- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা:-জেন্ডার অসমতা একটি বৈশ্বিক সমস্যা যা সমাজের প্রতিটি স্তরে নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে। শিক্ষা, চাকরি, রাজনীতি ও পারিবারিক ক্ষেত্রে এই অসমতা সুস্পষ্ট। বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের ১৪০টি দেশে নারী-পুরুষের বেতন বৈষম্য ২০% এর বেশি। এই নিবন্ধে জেন্ডার অসমতার প্রধান কারণগুলো বিশদভাবে আলোচনা করা হবে।
১।সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতি :- সমাজে প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও রীতিনীতি জেন্ডার অসমতার মূল কারণ। অনেক সংস্কৃতিতে নারীকে গৃহস্থালির কাজের জন্য এবং পুরুষকে আয়কারী হিসেবে দেখা হয়। ইউনেস্কোর ২০২১ সালের জরিপে দেখা গেছে, ৬০% দেশে নারীদের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ সাংস্কৃতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে সীমিত। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে অসমতা দূর করা কঠিন।
২।অর্থনৈতিক বৈষম্য :- নারীদের কাজকে প্রায়ই অবমূল্যায়ন করা হয়, ফলে তাদের বেতন কম থাকে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, ২০২৩ সালে বৈশ্বিকভাবে নারীদের গড় আয় পুরুষের তুলনায় ১৬% কম। অনেক ক্ষেত্রে নারীদের কাজের স্বীকৃতি না দেওয়ায় তারা দারিদ্র্যের শিকার হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ২০২০ সালের রিপোর্টে দেখা যায়, ৭০% নারী অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেখানে সামাজিক সুরক্ষা নেই।
৩।শিক্ষার অভাব :- শিক্ষার অভাবে নারীরা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারে না। ইউনিসেফের ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের ১২৯ মিলিয়ন মেয়ে স্কুলে যায় না। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকায় মেয়েদের শিক্ষার হার অনেক কম। শিক্ষা না পেলে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে না, ফলে জেন্ডার অসমতা বাড়ে।
৪।রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব :- রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ কম থাকায় তাদের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বের মাত্র ২৬% সংসদ সদস্য নারী। বাংলাদেশে নারী সংসদ সদস্য ২০.৬% (২০২৪)। নেতৃত্বের পদে নারীদের অনুপস্থিতি নীতিনির্ধারণে তাদের প্রভাব কমিয়ে দেয়।
৫।বৈষম্যমূলক আইন :- অনেক দেশে এখনও নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার আইন নেই। বিশ্বব্যাংকের ২০২১ সালের গবেষণায় দেখা যায়, ১০০টিরও বেশি দেশে নারীদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইন পুরুষদের চেয়ে পিছিয়ে। এমন আইন নারীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল করে তোলে।
৬।সহিংসতা ও হয়রানি :- নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও যৌন হয়রানি তাদের স্বাধীনতাকে ব্যাহত করে। WHO-এর ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৩৫% নারী শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার। কর্মক্ষেত্রে হয়রানির কারণে অনেক নারী চাকরি ছেড়ে দেন, যা অর্থনৈতিক অসমতা বাড়ায়।
৭।লিঙ্গভিত্তিক কাজের বিভাজন :- “নারীর কাজ” ও “পুরুষের কাজ” বলে সমাজে একটি বিভাজন রয়েছে। ILO-র ২০২২ সালের রিপোর্টে দেখা যায়, নারীরা বাড়ির কাজে পুরুষের চেয়ে ৩ গুণ বেশি সময় দেন। এই অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমের কোনো আর্থিক মূল্য নেই, ফলে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়েন।
৮।স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য :- নারীরা প্রায়ই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হন। UNICEF-এর ২০২১ সালের জরিপে দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ৫০% নারীর প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিতে বাধার সম্মুখীন হন। গর্ভাবস্থায় অপর্যাপ্ত চিকিৎসা ও পুষ্টির অভাবে নারীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ে।
৯।প্রযুক্তি ও ডিজিটাল বিভাজন :- প্রযুক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ কম। UNESCO-র ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মাত্র ৩০% STEM (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গণিত) শিক্ষার্থী নারী। প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকায় নারীরা উচ্চ আয়ের চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
১০।ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যা :- কিছু ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যা নারীদের অধিকার সীমিত করে। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে নারীদের শিক্ষা, চাকরি ও ভ্রমণের উপর ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই সংস্কৃতি পরিবর্তন না হলে জেন্ডার সমতা অর্জন কঠিন হবে।
উপসংহার:- জেন্ডার অসমতা দূর করতে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, আইন ও নীতির পরিবর্তন প্রয়োজন। নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে জোর দিতে হবে। সরকার, সমাজ ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ালেই কেবল এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব। একটি সমতাপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তুলতে সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।
🔹 সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতি
🔹 অর্থনৈতিক বৈষম্য
🔹 শিক্ষার অভাব
🔹 রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব
🔹 বৈষম্যমূলক আইন
🔹 সহিংসতা ও হয়রানি
🔹 লিঙ্গভিত্তিক কাজের বিভাজন
🔹 স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য
🔹 প্রযুক্তি ও ডিজিটাল বিভাজন
🔹 ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যা
বিশ্বজুড়ে জেন্ডার সমতার লড়াই চলছে। ১৯৭৯ সালে CEDAW (Convention on the Elimination of All Forms of Discrimination Against Women) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা নারী অধিকারের মাইলফলক। ২০২৩ সালের Global Gender Gap Report অনুযায়ী, আইসল্যান্ড ৯১% সমতা অর্জন করে প্রথম স্থানে আছে, আর বাংলাদেশ ৭২তম। ২০১০ সালে UN Women প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারী অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীদের এগিয়ে নেওয়ার জন্য SDG-5 (লিঙ্গ সমতা) অর্জনে কাজ করা হচ্ছে।

