- readaim.com
- 0
উত্তর::প্রস্তাবনা: একুইনাসের মতে, শাশ্বত আইন (Eternal Law) হলো ঈশ্বরের সেই ঐশী পরিকল্পনা, যার মাধ্যমে তিনি সমগ্র মহাবিশ্বকে পরিচালনা করেন। এটি একুইনাসের প্রাকৃতিক আইন তত্ত্বের একটি মৌলিক ভিত্তি। এটি মানুষের বোধশক্তির বাইরে এবং চিরন্তন সত্য।
দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদ থমাস একুইনাসের চিন্তাধারায় শাশ্বত আইন একটি কেন্দ্রীয় ধারণা। এটি কেবল একটি দার্শনিক তত্ত্ব নয়, বরং সমগ্র সৃষ্টি ও তার পরিচালনার মূল ভিত্তি। একুইনাস বিশ্বাস করতেন যে, এই শাশ্বত আইন থেকেই অন্যান্য সকল আইন, যেমন— প্রাকৃতিক আইন, মানবীয় আইন এবং ঐশ্বরিক আইনের জন্ম। এটি এমন একটি সর্বজনীন ও চিরন্তন বিধান যা ঈশ্বর নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং যা সবকিছুকে তার নির্দিষ্ট পথে চালিত করে।
একুইনাসের মতে, শাশ্বত আইন হলো সেই ঐশ্বরিক যুক্তি বা প্রজ্ঞা, যা দিয়ে ঈশ্বর মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন এবং পরিচালনা করেন। এটি ঈশ্বরের মনের মধ্যে চিরকাল বিদ্যমান ছিল এবং এটি কখনো পরিবর্তিত হয় না। শাশ্বত আইন কোনো লিখিত বিধান নয়, বরং এটি ঈশ্বরের সর্বময় ক্ষমতার একটি প্রতিফলন। এটি মহাবিশ্বের প্রতিটি নিয়ম, নীতি এবং প্রাকৃতিক ঘটনার পেছনে কাজ করে।
একুইনাস শাশ্বত আইনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন:
- চিরন্তনতা: শাশ্বত আইন সময়ের ঊর্ধ্বে। এটি মহাবিশ্বের সৃষ্টির আগেও ছিল এবং সবসময় থাকবে।
- সর্বজনীনতা: এটি কেবল মানবজাতির জন্য নয়, বরং সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য প্রযোজ্য। প্রতিটি প্রাণী, প্রতিটি গ্রহ, প্রতিটি পরমাণু এই আইনের অধীন।
- অপরিবর্তনীয়তা: এটি অপরিবর্তনশীল। ঈশ্বরের পরিকল্পনা যেহেতু নিখুঁত, তাই শাশ্বত আইনের পরিবর্তন সম্ভব নয়।
জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা: মানুষ তার সীমিত জ্ঞান দিয়ে এই আইনের পূর্ণাঙ্গ রূপ উপলব্ধি করতে পারে না। আমরা কেবল এর কিছু অংশ বুঝতে পারি, যা প্রাকৃতিক আইনের মাধ্যমে আমাদের সামনে প্রকাশিত হয়।
একুইনাস শাশ্বত আইনকে একটি বিল্ডিংয়ের ব্লু-প্রিন্টের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেমন একজন স্থপতি একটি বিল্ডিং তৈরির আগে তার ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করেন, তেমনি ঈশ্বর মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে শাশ্বত আইনের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করেছেন। এই ব্লু-প্রিন্ট অনুসারে সবকিছু পরিচালিত হয়।
উপসংহার: শাশ্বত আইন হলো ঈশ্বরের সেই মৌলিক পরিকল্পনা, যা দিয়ে তিনি সমগ্র সৃষ্টিকে পরিচালনা করেন। এটি চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় এবং সর্বজনীন। মানুষের পক্ষে এই আইনের পূর্ণাঙ্গ রূপ উপলব্ধি করা সম্ভব না হলেও, এর প্রতিফলন আমরা প্রাকৃতিক আইনের মধ্যে দেখতে পাই। একুইনাসের এই ধারণা মধ্যযুগের দর্শন ও ধর্মতত্ত্বে এক গভীর প্রভাব ফেলেছিল এবং আজও এটি নৈতিক ও আইনি দর্শনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শাশ্বত আইন হলো ঈশ্বরের চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় ঐশী পরিকল্পনা, যা মহাবিশ্বকে পরিচালিত করে।
একুইনাস ১২২৫ সালে ইতালিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১২৭৪ সালে মারা যান। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সুমা থিওলজিকা’-তে শাশ্বত আইন-এর বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়। এই গ্রন্থটি ১৩শ শতাব্দীতে ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর দর্শন পরবর্তীকালে চার্চ এবং পশ্চিমা সভ্যতার আইন ও নৈতিকতার ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তার এই তত্ত্ব, বিশেষ করে প্রাকৃতিক আইন, এখনো আইনি দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

