- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। সহজ ভাষায়, ক্ষমতা হলো অন্যদেরকে নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করাতে পারার সক্ষমতা, আর কর্তৃত্ব হলো সেই ক্ষমতাকে বৈধ বা ন্যায়সঙ্গত হিসেবে মেনে নেওয়ার স্বীকৃতি।
ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দুটিই সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মূল স্তম্ভ। ক্ষমতা হলো এমন একটি শক্তি, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্যকে কোনো কাজ করতে বাধ্য করতে পারে, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও। অন্যদিকে, কর্তৃত্ব হলো সেই ক্ষমতা যা সমাজ, আইন বা ঐতিহ্য দ্বারা স্বীকৃত এবং বৈধ বলে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ, কর্তৃত্ব হলো বৈধ ক্ষমতা। যেমন, একজন পুলিশ অফিসারের ক্ষমতা তার পোশাক ও ব্যাজ দ্বারা স্বীকৃত হয়, যা তার কর্তৃত্বের প্রতীক।
শাব্দিক অর্থ:-
- ক্ষমতা (Power): ল্যাটিন শব্দ ‘potere’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘সক্ষম হওয়া’।
- কর্তৃত্ব (Authority): ল্যাটিন শব্দ ‘auctoritas’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘প্রভাব, পরামর্শ, বা বৈধতা’।
বিভিন্ন পণ্ডিত ও গবেষক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো:
১। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber): ক্ষমতা হলো “সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে নিজের ইচ্ছা কার্যকর করার সম্ভাবনা, এমনকি অন্যদের প্রতিরোধের মুখেও।” অন্যদিকে, কর্তৃত্ব হলো “কোনো নির্দিষ্ট আদেশের প্রতি আনুগত্য পাওয়ার সম্ভাবনা।” (Power is ‘the probability of a person carrying out his own will despite resistance, regardless of the basis on which this probability rests.’ Authority is ‘the probability that a command with a given specific content will be obeyed by a given group of persons.’)
২। রবার্ট এ. ডাল (Robert A. Dahl): “এ যখন বি-কে এমন কিছু করতে বাধ্য করে যা বি অন্যথায় করতো না, তখন এ-এর বি-এর উপর ক্ষমতা আছে।” (Power is ‘A’s ability to get ‘B’ to do something ‘B’ would not otherwise do.’)
৩। এল.ডি. হোয়াইট (L.D. White): “কর্তৃত্ব হলো আদেশ ও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগের আইনি অধিকার।” (Authority is ‘the legal right to issue orders and to control.’)
৪। জে, এ. ডিগ (J. A. Dieg): “ক্ষমতা হলো অন্যদের প্রভাবিত করার বা নিয়ন্ত্রণ করার একটি কৌশল।” (Power is ‘a technique of influencing or controlling others.’)
৫। উড্র উইলসন (Woodrow Wilson): “কর্তৃত্ব হলো সেই ক্ষমতা যা প্রতিষ্ঠানের আইন বা নীতির উপর ভিত্তি করে তৈরি হয় এবং যার প্রতি জনগণ সম্মান ও আনুগত্য প্রদর্শন করে।” (Authority is ‘the power derived from the laws or principles of an institution and to which people show respect and obedience.’)
৬। স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন (Samuel P. Huntington): ক্ষমতা হলো “অন্যদের আচরণ প্রভাবিত করার ক্ষমতা, যা চাপ প্রয়োগ, প্রলোভন বা বিশ্বাস স্থাপনের মাধ্যমে অর্জন করা যায়।” (Power is ‘the ability to influence the behavior of others, which can be acquired through coercion, inducement, or persuasion.’)
৭। হারমান হেলার (Hermann Heller): “কর্তৃত্ব হলো এমন একটি সম্পর্কের একটি দিক, যা সমাজের সদস্যগণ স্বেচ্ছায় মেনে নেয়।” (Authority is ‘an aspect of a relationship that the members of a society voluntarily accept.’)
উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলির আলোকে আমরা বলতে পারি, ক্ষমতা হলো অন্যের আচরণকে প্রভাবিত করার, নিয়ন্ত্রণ করার বা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করাতে পারার একটি শক্তি, যা বিভিন্ন উৎস থেকে আসতে পারে। আর কর্তৃত্ব হলো সেই ক্ষমতার এমন একটি বৈধ রূপ, যা সমাজ, আইন বা প্রচলিত নিয়ম দ্বারা স্বীকৃত এবং যার প্রতি জনগণ স্বেচ্ছায় আনুগত্য প্রদর্শন করে। সহজভাবে বললে, ক্ষমতা হলো ‘করতে পারা’ এবং কর্তৃত্ব হলো ‘করার অধিকার’।
উপসংহার: ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব একে অপরের পরিপূরক হলেও এদের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। ক্ষমতা যেখানে চাপ ও জবরদস্তির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে পারে, সেখানে কর্তৃত্ব তার বৈধতা ও জনগণের সম্মতির উপর নির্ভরশীল। একটি রাষ্ট্র বা সমাজ যখন সুশৃঙ্খলভাবে চলতে চায়, তখন শুধু ক্ষমতা নয়, বরং বৈধ কর্তৃত্বের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তাই, সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য।
ক্ষমতা হলো প্রভাবিত করার সক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব হলো সেই সক্ষমতার বৈধ রূপ।
বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষমতার বৈধতা বা কর্তৃত্বের প্রতি মানুষের বিশ্বাস কমে গেলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৮ সালের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের পর বিভিন্ন দেশে সরকারের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, ২০১৯ সালের এক জরিপে দেখা যায়, বিশ্বের অনেক দেশে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ঐতিহ্যগত প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা হ্রাস পেয়েছে, যা ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ধারণার পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। এটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

