি সেট, যা সমাজের প্রধান সংস্কৃতির রীতিনীতি থেকে ভিন্ন।” (A subculture is a set of cultural patterns that are distinct from those of the larger society.)
৪. ক্লার্ক উইজলার (Clark Wissler): তিনি বলেন, “উপসংস্কৃতি হলো একটি সমাজের ক্ষুদ্র দল, যা নিজেদের মধ্যে কিছু সংস্কৃতিগত পার্থক্য তৈরি করে।” (A subculture is a small group in a society that creates some cultural differences among themselves.)
৫. ম্যাট টি. হিরশ (Matt T. Hirsch): তার মতে, “উপসংস্কৃতি হলো এমন একটি দল, যারা তাদের নিজস্ব ভাষা, স্টাইল এবং আচরণবিধি তৈরি করে, যা মূল সংস্কৃতির চেয়ে ভিন্ন।” (A subculture is a group that develops its own unique language, style, and code of conduct, which is different from the mainstream culture.)
৬. স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন (Samuel P. Huntington): তিনি যদিও সরাসরি উপসংস্কৃতির সংজ্ঞা দেননি, তবে তার ‘Civilization’ সংক্রান্ত গবেষণায় তিনি সংস্কৃতির ছোট ছোট উপবিভাগের ধারণা নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, “সভ্যতা হলো সংস্কৃতির সর্বোচ্চ গ্রুপ, আর উপসংস্কৃতি এই বড় সংস্কৃতির মধ্যেই অবস্থিত একটি ছোট উপবিভাগ।” (Civilization is the highest-level grouping of people and the broadest level of cultural identity people have short of that which distinguishes humans from other species.)
৭. অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary): অক্সফোর্ড ডিকশনারি উপসংস্কৃতিকে সংজ্ঞায়িত করেছে এভাবে, “বৃহত্তর সংস্কৃতির মধ্যে এমন একটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, যার নিজস্ব বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং প্রথা রয়েছে।” (A cultural group within a larger culture, often having beliefs or interests at variance with those of the larger culture.)
উপসংহার: উপসংস্কৃতি হলো একটি বৃহত্তর সমাজের মধ্যে বিদ্যমান একটি ছোট সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, যা তাদের নিজস্ব স্বতন্ত্র রীতিনীতি, মূল্যবোধ এবং জীবনযাত্রা দ্বারা মূল সংস্কৃতি থেকে আলাদা। এটি মূল সংস্কৃতির পরিপূরক হতে পারে অথবা কখনো কখনো তার থেকে কিছুটা ভিন্ন পথেও চলতে পারে। উপসংস্কৃতি সমাজের বৈচিত্র্য ও গতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীকে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় তুলে ধরার সুযোগ দেয়।
উপসংস্কৃতি হলো মূল সংস্কৃতির একটি ছোট অংশ, যা তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ, বিশ্বাস এবং জীবনশৈলী দ্বারা আলাদা।
২০১০ সালের একটি জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অনলাইন গেমিং কমিউনিটিগুলো একেকটি উপসংস্কৃতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে, যার সদস্য সংখ্যা ২০০৭ সালের তুলনায় প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০ সালে, একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দেখা যায়, ফ্যাশন, সঙ্গীত ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে উপসংস্কৃতির প্রভাব অনেক বেড়েছে।

