- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উনিশ দফা কর্মসূচি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচি হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৭ সালে ঘোষিত এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, গ্রামীণ জনগণের জীবনমান বৃদ্ধি, উৎপাদন বৃদ্ধি, আত্মনির্ভরতা সৃষ্টি এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। এটি মূলত উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সংস্কারের একটি পরিকল্পনা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল।
জিয়াউর রহমানের উনিশ দফা কর্মসূচির পরিচয়:
শাব্দিক অর্থ: “উনিশ” অর্থ হলো ১৯টি এবং “দফা” অর্থ হলো নির্দিষ্ট দাবি, বিষয় বা কর্মপরিকল্পনা। “কর্মসূচি” বলতে কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য গৃহীত পরিকল্পনাকে বোঝায়। তাই উনিশ দফা কর্মসূচির শাব্দিক অর্থ হলো ১৯টি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও পরিকল্পনার সমন্বয়ে গঠিত একটি কর্মসূচি।
জিয়াউর রহমানের উনিশ দফা কর্মসূচি: জিয়াউর রহমানের উনিশ দফা কর্মসূচি ছিল দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি, দুর্নীতি দমন, জনকল্যাণ নিশ্চিত করা এবং জনগণের অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার একটি পরিকল্পনা। এই কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসন ও জাতীয় সংহতির ওপর গুরুত্ব দেন।
উনিশ দফা কর্মসূচির মূলকথা:
১। কৃষি উন্নয়ন: উনিশ দফা কর্মসূচির অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল কৃষির উন্নয়ন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকদের সহায়তা প্রদান, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কৃষির উন্নয়নকে জাতীয় অগ্রগতির ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
২। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা: দেশের খাদ্য ঘাটতি দূর করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা উনিশ দফার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকদের উৎসাহিত করার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
৩। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ: দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি বাংলাদেশের উন্নয়নের বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
৪। গ্রামীণ উন্নয়ন: উনিশ দফা কর্মসূচিতে গ্রামকে উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার এবং গ্রাম পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে জনগণের জীবনমান উন্নয়নের চেষ্টা করা হয়।
৫। শিল্প উন্নয়ন: কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য শিল্প খাতের উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করার বিষয়টি এই কর্মসূচির অংশ ছিল।
৬। শিক্ষা বিস্তার: উনিশ দফা কর্মসূচিতে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিরক্ষরতা দূর করা, কারিগরি শিক্ষা বৃদ্ধি এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
৭। স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন: সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা এবং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের বিষয়টি উনিশ দফার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৮। দুর্নীতি দমন: প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার জন্য দুর্নীতি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সরকারি কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য এই কর্মসূচির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
৯। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা: উনিশ দফা কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বৃদ্ধি করা। রাজনৈতিক বিভাজন কমিয়ে দেশের উন্নয়নে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।
১০। আত্মনির্ভরতা অর্জন: দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে আত্মনির্ভরতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিজস্ব সম্পদ, শ্রম ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলাই ছিল এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্যগুলোর একটি।
উপসংহার: জিয়াউর রহমানের উনিশ দফা কর্মসূচির মূলকথা ছিল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জনগণের জীবনমান বৃদ্ধি এবং আত্মনির্ভর বাংলাদেশ গঠন। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প ও প্রশাসনিক উন্নয়নের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ও উন্নয়নমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে এই কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়েছিল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচিত।