- readaim.com
- 0
ভূমিকা: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (INC) ভারতের প্রাচীনতম ও অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দলটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম সরকার গঠন করে। দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপরেখা প্রণয়নে কংগ্রেসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত উভয়ই। এই নিবন্ধে ভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের দীর্ঘ ও বহুমুখী অবদান নিয়ে আলোচনা করা হলো।
স্বাধীনতা সংগ্রাম — ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কবল থেকে ভারতকে মুক্ত করার জন্য ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস একটি প্রধান মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছিল। মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেলের মতো কিংবদন্তি নেতারা এই দলের মাধ্যমে স্বরাজ, অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মতো ঐতিহাসিক সংগ্রামগুলিতে নেতৃত্ব দেন। কংগ্রেসের নেতৃত্বেই দেশের জনগণ একজোট হয়েছিল এবং ভারতের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়েছিল, যা দলটির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। এই দলটি শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিল। (১)
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা – স্বাধীনতার পর, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ভারতের গণতান্ত্রিক ভিত্তি স্থাপন ও মজবুত করার ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে। প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে, কংগ্রেস সরকার ভারতের সংবিধান প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়, যা দেশকে একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, এবং গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। দলটির দীর্ঘ শাসনামলে নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বহু দলীয় ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়েছে। গণতন্ত্রের মূল কাঠামো, যেমন স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে বজায় রাখতে প্রাথমিক কংগ্রেস সরকারগুলির অবদান অনস্বীকার্য। (২)
ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা — ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কংগ্রেস প্রথম থেকেই বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির সহাবস্থানে বিশ্বাসী ছিল এবং এই আদর্শকে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। দলের নেতারা সব ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতি সমান সম্মান ও সুরক্ষার নীতি মেনে চলেছেন, যা একটি বহুত্ববাদী দেশে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে অপরিহার্য ছিল। যদিও পরবর্তীকালে এই বিষয়ে দলটির বিরুদ্ধে ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি করার অভিযোগ উঠেছে, তবুও ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের ধারণা প্রচারে কংগ্রেসের প্রাথমিক ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। (৩)
পাঁচশালা পরিকল্পনা — স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর অধীনে, পাঁচশালা পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি মিশ্র অর্থনীতি গ্রহণ করা হয়, যেখানে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগকেও উৎসাহিত করা হয়। শিল্পায়ন, সেচ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বৃহৎ পরিকাঠামো নির্মাণে এই পরিকল্পনাগুলি বিশেষ জোর দেয়। এর ফলস্বরূপ, ভারত অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা স্বনির্ভর হতে শুরু করে এবং কৃষি ও শিল্পের ক্ষেত্রে প্রাথমিক অগ্রগতি সাধিত হয়, যা আধুনিক ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। (৪)
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য — স্বাধীনতার পর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ব্যাপক বিস্তারে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়। সারা দেশে স্কুল, কলেজ, এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা ও মৌলিক শিক্ষাকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। একইসঙ্গে, এইমস (AIIMS)-এর মতো বড় হাসপাতাল এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র (PHC) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নয়ন করা হয়। এই পদক্ষেপগুলি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়ক হয়েছিল এবং সাক্ষরতার হার ও গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছিল। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে কংগ্রেসের এই প্রাথমিক বিনিয়োগের সুফল এখনো ভারতবাসী ভোগ করছে। (৫)
ভূমি সংস্কার — গ্রামীণ সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা ও কৃষকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সরকার বহু গুরুত্বপূর্ণ ভূমি সংস্কার আইন প্রণয়ন করে। জমিদারি প্রথা বিলোপ, ভূমি সিলিং আইন এবং ভাগচাষীদের অধিকার সুরক্ষিত করার মতো পদক্ষেপগুলি ছিল এর মধ্যে প্রধান। এই সংস্কারগুলির উদ্দেশ্য ছিল কৃষিজমির মালিকানা মুষ্টিমেয় মানুষের হাত থেকে মুক্ত করে প্রকৃত চাষীদের কাছে হস্তান্তর করা। যদিও এই সংস্কারগুলির বাস্তবায়নে অনেক ত্রুটি ও স্থানীয় বাধা ছিল, তবুও এটি গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। (৬)
রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ — প্রথম কয়েক দশক ধরে, ভারতীয় রাজনীতিতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস অবিসংবাদিত প্রাধান্য বজায় রেখেছিল। কেন্দ্র এবং বেশিরভাগ রাজ্যেই কংগ্রেসের একক শাসন ছিল, যাকে অনেকে ‘কংগ্রেস সিস্টেম’ নামেও অভিহিত করেন। এই শক্তিশালী রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সরকারকে দেশ গঠনের কাজে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে ও নীতিগুলি কার্যকর করতে সাহায্য করেছিল। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে এই একচ্ছত্র আধিপত্যের একটি ইতিবাচক ভূমিকা ছিল। তবে এর ফলে বিরোধী দলের স্থান সীমিত হয়ে গিয়েছিল, যা গণতন্ত্রের জন্য খুব একটা স্বাস্থ্যকর ছিল না। (৭)
ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ — ভারতের অর্থনীতিতে বৃহত্তর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের কাছে ঋণের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার ১৯৬৯ ও ১৯৮০ সালে প্রধান বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলিকে জাতীয়করণ করে। এই পদক্ষেপের ফলে ব্যাঙ্কগুলির মূল উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন থেকে সরে এসে গ্রামীণ ও কৃষি ক্ষেত্রে অর্থ সরবরাহ করা হয়। এর ফলস্বরূপ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (financial inclusion) বৃদ্ধি পায় এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কিছুটা কমে আসে। তবে এর ফলে ব্যাঙ্কগুলির দক্ষতা ও লাভজনকতা নিয়েও কিছু প্রশ্ন ওঠে, যদিও এটি ছিল কংগ্রেসের একটি সাহসী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। (৮)
সবুজ বিপ্লব — দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সরকারের অধীনে শুরু হওয়া ‘সবুজ বিপ্লব’ একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ১৯৬০-এর দশকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল বীজ, উন্নত সেচ ব্যবস্থা, এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার বাড়ানো হয়। এর ফলস্বরূপ, গম ও ধানের উৎপাদন বিপুলভাবে বৃদ্ধি পায় এবং ভারত খাদ্য আমদানিকারক দেশ থেকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে এর পরিবেশগত প্রভাব এবং আঞ্চলিক বৈষম্য বৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনা থাকলেও, দেশের খাদ্যের অভাব দূরীকরণে এর অবদান অনস্বীকার্য। (৯)
আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ — ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস স্বাধীনতার পর ভাষাগত ভিত্তিতে রাজ্য পুনর্গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলি পরিচালনা করে। বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি সংবেদনশীলতা দেখিয়ে কংগ্রেস সরকার রাজ্যগুলির সীমানা পুনর্বিন্যাস করে। এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক মানুষের আত্মসম্মান ও অধিকারকে মর্যাদা দিয়েছিল এবং জাতীয় ঐক্যের মধ্যে আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে স্থান দিয়েছিল। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট সহ বহু নতুন রাজ্য গঠিত হয়, যা আঞ্চলিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল। (১০)
অর্থনৈতিক উদারীকরণ — ১৯৯১ সালে, পি.ভি. নরসিমা রাওয়ের নেতৃত্বে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সরকার ভারতের অর্থনীতিতে এক ঐতিহাসিক মোড় নিয়ে আসে। সেই সময়ে অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর হাত ধরে অর্থনৈতিক উদারীকরণ (Economic Liberalization), বেসরকারিকরণ (Privatization), এবং বিশ্বায়ন (Globalization)-এর নীতি গ্রহণ করা হয়। এই সংস্কারগুলির ফলে লাইসেন্স রাজের অবসান ঘটে, বিদেশি বিনিয়োগের দরজা খুলে যায় এবং ভারতের অর্থনীতির দ্রুত বিকাশ শুরু হয়। যদিও এই পদক্ষেপ দলের ঐতিহ্যগত সমাজতান্ত্রিক আদর্শ থেকে কিছুটা সরে আসা ছিল, কিন্তু এটি আধুনিক ভারতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করে। (১১)
সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা — স্বাধীনতার সময় থেকেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। দলটির নেতৃত্বে সংবিধানে সংখ্যালঘুদের জন্য বিশেষ বিধান রাখা হয়, যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও নিজস্ব সংস্কৃতি বজায় রাখার অধিকার। কংগ্রেস সরকারগুলি এই সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করেছে। যদিও পরবর্তীকালে রাজনৈতিক বিরোধীরা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের তুষ্টিকরণের অভিযোগ তুলেছে, তবুও একটি বহুসাংস্কৃতিক দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনে আস্থার ভাব তৈরি করতে দলটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। (১২)
মহিলাদের ক্ষমতায়ন — ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস মহিলাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন ভারতের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র মহিলা প্রধানমন্ত্রী, যিনি বিশ্ব মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। কংগ্রেস সরকার হিন্দু কোড বিলের মতো আইন প্রণয়ন করে মহিলাদের সম্পত্তির অধিকার ও বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার প্রদান করে। এছাড়াও, স্থানীয় সরকারে (পঞ্চায়েত ও পৌরসভা) মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ করার মাধ্যমে মহিলাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি করা হয়। (১৩)
দুর্নীতি ও পতন — দীর্ঘকাল ধরে ক্ষমতায় থাকার ফলস্বরূপ, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও স্বজনপোষণের অভিযোগ উঠেছে। বড় বড় কেলেঙ্কারি যেমন বোফর্স, ২জি স্পেকট্রাম, এবং কয়লা কেলেঙ্কারি দলটির ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। এই দুর্নীতি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণে দলটির ওপর জনগণের আস্থা কমতে শুরু করে। এর ফলস্বরূপ, দলটি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নিজের প্রধান অবস্থান হারায় এবং ২০১৪ সাল থেকে শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকায় নেমে আসে। (১৪)
ঐতিহ্যগত ভোটব্যাঙ্ক — স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাফল্যের অন্যতম কারণ ছিল দেশের বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত একটি বিশাল ভোটব্যাঙ্ক। এই ভোটব্যাঙ্কে ব্রাহ্মণ, দলিত, মুসলিম, এবং আদিবাসীরা অন্তর্ভুক্ত ছিল। দলটির সমাজতান্ত্রিক নীতি ও ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ এই গোষ্ঠীগুলিকে একত্রিত করতে সাহায্য করেছিল। তবে সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের উত্থান এবং সামাজিক সমীকরণের পরিবর্তনের ফলে এই ঐতিহ্যগত ভোটব্যাঙ্কটি ভেঙে যায়। এর ফলে জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের ভোটের ভাগ ও আসন সংখ্যা কমতে শুরু করে। (১৫)
নেতৃত্বের উত্তরাধিকার — ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলটিতে নেহেরু-গান্ধী পরিবারের নেতৃত্ব দীর্ঘকাল ধরে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। জওহরলাল নেহেরু, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী এবং সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধীর মতো নেতারা দলের প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। এই পারিবারিক উত্তরাধিকার একদিকে যেমন দলকে একজোট রাখতে ও একটি জাতীয় প্রতীক হিসেবে পরিচিতি দিতে সাহায্য করেছে, তেমনি অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব ও অ-পারিবারিক নেতাদের উত্থান সীমিত করার জন্য সমালোচিত হয়েছে। (১৬)
বর্তমান বিরোধী ভূমিকা — সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস জাতীয় রাজনীতিতে তার প্রধান অবস্থান হারিয়েছে এবং বর্তমানে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে। কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্তগুলির গঠনমূলক সমালোচনা করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যদিও দলটি এখন বিভিন্ন রাজ্য ও স্থানীয় স্তরে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন, তবুও এটি দেশের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে গণতন্ত্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে চেষ্টা করছে। (১৭)
উপসংহার — ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ভারতের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং আধুনিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় যে মৌলিক ও অপরিসীম ভূমিকা রেখেছে, তা অনস্বীকার্য। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক উদারীকরণ পর্যন্ত, দলটি দেশের ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী ও নির্মাতা। যদিও সময়ের সাথে সাথে দুর্নীতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং নেতৃত্বের প্রশ্নের কারণে দলটির প্রভাব হ্রাস পেয়েছে, তবুও ভারতের রাজনৈতিক কাঠামোতে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং আদর্শগত ভিত্তি সুদূরপ্রসারী। আজকের ভারতীয় রাজনীতিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী শক্তি হিসেবে কাজ করে চলেছে।

