- readaim.com
- 0
উত্তর।।ভূমিকা: অ্যারিস্টটল, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলা হয়, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ছিল বাস্তবতার নিরিখে গড়ে ওঠা। তাঁর শিক্ষক প্লেটো একটি আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণা দিলেও অ্যারিস্টটল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা খুঁজছিলেন যা বাস্তবে প্রয়োগ করা সম্ভব। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের নৈতিক জীবন এবং সমাজের সার্বিক কল্যাণের জন্য একটি স্থিতিশীল ও মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী সরকার অপরিহার্য। তাঁর এই চিন্তাধারার ফসল হলো ‘পলিটি’ (Polity), যাকে তিনি সর্বোত্তম বাস্তবধর্মী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
অ্যারিস্টটলের মতে, সরকার বা রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রধানত তিন প্রকার: রাজতন্ত্র (Monarchy), অভিজাততন্ত্র (Aristocracy), এবং পলিটি (Polity)। এই তিনটি স্বাভাবিক বা ভালো সরকার। এদের বিকৃত রূপ হলো যথাক্রমে স্বৈরতন্ত্র (Tyranny), ধনিকতন্ত্র (Oligarchy), এবং গণতন্ত্র (Democracy)। তিনি এই ছয়টি রূপের মধ্যে ‘পলিটি’কেই সর্বোত্তম বাস্তবধর্মী রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
পলিটি হলো ধনিকতন্ত্র (Oligarchy) এবং গণতন্ত্র (Democracy)-এর একটি মিশ্র রূপ। ধনিকতন্ত্রে শাসন ক্ষমতা থাকে ধনীদের হাতে, আর গণতন্ত্রে শাসন ক্ষমতা থাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র মানুষের হাতে। উভয় ব্যবস্থাতেই কিছু ঝুঁকি থাকে। ধনিকতন্ত্রে ধনীরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে দরিদ্রদের শোষণ করে, ফলে সমাজে অস্থিতিশীলতা ও বিপ্লবের সম্ভাবনা তৈরি হয়। অন্যদিকে, গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্ররা ধনীদের অধিকার ও সম্পত্তি হরণ করতে পারে, যা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।
এই দুই ধরনের চরমপন্থার ঝুঁকি এড়াতে অ্যারিস্টটল একটি মিশ্র শাসনব্যবস্থার কথা বলেছেন, যেখানে ক্ষমতা থাকবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির (Middle Class) হাতে। পলিটিতে এমন কিছু ব্যবস্থা থাকে যেখানে ধনীদের সম্পদ এবং দরিদ্রদের সংখ্যাগত শক্তির মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা হয়। অ্যারিস্টটলের মতে, মধ্যবিত্ত শ্রেণিই হলো সবচেয়ে স্থিতিশীল ও যুক্তিবাদী। তারা ধনী ও দরিদ্র উভয় শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত এবং উভয়কেই বুঝতে পারে। তারা চরমপন্থী নয় এবং সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে চায়।
১. মধ্যবিত্ত শ্রেণির শাসন: এই ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির, যারা ধনিক ও দরিদ্র উভয় শ্রেণি থেকে বেশি হবে। এর ফলে সমাজে কোনো চরম বিভাজন সৃষ্টি হবে না।
২. আইনের শাসন: প্লেটোর মতো কোনো দার্শনিক রাজার শাসনের পরিবর্তে অ্যারিস্টটল আইনের শাসনের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, আইন হলো যুক্তির প্রতিফলন, যা ব্যক্তির শাসনের চেয়ে অনেক বেশি নিরপেক্ষ ও স্থিতিশীল।
৩. স্থিতিশীলতা ও বন্ধুত্ব: যেহেতু মধ্যবিত্তরা সমাজে ভারসাম্য বজায় রাখে, তাই পলিটি একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। এর ফলে সমাজে নাগরিক অসন্তোষ বা গৃহবিবাদের সম্ভাবনা কমে যায় এবং নাগরিকদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
অ্যারিস্টটল তার এই মতবাদকে কোনো কাল্পনিক আদর্শ হিসেবে দেখেননি, বরং বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থাগুলোর মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি সুস্থ সমাজ এবং সুখী জীবন গঠনের জন্য পলিটি সবচেয়ে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
উপসংহার: অ্যারিস্টটলের ‘পলিটি’ হলো এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা যা চরমপন্থার ঝুঁকি এড়িয়ে ধনিকতন্ত্র ও গণতন্ত্রের সমন্বয়ে গঠিত। এই মিশ্র শাসনব্যবস্থা সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর ভিত্তি করে স্থিতিশীলতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় অ্যারিস্টটলের এই ধারণা আজও প্রাসঙ্গিক, যা আইনের শাসন এবং সামাজিক ভারসাম্যের গুরুত্ব তুলে ধরে।
পলিটি হলো একটি বাস্তবসম্মত রাষ্ট্রব্যবস্থা, যা ধনী ও দরিদ্রের ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে মধ্যবিত্ত শ্রেণির শাসনের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
অ্যারিস্টটল তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘পলিটিক্স’-এ (Politics) এই ধারণাটি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে তিনি ১৫৮টি নগররাষ্ট্রের সংবিধান পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান। তিনি ৩৩৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এথেন্সে লাইসিয়্যুম (Lyceum) নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন, যা তার গবেষণার কেন্দ্র ছিল। তার এই পদ্ধতিকে তুলনামূলক রাজনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়।

