- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বিশ্ব অর্থনীতিতে গণচীনের অবিশ্বাস্য উত্থান একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা। দারিদ্র্যপীড়িত কৃষিপ্রধান দেশ থেকে মাত্র কয়েক দশকে চীন আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামোর সাথে পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এই অনন্য উন্নয়ন মডেলটি বিশ্বজুড়ে গভীর কৌতুহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
১। সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি: ১৯৭৮ সালে দেং জিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে চীন এই অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করে। এর মূল কথা হলো রাষ্ট্রের প্রধান নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে মুক্ত বাজারের সুবিধা গ্রহণ করা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে চীন একদিকে যেমন সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী রেখেছে, অন্যদিকে বেসরকারি উদ্যোগের বিকাশ ঘটিয়েছে। এটি তাদের অর্থনীতিতে এক নতুন গতিশীলতার সঞ্চার করে এবং বিশ্ববাজারে চীনের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে সুদৃঢ় করে তোলে।
২। উন্মুক্তকরণ নীতি: চীন বহির্বিশ্বের জন্য তাদের অর্থনীতি উন্মুক্ত করার মাধ্যমে বিশ্বায়নের যুগে প্রবেশ করে। তারা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দরজা খুলে দেয় এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের ওপর বিশেষ জোর দেয়। এর ফলে বিশ্বের বড় বড় কোম্পানিগুলো চীনে তাদের উৎপাদন কারখানা স্থাপন করতে শুরু করে। এই নীতি চীনকে খুব দ্রুত একটি অনুন্নত দেশ থেকে বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করতে সাহায্য করেছিল।
৩। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল: চীনের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা ‘সেজ’ (SEZ) প্রতিষ্ঠা করা। শেনজেন, শিয়ামেন এবং ঝুহাই-এর মতো অঞ্চলগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য কর মওকুফসহ অত্যন্ত নমনীয় আইন প্রণয়ন করা হয়। এই অঞ্চলগুলো দ্রুত বিপুল পরিমাণ বিদেশি পুঁজি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। ফলে এই এলাকাগুলো দেশের সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্য বৃদ্ধিতে প্রধান ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করেছে।
৪। কৃষি সংস্কার: চীন তাদের অর্থনৈতিক সংস্কারের সূচনা করেছিল মূলত গ্রামীণ কৃষি খাতকে পুনর্গঠন করার মাধ্যমে। তারা পুরনো যৌথ খামার ব্যবস্থা বাতিল করে ‘পারিবারিক দায়িত্ব ব্যবস্থা’ চালু করে। এর ফলে কৃষকরা তাদের উদ্বৃত্ত ফসল মুক্ত বাজারে বিক্রি করে লাভবান হওয়ার সুযোগ পায়। এই সংস্কারের ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায় এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব জোয়ার আসে।
৫। সস্তা শ্রমশক্তি: চীনের বিশাল জনসংখ্যাকে তারা দক্ষ এবং তুলনামূলক সস্তা শ্রমশক্তিতে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছিল। এই সুলভ ও কঠোর পরিশ্রমী জনশক্তি বিশ্বমানের পণ্য অত্যন্ত কম খরচে তৈরি করতে সাহায্য করেছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কম খরচে অধিক মুনাফার আশায় চীনে বিনিয়োগ করতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। চীনের এই জনসংখ্যাই একসময় অভিশাপ থেকে আশীর্বাদে পরিণত হয়ে দেশের ভাগ্য বদলে দেয়।
৬। অবকাঠামোগত উন্নয়ন: যেকোনো দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী যোগাযোগ এবং অবকাঠামো অপরিহার্য শর্ত। চীন সরকার শুরু থেকেই সড়ক, বুলেট ট্রেন, সমুদ্রবন্দর এবং বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে। বর্তমানে চীনের হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ এবং আধুনিক। এই বিশ্বমানের অবকাঠামো অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যকে যেমন গতিশীল করেছে, তেমনি বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও আকৃষ্ট করেছে।
৭। রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন: চীনের উন্নয়ন মডেলের একটি প্রধান ভিত্তি হলো অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে বৈশ্বিক বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদন করা। তারা ‘মেইড ইন চায়না’ ব্র্যান্ডের অধীনে সস্তা ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে ভারী যন্ত্রপাতি তৈরি শুরু করে। উন্নত ও অনুন্নত সব দেশের বাজারেই চীনা পণ্যের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হয়। এর ফলে চীনের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পৃথিবীর যেকোনো দেশের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
৮। দারিদ্র্য বিমোচন: গণচীনের উন্নয়ন মডেলের সবচেয়ে মানবিক এবং সফল দিক হলো অত্যন্ত দ্রুত গতিতে দারিদ্র্য দূরীকরণ। গত চার দশকে চীন প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করেছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চীনের এই সাফল্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষের আয় বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এটি একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।
৯। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন: চীন কেবল অন্যের প্রযুক্তি অনুকরণ করার নীতি থেকে বের হয়ে নিজস্ব উদ্ভাবনের ওপর জোর দিয়েছে। বর্তমানে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফাইভ-জি প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং মহাকাশ গবেষণায় বিশ্বের নেতৃত্ব দিচ্ছে। হুয়াওয়ে, শাওমি এবং টেনসেন্টের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টরা এখন চীনের মাটিতেই গড়ে উঠেছে। এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ চীনকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অন্যতম প্রধান নায়কে পরিণত করেছে।
১০। মানবসম্পদ উন্নয়ন: দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরিতে চীন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ নিশ্চিত করেছে। তারা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক এবং যুগোপযোগী করে তুলেছে। এর ফলে দেশটির তরুণ সমাজ আধুনিক কর্মক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হতে পেরেছে। সুস্থ ও কর্মক্ষম মানবসম্পদই চীনের প্রতিটি শিল্পকারখানাকে সচল ও উৎপাদনমুখী রাখতে ভূমিকা রাখছে।
১১। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: চীনের কমিউনিস্ট পার্টির একক নেতৃত্ব দেশে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে। গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মতো এখানে ঘন ঘন সরকার বা নীতি পরিবর্তনের কোনো ঝুঁকি থাকে না। এর ফলে সরকার যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বা মেগা প্রজেক্ট নির্বিঘ্নে বাস্তবায়ন করতে পারে। এই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ও কঠোর শৃঙ্খলা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত হতে দেয়নি।
১২। বৈদেশিক বিনিয়োগ: চীন একদিকে যেমন নিজেদের দেশে বিপুল পরিমাণ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই এনেছে, তেমনি বাইরেও বিনিয়োগ করেছে। তারা এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে খনিজ সম্পদ ও অবকাঠামো খাতে অর্থায়ন করছে। এই দ্বিমুখী বিনিয়োগ নীতি চীনের বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে প্রভাব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করছে।
১৩। বেল্ট অ্যান্ড রোড: এটি চীনের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী এবং বৃহৎ ভূ-অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনা। প্রাচীন সিল্ক রোডের আদলে বিশ্বজুড়ে স্থল ও সমুদ্রপথের এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করছে চীন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে তারা বিশ্বের প্রায় একশোরও বেশি দেশের সাথে সরাসরি বাণিজ্য যোগাযোগ স্থাপন করছে। এটি চীনের উৎপাদিত পণ্যের জন্য নতুন বাজার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে।
১৪। ভারী শিল্পের বিকাশ: চীন কেবল হালকা বা সস্তা পণ্য নয়, বরং ইস্পাত, জাহাজ নির্মাণ এবং রাসায়নিকের মতো ভারী শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। বিশ্বের মোট উৎপাদিত ইস্পাতের এক বিশাল অংশ এখন চীনেই তৈরি হয়। এই ভারী শিল্পগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও অবকাঠামো নির্মাণকে অত্যন্ত শক্তিশালী করেছে। এর ফলে চীনকে মৌলিক কাঁচামালের জন্য অন্য কোনো দেশের ওপর নির্ভর করতে হয় না।
১৫। অভ্যন্তরীণ বাজার সৃষ্টি: শুধু রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল না থেকে চীন এখন তাদের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারকে চাঙ্গা করছে। দেশটির মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় পণ্যের চাহিদাও ব্যাপক বেড়েছে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে কোনো মন্দা দেখা দিলেও চীনের নিজস্ব অর্থনীতি ভেঙে পড়ে না। এই বিশাল অভ্যন্তরীণ ভোক্তাশ্রেণী চীনের অর্থনৈতিক সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে।
১৬। নমনীয় মুদ্রা নীতি: চীন দীর্ঘকাল ধরে তাদের মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এর মান কৃত্রিমভাবে কমিয়ে রাখার নীতি অনুসরণ করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় চীনা পণ্যের দাম সবসময় অনেক কম থাকে। এই কৌশলগত মুদ্রা নীতির কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক উন্নত দেশ চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়েছে। এই নীতিটি চীনের রপ্তানি বাণিজ্যকে সবসময় প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রেখেছে।
১৭। নবায়নযোগ্য শক্তি: পরিবেশ দূষণের সমালোচনা এড়াতে চীন এখন সবুজ অর্থায়ন এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। তারা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌর প্যানেল এবং উইন্ড টারবাইন উৎপাদনকারী দেশ। বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইভি (EV) প্রযুক্তিতেও চীন এখন বৈশ্বিক বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে। এই পরিবেশবান্ধব রূপান্তর চীনের উন্নয়ন মডেলকে আরও আধুনিক ও ভবিষ্যৎমুখী করে তুলছে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, গণচীনের উন্নয়ন মডেলটি কোনো প্রচলিত অর্থনৈতিক তত্ত্বের অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং এটি ছিল সম্পূর্ণ নিজস্ব বাস্তবতার নিরিখে তৈরি একটি সফল পরীক্ষা। কঠোর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রিত মুক্ত বাজার অর্থনীতির এই মিশ্রণ বিশ্বকে এক নতুন পথ দেখিয়েছে। নানা অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও চীনের এই বিস্ময়কর উত্থানের গল্প পৃথিবীর যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য একটি অনন্য শিক্ষণীয় মডেল হিসেবে চিরকাল টিকে থাকবে।