- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: জাতীয়তাবাদ একালের অন্যতম প্রভাবশালী ও বিতর্কিত একটি মতাদর্শ। এটি এমন এক মানসিক অনুভূতি যা একটি নির্দিষ্ট জনসমষ্টিকে ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করে। এই বন্ধন থেকে জন্ম নেয় একাত্মতা, যা বিভিন্ন জাতির উত্থান ও স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। জাতীয়তাবাদের ধারণাটি আধুনিক বিশ্বের রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বোঝার জন্য অপরিহার্য।
“জাতীয়তাবাদ” শব্দটি ‘জাতি’ শব্দের সঙ্গে ‘বাদ’ প্রত্যয় যোগে গঠিত হয়েছে। ‘জাতি’ বলতে বোঝায় একই বংশোদ্ভূত, একই ভাষাভাষী বা একই সংস্কৃতিসম্পন্ন জনসমষ্টিকে। আর ‘বাদ’ প্রত্যয়টি এখানে মতাদর্শ বা বিশ্বাস অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং, শাব্দিক অর্থে জাতীয়তাবাদ হলো জাতিভিত্তিক কোনো মতাদর্শ বা বিশ্বাস।
জাতীয়তাবাদের পরিচয়
পরিচয়গত দিক থেকে জাতীয়তাবাদ হলো একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক মতাদর্শ যা একটি জাতির প্রতি গভীর অনুরাগ, একাত্মতা এবং আনুগত্যের অনুভূতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এই মতাদর্শে বিশ্বাসীরা নিজেদের জাতিকে অন্য যেকোনো পরিচয়ের ঊর্ধ্বে স্থান দেয় এবং জাতির স্বার্থ রক্ষা ও সমৃদ্ধি সাধনে ব্রতী হয়। জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি হলো ‘আমরা’ এবং ‘ওরা’ এই বিভাজন, যেখানে ‘আমরা’ বলতে নিজ জাতিকে এবং ‘ওরা’ বলতে অন্য জাতিকে বোঝানো হয়।
সাধারণ ভাষায়, জাতীয়তাবাদকে আমরা দেশপ্রেমের এক গভীরতর রূপ হিসেবে চিন্তা করি। যখন কোনো ব্যক্তি তার দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত এবং ভৌগোলিক সীমানার প্রতি তীব্র ভালোবাসা ও মমতা অনুভব করে, তখন তাকে জাতীয়তাবাদী বলা হয়। এই অনুভূতি থেকেই দেশের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করার মানসিকতা তৈরি হয়। যেমন, খেলার মাঠে নিজ দেশের দলকে সমর্থন করা থেকে শুরু করে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করা পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই জাতীয়তাবাদের প্রতিফলন দেখা যায়।
জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকরা নানা সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিম্নে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সংজ্ঞা উল্লেখ করা হলো:
১। এর্নেস্ট রেনান (Ernest Renan): “জাতীয়তাবাদ হলো একটি আধ্যাত্মিক ঐক্য যা অতীতের সম্মিলিত স্মৃতি ও বর্তমানের সম্মিলিত ইচ্ছার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে।” (“Nationalism is a spiritual principle based on the collective memory of the past and the collective will in the present.”)
২। জোসেফ স্টালিন (Joseph Stalin): “জাতীয়তাবাদ হলো একটি ঐতিহাসিকভাবে গঠিত স্থায়ী সম্প্রদায়ের ভাষা, ভূখণ্ড, অর্থনৈতিক জীবন ও মনস্তাত্ত্বিক গঠনের ভিত্তিতে সৃষ্ট চেতনা।” (“Nationalism is a historically constituted, stable community of language, territory, economic life, and psychological make-up.”)
৩। বেঞ্জামিন অ্যান্ডারসন (Benedict Anderson): “জাতীয়তাবাদ হলো একটি ‘কাল্পনিক সম্প্রদায়’ যা মানুষ নিজেদের মধ্যে তৈরি করে নেয়।” (“Nationalism is an ‘imagined community’ created by people within themselves.”)
৪। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: “জাতীয়তাবাদ মানুষের সংকীর্ণ স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে সার্বজনীন মানবতার দিকে এগিয়ে চলার পথে বাধা।” (“Nationalism is a great obstacle when it surpasses universal humanity.”)
৫। কার্ল মার্ক্স (Karl Marx): “জাতীয়তাবাদ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি হাতিয়ার যা শ্রমিক শ্রেণিকে বিভক্ত করে।” (“Nationalism is a tool of capitalism that divides the working class.”)
৬। এ্যান্থনি ডি. স্মিথ (Anthony D. Smith): “জাতীয়তাবাদ হলো একটি আদর্শ যা জাতির স্বায়ত্তশাসন, ঐক্য ও পরিচয়ের জন্য সংগ্রাম করে।” (“Nationalism is an ideology that struggles for a nation’s autonomy, unity, and identity.”)
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, জাতীয়তাবাদ একটি দ্বিমুখী তলোয়ারের মতো। এটি যেমন একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে পারে, তেমনই উগ্র জাতীয়তাবাদ সংঘাত, বিদ্বেষ এবং যুদ্ধের কারণ হতে পারে। তাই, একটি সুস্থ ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনে ইতিবাচক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদের চর্চা করা অপরিহার্য, যা অন্য জাতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নিজ জাতির সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।
জাতীয়তাবাদ হলো নিজ জাতির প্রতি সর্বোচ্চ আনুগত্য এবং একাত্মতার রাজনৈতিক মতাদর্শ।
জাতীয়তাবাদের ধারণাটি ১৮শ শতাব্দীর শেষে এবং ১৯শ শতাব্দীতে ইউরোপে বিকশিত হয়। ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) এর প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০১৮ সালের এক জরিপ অনুসারে, বিশ্বের অনেক দেশেই জাতীয়তাবাদী অনুভূতি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এটি একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতিতেও একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে বিদ্যমান।

