- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: চীনের আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হলো ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত চলা সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতর থেকে পুঁজিবাদী মনোভাব দূর করতে এবং মাও সে তুঙের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এই বিপ্লব শুরু হয়েছিল। এটি চীনের রাজনীতি, সমাজ এবং অর্থনীতিকে গভীরভাবে ওলটপালট করে দিয়েছিল।
১। নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব: মাও সে তুঙের ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচির ব্যর্থতার পর পার্টির ভেতরে তাঁর প্রভাব অনেকটাই কমে গিয়েছিল। অন্যদিকে লিউ শাওচি এবং ডেং জিয়াওপিংয়ের মতো মাঝারি পন্থী নেতারা অর্থনীতি পুনর্গঠনে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন। মাও তাঁর হারিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং একচ্ছত্র আধিপত্য পুনরায় ফিরে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। এই অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই এবং নেতৃত্ব পুনরুদ্ধারের তীব্র আকাঙ্ক্ষা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল।
২। পুঁজিবাদের পুনরুত্থান: মাও সে তুঙ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরে আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। তাঁর ধারণা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো চীনেও সমাজতন্ত্রের আড়ালে গোপনে পুঁজিবাদের পুনরুত্থান ঘটছে। পার্টির ভেতরে থাকা এই বুর্জোয়া উপাদানগুলোকে পুরোপুরি নির্মূল করা তিনি অত্যন্ত জরুরি মনে করেছিলেন। সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে খাঁটি ও কলঙ্কমুক্ত রাখার এই তাগিদ বিপ্লবের পটভূমি তৈরি করে।
৩। শ্রেণি সংগ্রামের তীব্রতা: সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পরেও মাও মনে করতেন সমাজে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শ্রেণি সংগ্রাম শেষ হয়ে যায়নি। বুর্জোয়া ও সর্বহারা শ্রেণির মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব যেকোনো সময় সমাজতন্ত্রকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এই কাল্পনিক বা বাস্তব শ্রেণি সংগ্রামকে চাঙ্গা করে তিনি সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে চেয়েছিলেন। বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে রেখে সমাজ থেকে চিরতরে শ্রেণি বৈষম্য দূর করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।
৪। আদর্শগত বিচ্যুতি: সোভিয়েত ইউনিয়নে স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর ক্রুশ্চেভের নেতৃত্বে যে সংশোধনবাদী নীতি শুরু হয়েছিল, মাও তা তীব্র অপছন্দ করতেন। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে চীনের তরুণ সমাজও ক্রুশ্চেভের মতো বিপ্লবী আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়বে। চীনের সমাজকে সংশোধনবাদের হাত থেকে রক্ষা করতে তিনি এক নতুন আদর্শিক লড়াইয়ের ডাক দেন। সমাজতান্ত্রিক চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করার এই প্রয়াসই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের রূপ নেয়।
৫। গ্রেট লিপের ব্যর্থতা: ১৯৫৮ সালে শুরু হওয়া ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ পরিকল্পনাটি চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি করেছিল। এই ব্যর্থতার কারণে পার্টির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মাও সে তুঙকে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। নিজের রাজনৈতিক ভুল ঢাকতে এবং জনগণের অসন্তোষকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে তিনি নতুন চাল চালেন। এই মহাবিপর্যয় থেকে শিক্ষা না নিয়ে তিনি সমাজকে আরও চরমপন্থার দিকে ঠেলে দেন।
৬। তরুণদের উগ্রতা: মাও চীনের বিশাল তরুণ সমাজ বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের তাঁর উদ্দেশ্য সাধনের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন। তিনি তরুণদের মগজধোলাই করে ‘রেড গার্ড’ বা লাল ফৌজ নামক একটি উগ্র বাহিনী গঠন করেন। এই তরুণদের ভেতর বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ ও বিপ্লবী উন্মাদনা তৈরি করা হয়েছিল। মাওয়ের অন্ধ ভক্ত এই তরুণরাই পুরো চীনে ধ্বংসাত্মক তাণ্ডব চালাতে মূল ভূমিকা পালন করে।
৭। সংস্কৃতি সংস্কার: চীনের হাজার বছরের পুরনো সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও চিন্তাভাবনাকে মাও সমাজতন্ত্রের প্রধান শত্রু মনে করতেন। তিনি ঘোষণা করেন যে পুরনো সংস্কৃতি না বদলালে নতুন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা স্থায়ী হতে পারবে না। তাই সাহিত্য, শিল্প, নাটক এবং ঐতিহ্যবাহী চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে সম্পূর্ণ নতুন এক সর্বহারা সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার জন্য এই আন্দোলন শুরু হয়।
৮। চারটি পুরনো ধ্বংস: সাংস্কৃতিক বিপ্লবের একটি অন্যতম প্রধান শ্লোগান ছিল ‘চারটি পুরনো’ উপাদানকে সমাজ থেকে সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলা। এই উপাদানগুলো ছিল পুরনো চিন্তা, পুরনো সংস্কৃতি, পুরনো অভ্যাস এবং পুরনো রীতিনীতি। রেড গার্ডরা এই আদেশের নাম করে ঐতিহাসিক নিদর্শন, প্রাচীন উপাসনালয় এবং মূল্যবান বইপত্র পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়। মানুষের মন থেকে পুরনো সব সংস্কার মুছে ফেলার জন্য এই চরম ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল।
৯। আমলাতন্ত্রের অবসান: কমিউনিস্ট পার্টি এবং সরকারের উচ্চপদস্থ আমলারা সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছিল। মাও এই সুবিধাবাদী আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং একে সমাজতন্ত্রের পরিপন্থী মনে করতেন। তিনি চাইলেন সরকারি কর্মকর্তা ও বুদ্ধিজীবীদের অহংকার ভেঙে তাদের সাধারণ কৃষকদের সমপর্যায়ে নিয়ে আসতে। আমলাতন্ত্রের এই কঠোর নিয়ন্ত্রণ ভাঙার জন্যই তিনি সাধারণ জনগণকে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিলেন।
১০। লাল বইয়ের প্রভাব: মাও সে তুঙের বাণী ও রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে সংকলিত ‘লিটল রেড বুক’ বা লাল বইয়ের ব্যাপক প্রচার ঘটানো হয়েছিল। এই বইটি চীনের সাধারণ মানুষ এবং তরুণদের মাঝে এক ধরণের ধর্মীয় উন্মাদনার সৃষ্টি করেছিল। প্রতিটি মানুষের জন্য এই বই সাথে রাখা এবং এর নির্দেশ মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা হয়। এই বইয়ের অন্ধ অনুকরণ মানুষকে মাওয়ের যেকোনো আদেশ পালনে অন্ধভাবে প্ররোচিত করেছিল।
১১। বুদ্ধিজীবীদের দমন: সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সঠিক মূল্যায়নের নামে দেশের শিক্ষক, লেখক, বিজ্ঞানী এবং বুদ্ধিজীবীদের মূল শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মাও মনে করতেন এই শিক্ষিত সমাজই পুঁজিবাদী ও বুর্জোয়া চিন্তাভাবনা সমাজে টিকিয়ে রাখছে। ফলস্বরূপ হাজার হাজার বুদ্ধিজীবীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে গ্রামে পাঠিয়ে কায়িক শ্রমে বাধ্য করা হয়। সমাজকে মেধা ও যুক্তিহীন করে সম্পূর্ণ আনুগত্যের ছাঁচে ঢালতেই এই দমনপীড়ন চালানো হয়েছিল।
১২। সেনাবাহিনীর সমর্থন: মাও সে তুঙের এই চরমপন্থী আন্দোলন সফল করার পেছনে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিন পিয়াওয়ের অসামান্য অবদান ছিল। লিন পিয়াও চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি বা সেনাবাহিনীকে মাওয়ের অনুগত এক কট্টর বাহিনীতে পরিণত করেছিলেন। সেনাবাহিনীর এই পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সমর্থন মাওকে পার্টির অভ্যন্তরে অন্যান্য নেতাদের ওপর আধিপত্য বিস্তারে সাহায্য করে। সামরিক শক্তির এই রাজনৈতিক ব্যবহার সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে আরও বেশি উগ্র ও সহিংস করে তোলে।
১৩। শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন: সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় চীনের চিরাচরিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হয়েছিল এবং বছরের পর বছর স্কুল-কলেজ বন্ধ ছিল। মাও মনে করতেন পুঁথিগত বিদ্যা মানুষকে বুর্জোয়া বানায়, তাই শিক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পাঠ্যপুস্তকে কেবল সমাজতান্ত্রিক প্রচারণামূলক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং পরীক্ষার পদ্ধতি বাতিল করা হয়। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বাদ দিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলনে এবং গ্রামীণ শ্রমের কাজে যুক্ত করা হয়েছিল।
১৪। গ্রামাঞ্চলের উন্নয়ন: চীনের শহর ও গ্রামের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও জীবনযাত্রার বিশাল বৈষম্য দূর করা মাওয়ের অন্যতম লক্ষ্য ছিল। তিনি শহরের শিক্ষিত তরুণ ও চিকিৎসকদের জোরপূর্বক প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে পাঠিয়ে কৃষকদের সাথে কাজ করার নির্দেশ দেন। এর মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং গ্রামীণ মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে চেয়েছিলেন। তবে এই জোরপূর্বক অভিবাসন ব্যবস্থার ফলে দেশের উৎপাদন ও শিক্ষা দীক্ষায় চরম বিপর্যয় নেমে এসেছিল।
১৫। পররাষ্ট্র নীতির প্রভাব: সেই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে চীনের আদর্শিক ও সীমান্ত বিরোধ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। মাও আন্তর্জাতিক মহলে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে চীনই প্রকৃত ও খাঁটি মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্র অনুসরণ করছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাদী আগ্রাসনের ভয়কেও দেশের ভেতরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। এই বৈশ্বিক রাজনৈতিক চাপ ও একাকীত্ব মাওকে দেশের অভ্যন্তরে উগ্র জাতীয়তাবাদ ছড়াতে সাহায্য করে।
১৬। ব্যক্তিপূজার বিস্তার: মাও সে তুঙকে চীনের সাধারণ মানুষের কাছে এক অলৌকিক ও ত্রাতা সমতুল্য দেবতায় পরিণত করা হয়েছিল। সংবাদপত্র, রেডিও এবং পোস্টারের মাধ্যমে মাওয়ের অবদানের অতিরঞ্জিত প্রশংসা করে ব্যক্তিপূজার এক চরম পরিবেশ তৈরি হয়। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে মাও ভুল করতে পারেন না এবং তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তই অভ্রান্ত। এই অন্ধ ব্যক্তিপূজাই মাওকে পুরো দেশের ওপর সীমাহীন ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা চর্চার সুযোগ করে দেয়।
১৭। গ্যাং অব ফোরের: মাও সে তুঙের স্ত্রী জিয়াং কিং এবং তাঁর তিন কট্টর সহযোগী মিলে ‘গ্যাং অব ফোর’ বা চার চক্র গঠন করেছিলেন। এই চক্রটি মাওয়ের অসুস্থতা ও বার্ধক্যের সুযোগ নিয়ে পর্দার আড়াল থেকে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দেয়। তারা নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করতে এই উগ্র আন্দোলনকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ব্যবহার করেছিল। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নির্মমতা ও দীর্ঘস্থায়িত্বের পেছনে এই চক্রের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থ বড় কারণ ছিল।
শেষকথা: চীনের সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব মূলত আদর্শের আড়ালে এক ভয়াবহ রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লড়াই ছিল। মাও সে তুঙের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং পুঁজিবাদ দূর করার নামে এই আন্দোলন চীনের সমাজ, শিক্ষা ও অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। দশ বছর স্থায়ী এই উন্মাদনায় লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারায় এবং চীনের প্রগতি থমকে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৬ সালে মাওয়ের মৃত্যুর পর এই অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান ঘটে এবং চীন আধুনিকায়নের পথে যাত্রা শুরু করে।