- readaim.com
- 0
উত্তর।।ভূমিকা: প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটলকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। তিনি প্রায় ১৫৮টি দেশের সংবিধান বিশ্লেষণ করে সরকারের বিভিন্ন রূপ সম্পর্কে একটি বিস্তারিত শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করেছিলেন। তাঁর এই শ্রেণিবিভাগ আজও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক। এরিস্টটলের মতে, সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য হলো নাগরিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করা। সরকারের রূপ কেমন হবে, তা নির্ভর করে কারা শাসন করছে এবং তারা কার স্বার্থে শাসন করছে তার ওপর।
এরিস্টটল সরকারকে প্রধানত দুটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে শ্রেণিবিন্যাস করেছেন:
১. শাসন ক্ষমতা কতজন লোকের হাতে আছে: একজন, কয়েকজন, নাকি অনেকের হাতে।
২. শাসন ক্ষমতার উদ্দেশ্য: শাসকরা নিজেদের স্বার্থে শাসন করছে, নাকি জনগণের স্বার্থে।
এই দুটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এরিস্টটল সরকারকে ছয়টি ভাগে ভাগ করেছেন:
১. ভালো সরকার (Good Government): এই সরকারগুলো জনগণের কল্যাণের জন্য কাজ করে।
- রাজতন্ত্র (Monarchy): যখন একজন সৎ ও যোগ্য শাসক জনগণের স্বার্থে শাসন করেন। এটি হলো সরকারের সর্বোত্তম রূপ।
- অভিজাততন্ত্র (Aristocracy): যখন কয়েকজন যোগ্য ও জ্ঞানী ব্যক্তি জনগণের স্বার্থে শাসন করেন। এটি রাজতন্ত্রের পরের স্থান দখল করে।
- সংবিধান-ভিত্তিক সরকার (Polity): যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ জনগণের কল্যাণের জন্য শাসন করে। এটি একটি মিশ্র সরকার, যেখানে ধনী ও গরিবের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে। এরিস্টটলের মতে, এটি হলো আদর্শ সরকার।
২. বিকৃত সরকার (Perverted Government): এই সরকারগুলো নিজেদের বা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে শাসন করে।
- স্বৈরাচারী শাসন (Tyranny): যখন একজন শাসক নিজের স্বার্থে শাসন করে। এটি রাজতন্ত্রের বিকৃত রূপ।
- অলিগার্কি (Oligarchy): যখন অল্প কয়েকজন ধনী ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থে শাসন করে। এটি অভিজাততন্ত্রের বিকৃত রূপ।
- গণতন্ত্র (Democracy): এরিস্টটলের মতে, এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের শাসন হলেও এখানে গরিবরা নিজেদের স্বার্থে শাসন করে, যা ধনী শ্রেণির স্বার্থের পরিপন্থী। আধুনিক গণতন্ত্রের সঙ্গে এরিস্টটলের গণতন্ত্রের ধারণার পার্থক্য রয়েছে। আধুনিক গণতন্ত্রে সকল নাগরিকের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করা হয়।
শেষকথা: এরিস্টটল তার ‘পলিটিক্স’ গ্রন্থে সরকারের এই বিস্তারিত শ্রেণিবিন্যাস তুলে ধরেছেন, যা শাসন ব্যবস্থার মূলনীতি ও নৈতিকতার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করে।
এরিস্টটলের মতে, শাসন ক্ষমতা একজন, কয়েকজন বা অনেকের হাতে থাকুক, যদি তা জনগণের কল্যাণে পরিচালিত হয়, তবে তা ভালো সরকার; আর যদি তা শাসকের ব্যক্তিগত স্বার্থে পরিচালিত হয়, তবে তা বিকৃত সরকার।
এরিস্টটলের ছাত্র আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্রাজ্য বিস্তারের সময় এই রাজনৈতিক ধারণাগুলো কাজে লাগান। এরিস্টটলের এই শ্রেণিবিভাগটি ১৭শ শতাব্দীতে জন লক, রুশো এবং পরবর্তীতে ১৭৮৭ সালের মার্কিন সংবিধান প্রণয়নেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। এরিস্টটল ১৫৮টি শহরের সংবিধান পর্যালোচনা করে তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘পলিটিক্স’ রচনা করেন, যা রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে একটি স্বতন্ত্র জ্ঞান শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

