- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: কাশ্মীর সমস্যা ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়। এই অঞ্চলের অধিকার এবং নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি উভয় দেশের জাতীয় রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রায় সাত দশক ধরে চলমান এই বিরোধের মূলে রয়েছে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নানা কারণ, যা দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মনোভাবকে দৃঢ়ভাবে প্রভাবিত করে আসছে। এই নিবন্ধে আমরা কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মূল দৃষ্টিভঙ্গিগুলো সহজ ও আকর্ষণীয় ভাষায় আলোচনা করব।
১।অখণ্ড ভারতের অংশ: ভারত মনে করে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যটি আইনি, সাংবিধানিক এবং ঐতিহাসিক দিক থেকে ভারতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় কাশ্মীর রাজ্যের তদানীন্তন মহারাজা হরি সিং কর্তৃক ভারতভুক্তির চুক্তিতে (Instrument of Accession) সই করার মাধ্যমে এই রাজ্যটি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের অংশ হয়। ভারত এই চুক্তিকে চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় বলে মনে করে এবং জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতোই সমান গুরুত্ব দেয়। ভারতের সংবিধানে কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, যদিও ২০১৯ সালে ধারা ৩৭০ বাতিল করার মাধ্যমে সেই মর্যাদা প্রত্যাহার করা হয়, যা ভারতের মতে রাজ্যের সম্পূর্ণ ভারতীয়করণের একটি পদক্ষেপ।
২।স্বেচ্ছামূলক চুক্তি: ভারতের মূল যুক্তি হলো মহারাজা হরি সিংয়ের দ্বারা স্বাক্ষরিত ভারতভুক্তির চুক্তি ছিল সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক ও বৈধ। এই চুক্তির ফলে কাশ্মীর রাজ্যের প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার দায়িত্ব ভারতের হাতে আসে। ভারত সবসময়ই আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই চুক্তির বৈধতার উপর জোর দেয় এবং পাকিস্তানের দ্বারা কাশ্মীরের কিছু অংশ অবৈধভাবে দখল (पाक অধিকৃত কাশ্মীর বা PoK) করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে। ভারতের কাছে এই ইস্যুটি কোনো দ্বিপাক্ষিক বিবাদের বিষয় নয়, বরং এটি সন্ত্রাসবাদ এবং নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্ন। ভারতের দৃঢ় বিশ্বাস, এই ভূখণ্ডে বাইরের কোনো হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।
৩।ধর্মনিরপেক্ষতা ও বৈচিত্র্য: ভারত কাশ্মীর সমস্যাটিকে তার ধর্মনিরপেক্ষ নীতির একটি পরীক্ষা হিসাবে দেখে। তাদের মতে, কাশ্মীরকে ভারতের অংশ হিসাবে রাখা হলো এই নীতিরই প্রমাণ যে, একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যও ভারতের মতো একটি হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মনিরপেক্ষ দেশে শান্তিপূর্ণভাবে থাকতে পারে। ভারত সবসময়ই কাশ্মীরের জনগণের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ঐতিহ্যকে সম্মান করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তারা বিশ্বাস করে, কাশ্মীরের জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করাই এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার মূল চাবিকাঠি।
৪।দ্বিজাতি তত্ত্বের ব্যর্থতা: পাকিস্তান কাশ্মীরকে তাদের অসম্পূর্ণ দেশভাগের মূল কারণ হিসাবে দেখে। পাকিস্তানের কাছে কাশ্মীর একটি ধর্মীয় এবং জাতীয়তাবাদী প্রশ্ন। তারা মনে করে, যেহেতু কাশ্মীর উপত্যকা মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই দ্বিজাতি তত্ত্ব অনুযায়ী এটি পাকিস্তানের অংশ হওয়া উচিত ছিল। পাকিস্তান মনে করে, কাশ্মীরীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে অস্বীকার করে ভারত কার্যত দ্বিজাতি তত্ত্বকে অকার্যকর প্রমাণ করতে চাইছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
৫।কাশ্মীরীদের স্ব-নির্ধারণ: পাকিস্তান জোর দেয় যে কাশ্মীরের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে, যা জাতিসংঘের প্রস্তাব দ্বারা সমর্থিত। তারা চায়, জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তত্ত্বাবধানে কাশ্মীরে একটি গণভোট বা প্লেবিসাইট অনুষ্ঠিত হোক, যেখানে কাশ্মীরীরা ভারত বা পাকিস্তানের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে পারবে। পাকিস্তান মনে করে, ভারতের বর্তমান নিয়ন্ত্রণ কাশ্মীরের জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন নয় এবং এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমার্থক। তারা এই অঞ্চলের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি তাদের নৈতিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন বজায় রাখবে বলে অঙ্গীকারবদ্ধ।
৬।আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের দাবি: পাকিস্তান বারবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে, বিশেষ করে জাতিসংঘে কাশ্মীর সমস্যা উত্থাপন করে এবং এই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা কামনা করে। তারা ভারতকে কাশ্মীর উপত্যকায় সেনা মোতায়েন এবং মানবাধিকারের অপব্যবহারের জন্য অভিযুক্ত করে। পাকিস্তানের মূল উদ্দেশ্য হলো কাশ্মীর সমস্যাটিকে একটি আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, যাতে ভারতের উপর আলোচনা শুরু করার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হয়। তারা বিশ্বাস করে, কেবল আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমেই এই সমস্যার একটি ন্যায্য সমাধান সম্ভব।
৭।সীমান্ত সন্ত্রাসবাদ: ভারতের অভিযোগ, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ রেখা (LoC) পেরিয়ে সন্ত্রাসবাদী অনুপ্রবেশকে উৎসাহিত করে এবং সমর্থন করে। ভারত একে রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষিত সন্ত্রাসবাদ বলে আখ্যা দেয়, যার উদ্দেশ্য হলো কাশ্মীর উপত্যকায় অস্থিরতা সৃষ্টি করা। ভারত বারবার পাকিস্তানকে তার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা থেকে এই ধরনের কার্যকলাপ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান এই অভিযোগ অস্বীকার করে এবং বলে যে তারা কেবল কাশ্মীরীদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন করছে এবং ভারতের নিপীড়নের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের সাহায্য করছে।
৮।উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত কাশ্মীর উপত্যকায় উন্নয়নমূলক কাজ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিয়ে আসার উপর জোর দিয়েছে। ধারা ৩৭০ বাতিলের পর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সেখানে নতুন শিল্প, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অবকাঠামো তৈরির মাধ্যমে নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করতে চাইছে। ভারতের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক উন্নতির মাধ্যমে কাশ্মীরি যুবকদের মূল স্রোতে নিয়ে আসা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসিকতা দূর করা। তারা বিশ্বাস করে, শান্তিপূর্ণ উন্নয়নই কাশ্মীরের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতাবস্থার একমাত্র পথ।
৯।দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পথ: ভারত এবং পাকিস্তান উভয়ই মুখে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কথা বললেও, তাদের পূর্বশর্তের কারণে আলোচনা প্রায়শই থমকে যায়। ভারত জোর দিয়ে বলে যে সন্ত্রাসবাদ এবং আলোচনা একসাথে চলতে পারে না, তাই পাকিস্তানকে প্রথমে সন্ত্রাসবাদকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে, পাকিস্তান কাশ্মীরের মূল সমস্যাটিকে আলোচনায় অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি করে। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানগুলির ফলে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর সংলাপ শুরু করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে।
উপসংহার: কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মনোভাব মূলত সার্বভৌমত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে বিভক্ত। ভারতের কাছে এটি তার অখণ্ডতা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়, যেখানে পাকিস্তানের কাছে এটি অসম্পূর্ণ দেশভাগ ও ধর্মীয় ন্যায়বিচারের প্রতীক। দুই দেশের এই দৃঢ় ও বিপরীতমুখী অবস্থানই এই বিরোধকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। এই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান কেবল তখনই সম্ভব, যখন উভয় দেশ উভয়পক্ষের উদ্বেগগুলিকে সম্মান করবে এবং পারস্পরিক আস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আলোচনার টেবিলে আসবে।
- অখণ্ড ভারতের অংশ
- স্বেচ্ছামূলক চুক্তি
- ধর্মনিরপেক্ষতা ও বৈচিত্র্য
- দ্বিজাতি তত্ত্বের ব্যর্থতা
- কাশ্মীরীদের স্ব-নির্ধারণ
- আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের দাবি
- সীমান্ত সন্ত্রাসবাদ
- উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি
- দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পথ
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কাশ্মীর সমস্যার জন্ম হয় ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময়, যখন মহারাজা হরি সিং ভারতভুক্তির চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এরপর ১৯৪৮ সালে ভারত প্রথম জাতিসংঘে এই সমস্যা উত্থাপন করে। জাতিসংঘ ১৯৪৮ এবং ১৯৪৯ সালে গণভোটের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের অভাবে তা কার্যকর হয়নি। ১৯৬৫ এবং ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করেই সংঘটিত হয়। ১৯৭২ সালের সিমলা চুক্তি এবং ১৯৯৯ সালের লাহোর ঘোষণাপত্রে উভয় দেশ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের অঙ্গীকার করে। ৫ আগস্ট ২০১৯-এ ভারত সরকার ৩৭০ ধারা বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মীরকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করে, যা এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

