- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: জাতীয় সংহতি হলো একটি রাষ্ট্রের প্রাণভোমরা। এটি এমন এক গভীর মানসিক ও আত্মিক বন্ধন, যা একটি দেশের ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং জাতিসত্তার মানুষকে এক অভিন্ন পরিচয়ের সূত্রে গেঁথে ফেলে। এই সংহতি কোনো চাপানো বিষয় নয়, বরং এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে ভাতৃত্ববোধ, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনে জাতীয় সংহতির গুরুত্ব অপরিসীম।
শাব্দিক অর্থ: ‘জাতীয় সংহতি’ দুটি শব্দের সমন্বয়। ‘জাতীয়’ বলতে একটি নির্দিষ্ট দেশ বা রাষ্ট্রের জনগণ সম্পর্কিত বিষয়কে বোঝায় এবং ‘সংহতি’ (Integration) শব্দের অর্থ হলো ঐক্য, একতা বা সুসংগঠিত হওয়া। অতএব, আভিধানিক অর্থে জাতীয় সংহতি বলতে একটি জাতির বা দেশের জনগণের মধ্যেকার ঐক্য, একতা এবং একাত্মতার অনুভূতিকে বোঝায়।
জাতীয় সংহতি হলো মূলত একটি মানসিক প্রক্রিয়া ও গভীর অনুভূতি, যার মাধ্যমে একটি দেশের নাগরিকেরা তাদের আঞ্চলিক, ভাষাগত, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ভিন্নতা সত্ত্বেও নিজেদেরকে একটি বৃহত্তর জাতীয় কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনুভব করে। এটি দেশের প্রতি আনুগত্য, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে ব্যক্তিগত বা ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখার মনোভাবকে উৎসাহিত করে। এর মূল লক্ষ্য হলো বৈচিত্র্যের মধ্যে একতা প্রতিষ্ঠা করা।
জাতীয় সংহতিকে বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষকগণ ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিচে তাদের মধ্যে কয়েকজনের সংজ্ঞা দেওয়া হলো:
১. ডঃ এস. রাধাকৃষ্ণান (Dr. S. Radhakrishnan): “জাতীয় সংহতি কোনো ইঁটের গাঁথুনি বা ইস্পাতের কাঠামোর মতো নয়, বরং এটি হলো হৃদয় ও মনের মিলন, চিন্তার একতা এবং আবেগ অনুভূতির ঐক্য।” (National integration is not a matter of bricks and mortar, but a process of mind and heart, unity of thought, and emotional unity.)
২. জওহরলাল নেহেরু (Jawaharlal Nehru): “জাতীয় সংহতি হলো মানুষের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত সেই গভীর অনুভূতি যা মানুষকে জাতিগত, ভাষাগত, ধর্মীয় বা আঞ্চলিক বিভাজন ভুলে গিয়ে এক জাতি হিসেবে অনুভব করতে শেখায়।” (National integration is that deep feeling embedded in the hearts of the people which makes them feel as one nation, forgetting racial, linguistic, religious or regional differences.)
৩. অধ্যাপক এম. এন. শ্রীনিবাস (Prof. M. N. Srinivas): “জাতীয় সংহতি হলো সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একটি বহুধাবিভক্ত সমাজের অংশগুলি বৃহত্তর সমাজের সাথে একটি অর্থপূর্ণ ঐক্য বা সমন্বয় খুঁজে পায়।” (National integration is the process by which the parts of a divided society find a meaningful unity or coordination with the larger society.)
৪. ডঃ ভি. ভি. গিরি (Dr. V. V. Giri): “জাতীয় সংহতি হলো সকলের প্রতি শ্রদ্ধার মনোভাব এবং নিজ দেশের প্রতি সর্বোচ্চ আনুগত্য প্রকাশ।” (National integration is the attitude of respect for all and supreme loyalty to one’s own country.)
৫. ই. এন. ভেঙ্কটাচারী (E. N. Venkatachari): “জাতীয় সংহতি হলো সমাজের বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন এবং সেই সম্পর্ককে বজায় রাখার এক চলমান প্রক্রিয়া।” (National integration is a continuous process of establishing and maintaining harmonious relations among the various elements of society.)
৬. ড. রামসে ম্যুর (Dr. Ramsay Muir): “জাতীয় সংহতি হলো মানুষের মধ্যে সেই ঐক্যবোধ, যা তাদের মধ্যেকার ভিন্নতাকে গৌণ করে জাতীয় স্বার্থকে মুখ্য করে তোলে।” (National integration is the feeling of oneness among people which subordinates their differences and highlights the national interest.)
৭. অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary): “জাতীয় সংহতি হলো একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার বা একটি সমাজে বিভিন্ন বর্ণের বা জাতিগোষ্ঠীর মানুষের একতাবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া।” (National integration is the process of unifying a nation or the coming together of people of different races or ethnic groups in a society.)
জাতীয় সংহতি হলো একটি দেশের বহুভাষিক, বহুজাতিক, ও বহুসাংস্কৃতিক মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠা সেই মানসিক ও আত্মিক ঐক্য, যা সংবিধানের প্রতি আনুগত্য এবং বৃহত্তর জাতীয় লক্ষ্যের প্রতি অঙ্গীকারের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং প্রগতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে বৈচিত্র্যের মধ্যে একতা নিশ্চিত করে।
উপসংহার: জাতীয় সংহতি কেবল একটি রাষ্ট্রনৈতিক স্লোগান নয়, এটি একটি জাতির অস্তিত্ব ও সাফল্যের মূল ভিত্তি। এই সংহতি দেশের নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস, বোঝাপড়া এবং ঐক্যের সেতুবন্ধন রচনা করে। যখন দেশের প্রতিটি নাগরিক নিজস্ব বৈচিত্র্য বজায় রেখেও একটি বৃহত্তর জাতীয় পরিচয়ে গর্বিত বোধ করে, তখনই সেই জাতি আভ্যন্তরীণ শক্তি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে বিশ্ব মঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। এই সংহতিকে রক্ষা করা এবং আরও দৃঢ় করা প্রতিটি নাগরিকেরই নৈতিক দায়িত্ব।
জাতীয় সংহতি হলো একটি জাতির সকল নাগরিকের মধ্যে ধর্ম, ভাষা ও আঞ্চলিকতার ঊর্ধ্বে ভাতৃত্ববোধ এবং ঐক্যবদ্ধতার গভীর অনুভূতি।
জাতীয় সংহতি হলো এক চলমান প্রক্রিয়া। ভারতে, ১৯৫২ সালে কেন্দ্রীয় সরকার শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে সংহতির প্রাথমিক প্রচেষ্টা শুরু করে। ১৯৬১ সালে জওহরলাল নেহেরুর উদ্যোগে জাতীয় সংহতি কাউন্সিল (National Integration Council – NIC) গঠিত হয়। বিভিন্ন জরিপ দেখায় যে, যুব সমাজের মধ্যে দেশের প্রতি সংহতিবোধ বাড়াতে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন এবং ২০০১ সালের সর্বশিক্ষা অভিযানের মতো পদক্ষেপগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

