- readaim.com
- 0
উত্তর।। মুখবন্ধ: টমাস হবস, একজন ইংরেজ দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর সার্বভৌমত্বের তত্ত্বটি আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। হবস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “লেভিয়াথান”-এ এই তত্ত্বটি বিশদভাবে আলোচনা করেছেন, যেখানে তিনি মানুষের প্রকৃতি, রাষ্ট্র ও সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, সার্বভৌম ক্ষমতা হলো এমন এক চূড়ান্ত ও অবিভাজ্য শক্তি, যা সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। হবস মনে করতেন, মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা ছিল বিশৃঙ্খলা ও ভয়ভীতির, যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ স্বেচ্ছায় নিজেদের স্বাধীনতা ত্যাগ করে একটি সার্বভৌম শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে।
টমাস হবসের সার্বভৌম তত্ত্ব মূলত একটি সামাজিক চুক্তির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তাঁর মতে, মানুষের প্রাকৃতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর, যেখানে “প্রত্যেকের বিরুদ্ধে প্রত্যেকের যুদ্ধ” (war of all against all) চলছিল। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় শক্তির হাতে নিজেদের সকল ক্ষমতা তুলে দেয়। এই কেন্দ্রীয় শক্তিই হলো সার্বভৌম। এই সার্বভৌম ক্ষমতা চূড়ান্ত, অবিভাজ্য এবং অসীম। সার্বভৌম শাসক আইন তৈরি করেন, বিচার করেন, যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং শান্তির প্রতিষ্ঠা করেন। হবস মনে করতেন, এই সার্বভৌম ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা বা ভাগ করা সম্ভব নয়, কারণ তা করলে সমাজ আবার বিশৃঙ্খলায় ফিরে যাবে। তাই, মানুষের প্রধান কর্তব্য হলো এই সার্বভৌম শক্তির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা।
টমাস হবসের সার্বভৌম তত্ত্বের বৈশিষ্ট্য
১. অবিচ্ছিন্ন এবং অবিভাজ্য ক্ষমতা: হবসের মতে, সার্বভৌম ক্ষমতা অবিচ্ছিন্ন ও অবিভাজ্য। এর অর্থ হলো, সার্বভৌম ক্ষমতাকে কোনোভাবেই ভাগ করা যায় না। ক্ষমতা যদি ভাগ করা হয়, তবে বিভিন্ন অংশ নিজেদের মধ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়বে, যা আবার সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। হবস মনে করেন, ক্ষমতা ভাগ করা হলে রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। তাই, সকল ক্ষমতা, যেমন আইন প্রণয়নের ক্ষমতা, বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা এবং সামরিক ক্ষমতা, একটি একক কর্তৃপক্ষের হাতে থাকা আবশ্যক। এই একক কর্তৃপক্ষই সার্বভৌম ক্ষমতার ধারক। তিনি বিশ্বাস করতেন, সার্বভৌমত্বকে টুকরো টুকরো করলে রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে, অর্থাৎ শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
২. নিরঙ্কুশ ও চূড়ান্ত ক্ষমতা: সার্বভৌম ক্ষমতা হলো নিরঙ্কুশ ও চূড়ান্ত। এর অর্থ, সার্বভৌম ক্ষমতার ওপর কোনো ধরনের শর্ত বা সীমাবদ্ধতা আরোপ করা যায় না। সার্বভৌম শাসক কোনো পার্থিব শক্তির কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন। তিনি নিজের ইচ্ছানুসারে আইন তৈরি করতে পারেন, তা কার্যকর করতে পারেন এবং প্রয়োজনে বাতিলও করতে পারেন। হবস মনে করতেন, সার্বভৌম ক্ষমতার উপর কোনো বিধিনিষেধ থাকলে তা দুর্বল হয়ে পড়বে, যা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর। এই ক্ষমতা এতটাই শক্তিশালী যে এর সামনে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছার কোনো মূল্য নেই, এবং এর একমাত্র লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রের নাগরিকদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা।
৩. ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা: সার্বভৌম ক্ষমতার প্রধান উদ্দেশ্য হলো সমাজে ঐক্য, শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। মানুষের প্রাকৃতিক অবস্থায় যে ভয়ংকর বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধ ছিল, তা থেকে মানুষকে রক্ষা করাই হলো সার্বভৌম শক্তির মূল দায়িত্ব। এই ক্ষমতা সমস্ত বিরোধ ও সংঘাতের অবসান ঘটায় এবং নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। হবস মনে করেন, সার্বভৌম শক্তি না থাকলে সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি নিজের স্বার্থ নিয়ে যুদ্ধ করত, যার ফলস্বরূপ কোনো ধরনের সামাজিক প্রগতি বা সভ্য জীবন সম্ভব হতো না। তাই, সার্বভৌম ক্ষমতা এক স্থিতিশীল এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
৪. আইনের উৎস: সার্বভৌম শাসকই হলেন সকল আইনের উৎস। তাঁর ইচ্ছাই আইন। আইন সার্বভৌম শাসকের আদেশ ছাড়া আর কিছুই নয়। কোনো আইন তখনই বৈধ হয়, যখন তা সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ দ্বারা প্রণীত হয়। হবস মনে করেন, আইন কেবল তখনই কার্যকর হয়, যখন তার পেছনে সার্বভৌম শক্তির প্রয়োগের ক্ষমতা থাকে। এই অর্থে, সার্বভৌম শাসক নিজে আইনের ঊর্ধ্বে থাকেন। তিনি নিজের প্রণীত কোনো আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ নন। এই ধারণাটি নির্দেশ করে যে, আইনের শাসন বলতে সার্বভৌম শাসকের ইচ্ছার শাসনকে বোঝানো হয়েছে, যা সমাজের সকল সদস্যকে মেনে চলতে বাধ্য।
৫. নাগরিকদের সম্মতি: হবসের সার্বভৌম তত্ত্বটি নাগরিকদের সম্মতির উপর প্রতিষ্ঠিত। মানুষ স্বেচ্ছায়, নিজেদের নিরাপত্তার জন্য, একটি সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে তাদের প্রাকৃতিক অধিকার ত্যাগ করে সার্বভৌম শক্তির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। এই চুক্তিটি হলো একটি কাল্পনিক চুক্তি, যা মানুষের যুক্তিবাদী সিদ্ধান্তের ফল। হবস মনে করেন, মানুষ বুঝতে পারে যে প্রাকৃতিক অবস্থায় জীবন কতটা বিপদসংকুল, তাই তারা এক শক্তিশালী শাসকের অধীনে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার জন্য নিজেদের স্বাধীনতা ছেড়ে দিতে রাজি হয়। এই সম্মতি সার্বভৌম ক্ষমতার বৈধতার ভিত্তি তৈরি করে, যদিও একবার ক্ষমতা হস্তান্তর হয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।
৬. শাসন ব্যবস্থা নির্বাচন: হবসের মতে, সার্বভৌম শাসক একজন ব্যক্তি বা একটি পরিষদ হতে পারেন। এটি রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র বা গণতন্ত্র হতে পারে। তবে, হবস রাজতন্ত্রকে বেশি পছন্দ করতেন, কারণ তাঁর মতে, একজন একক শাসকের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তা কার্যকর করা একটি পরিষদ বা বহু শাসকের চেয়ে সহজ। রাজতন্ত্রে ক্ষমতার বিভাজন বা বিরোধের সম্ভাবনা কম থাকে, যা সার্বভৌম ক্ষমতার অবিভাজ্যতার ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তিনি মনে করেন, একজন শাসকের ইচ্ছা একটি সুসংহত এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সহায়ক, যা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি মোকাবিলায় অত্যন্ত কার্যকর।
৭. অবিচ্ছেদ্য ও অপরিহার্য: সার্বভৌম ক্ষমতা রাষ্ট্র থেকে অবিচ্ছেদ্য। অর্থাৎ, সার্বভৌম ক্ষমতা ছাড়া রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। রাষ্ট্র হলো সেই সত্তা, যা সার্বভৌম ক্ষমতা ধারণ করে। সার্বভৌম ক্ষমতা যদি দুর্বল হয় বা বিলুপ্ত হয়, তবে রাষ্ট্রও বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং সমাজ আবার প্রাকৃতিক অবস্থায় ফিরে যাবে। হবস এই ক্ষমতাকে একটি অপরিহার্য প্রয়োজন হিসাবে বিবেচনা করেন, যা মানুষের জীবনের সুরক্ষা ও কল্যাণের জন্য অত্যাবশ্যক। সার্বভৌম ক্ষমতা রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড, যা ছাড়া রাষ্ট্র কেবল একটি অসংগঠিত জনসমষ্টিতে পরিণত হবে, যেখানে কোনো নিয়ম বা শৃঙ্খলা থাকবে না।
৮. কোনো শর্ত সাপেক্ষে নয়: সার্বভৌম ক্ষমতা কোনো শর্ত সাপেক্ষে নয়। একবার এই ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলে, এর ওপর কোনো ধরনের শর্ত আরোপ করা যায় না। মানুষ সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের অধিকার ত্যাগ করে এবং এর বিনিময়ে নিরাপত্তা লাভ করে। এই চুক্তিটি সার্বভৌম শাসকের প্রতি কোনো শর্ত আরোপ করে না। সার্বভৌম শাসক চুক্তি থেকে উদ্ভূত কোনো পক্ষের কাছে দায়বদ্ধ নন। তিনি নিজের বিবেক এবং বিচক্ষণতা অনুযায়ী শাসন করেন। এই ধারণাটি সার্বভৌম শাসকের চরম স্বায়ত্তশাসনকে নিশ্চিত করে, যা তার ক্ষমতাকে যেকোনো প্রকারের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত রাখে।
৯. সৃষ্ট ক্ষমতার ঊর্ধ্বে: সার্বভৌম ক্ষমতা নিজে সৃষ্ট ক্ষমতার ঊর্ধ্বে। এটি কোনো নির্দিষ্ট আইন দ্বারা গঠিত হয়নি, বরং এটি নিজেই সকল আইনের উৎস। অর্থাৎ, সার্বভৌম শাসককে কোনো আইন বা প্রথা দ্বারা সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি যখন ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, তখন তা কোনো পূর্বনির্ধারিত নিয়ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। হবস মনে করেন, যদি সার্বভৌম ক্ষমতা কোনো উচ্চতর শক্তির কাছে দায়বদ্ধ থাকত, তাহলে সেই উচ্চতর শক্তিই প্রকৃত সার্বভৌম হিসেবে বিবেচিত হতো। তাই, সার্বভৌম ক্ষমতাকে চূড়ান্ত এবং স্বতঃপ্রণোদিত হিসেবে দেখা হয়, যা সমাজের সকল কাঠামোর উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
১০. যুদ্ধ ও শান্তি ঘোষণা: সার্বভৌম ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুদ্ধ ঘোষণা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত ক্ষমতা। সার্বভৌম শাসকই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কখন এবং কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। এই ক্ষমতা রাষ্ট্রের সুরক্ষা এবং বৈদেশিক নীতির জন্য অপরিহার্য। হবস মনে করেন, প্রাকৃতিক অবস্থায় প্রত্যেকের বিরুদ্ধে প্রত্যেকের যুদ্ধ চললেও, রাষ্ট্রের অধীনে কেবল সার্বভৌম শাসকই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এই ক্ষমতা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়, এবং এর মাধ্যমে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের বাইরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে।
১১. সম্পত্তির অধিকার নিয়ন্ত্রণ: হবসের মতে, সম্পত্তির অধিকার সার্বভৌম ক্ষমতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রাকৃতিক অবস্থায় কোনো ব্যক্তির সম্পত্তির কোনো নিশ্চয়তা ছিল না, কারণ সেখানে শক্তিশালী ব্যক্তিরা দুর্বলদের সম্পত্তি দখল করে নিত। সার্বভৌম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, শাসকই নির্ধারণ করেন কে কোন সম্পত্তির মালিক হবে এবং সেই অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হবে। হবস মনে করেন, সম্পত্তির অধিকার সার্বভৌম শাসকের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল, এবং তা তখনই বৈধ যখন সার্বভৌম শক্তি তা অনুমোদন করে। এই ধারণাটি নির্দেশ করে যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তি সার্বভৌম ক্ষমতার অনুদান, কোনো প্রাকৃতিক অধিকার নয়।
১২. শিক্ষার উপর নিয়ন্ত্রণ: সার্বভৌম শাসক শিক্ষার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখেন। রাষ্ট্রের মধ্যে কি শিক্ষা দেওয়া হবে, তা সার্বভৌম শাসক নির্ধারণ করেন। হবস মনে করেন, ভুল শিক্ষা এবং মতবাদ সমাজে বিশৃঙ্খলা ও সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে। তাই, শাসককে এমন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে, যা নাগরিকদের সার্বভৌম শাসকের প্রতি আনুগত্য শেখাবে এবং তাদের মধ্যে ঐক্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখবে। এর মাধ্যমে, রাষ্ট্র তার আদর্শ এবং মূল্যবোধ প্রচার করতে পারে এবং নাগরিকদের মধ্যে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে। এই নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব এবং সংহতি বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য।
১৩. বিচার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ: সার্বভৌম ক্ষমতার অধীনে বিচার ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। শাসকই চূড়ান্ত বিচারক। তিনি নিজেই বিচার করতে পারেন অথবা বিচারক নিয়োগ করতে পারেন। বিচারকের ক্ষমতা সার্বভৌম শাসকের কাছ থেকে আসে, এবং বিচারকগণ সার্বভৌম শাসকের ইচ্ছানুসারে বিচার করেন। হবস মনে করেন, একটি একক বিচার ব্যবস্থা না থাকলে সমাজে বিচার নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, যার ফলস্বরূপ আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটবে। এই ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যে, রাষ্ট্রের মধ্যে সকল বিচারকার্য একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত হবে, যা ন্যায়বিচারের প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখতে সহায়ক।
১৪. ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ: হবসের মতে, রাষ্ট্র ধর্মীয় বিষয়েও হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাখে। তিনি মনে করতেন, ধর্মীয় মতবাদগুলো যদি রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতি চ্যালেঞ্জ জানায়, তবে তা সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলার জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই, সার্বভৌম শাসক ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুশীলনের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন, যাতে কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করে। হবস ধর্মকে রাষ্ট্রের একটি অংশ হিসেবে দেখতেন, যা সার্বভৌম ক্ষমতার অধীনে পরিচালিত হয়। এর মাধ্যমে তিনি ধর্মীয় বিভাজন থেকে সৃষ্ট সংঘাত রোধ করতে চেয়েছিলেন এবং রাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।
১৫. সীমিত স্বাধীনতা: সার্বভৌম শাসকের অধীনে নাগরিকদের স্বাধীনতা সীমিত। মানুষ তাদের প্রাকৃতিক অধিকার ত্যাগ করে এবং এর বিনিময়ে নিরাপত্তা লাভ করে। এই প্রক্রিয়ায় তাদের কিছু স্বাধীনতা অবশ্যই সীমিত হয়ে যায়। হবস মনে করেন, নাগরিকদের যে স্বাধীনতা থাকে, তা সার্বভৌম শাসকের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল এবং শাসক যতক্ষণ অনুমোদন করেন, ততক্ষণই তারা তা ভোগ করতে পারে। এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, হবস বিশ্বাস করতেন যে এই সীমিত স্বাধীনতা প্রাকৃতিক অবস্থার সীমাহীন ও বিপজ্জনক স্বাধীনতার চেয়ে অনেক বেশি শ্রেয়, কারণ এটি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
১৬. সাজাপ্রদানের ক্ষমতা: সার্বভৌম শাসকের সাজাপ্রদানের ক্ষমতা রয়েছে। আইন ভঙ্গকারীদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা সার্বভৌমত্বের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। এই ক্ষমতা ছাড়া আইনের কোনো কার্যকারিতা থাকে না। হবস মনে করেন, শাস্তির ভয়ই মানুষকে আইন মেনে চলতে বাধ্য করে এবং সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখে। এই সাজাপ্রদানের ক্ষমতা হলো সার্বভৌম ক্ষমতার চূড়ান্ত প্রয়োগ, যা তার আদেশকে বাস্তব এবং কার্যকর করে তোলে। এই ক্ষমতা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ন্যায়বিচার ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য এবং নাগরিকদের মধ্যে আইনের প্রতি সম্মান সৃষ্টি করে।
১৭. স্বয়ংসম্পূর্ণ: সার্বভৌম ক্ষমতা স্বয়ংসম্পূর্ণ। এর অর্থ হলো, সার্বভৌম ক্ষমতা কোনো বহিঃশক্তির উপর নির্ভরশীল নয়। হবস মনে করেন, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন থাকা উচিত। অন্য কোনো রাষ্ট্র বা শক্তির কাছে যদি একটি রাষ্ট্র দায়বদ্ধ থাকে, তবে সেই রাষ্ট্র প্রকৃত সার্বভৌম নয়। এই স্বয়ংসম্পূর্ণতা রাষ্ট্রের স্বাধীনতা এবং মর্যাদা নিশ্চিত করে। এটি নির্দেশ করে যে, একটি রাষ্ট্র তার নিজের ভাগ্য নিজেই নির্ধারণ করে এবং কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক প্রভাব বা চাপের কাছে নতি স্বীকার করে না।
১৮. ব্যক্তিগত অধিকারের উৎস: হবসের তত্ত্ব অনুসারে, ব্যক্তিগত অধিকারের একমাত্র উৎস হলো সার্বভৌম শাসক। প্রাকৃতিক অবস্থায় কোনো ব্যক্তিগত অধিকারের অস্তিত্ব ছিল না। সার্বভৌম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, শাসকই নির্ধারণ করেন কোন অধিকারগুলো নাগরিকদের দেওয়া হবে এবং কোনগুলো তাদের থেকে কেড়ে নেওয়া হবে। হবস বিশ্বাস করতেন, অধিকারগুলো সার্বভৌম শাসকের অনুদান, কোনো জন্মগত বা প্রাকৃতিক বিষয় নয়। এই ধারণাটি নির্দেশ করে যে, অধিকারগুলো রাষ্ট্রের দ্বারা সৃষ্ট এবং রাষ্ট্রের সুরক্ষার উপর নির্ভরশীল, যা সার্বভৌম ক্ষমতার চূড়ান্ত কর্তৃত্বকে নিশ্চিত করে।
১৯. নাগরিকদের আনুগত্য: সার্বভৌম শাসকের প্রতি নাগরিকদের আনুগত্য অপরিহার্য। এই আনুগত্য সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে সৃষ্ট হয় এবং তা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হবস মনে করেন, নাগরিকরা যতদিন পর্যন্ত তাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা পায়, ততদিন তাদের সার্বভৌম শাসকের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখা উচিত। যদি শাসক তাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তবেই কেবল আনুগত্যের চুক্তিটি ভেঙে যায়। এই শর্তাধীন আনুগত্য রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে বৈধতা দেয় এবং নাগরিকদেরকে একটি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল সমাজে বসবাসের সুযোগ দেয়।
উপসংহার: টমাস হবসের সার্বভৌম তত্ত্বটি আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় এক যুগান্তকারী প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর মতে, সার্বভৌম ক্ষমতা হলো রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও শান্তির একমাত্র রক্ষাকবচ। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ নিজেদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য স্বেচ্ছায় এই অসীম ক্ষমতা একজন শাসককে হস্তান্তর করে। এই তত্ত্বটি পরবর্তীতে রাষ্ট্র, আইন এবং সরকারের ভূমিকা সম্পর্কে নতুন ধারণা প্রদান করে। যদিও তাঁর এই নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের ধারণাটি সমালোচিত হয়েছে, তবে এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। হবসের তত্ত্বটি আজও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সামাজিক চুক্তি এবং নাগরিকদের অধিকারের মধ্যেকার সম্পর্ক বোঝার জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
১. অবিচ্ছিন্ন এবং অবিভাজ্য ক্ষমতা। 🔱
২. নিরঙ্কুশ ও চূড়ান্ত ক্ষমতা। 👑
৩. ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা। 🕊️
৪. আইনের উৎস। ⚖️
৫. নাগরিকদের সম্মতি। 🤝
৬. শাসন ব্যবস্থা নির্বাচন।🗳️
৭. অবিচ্ছেদ্য ও অপরিহার্য। 🔗
৮. কোনো শর্ত সাপেক্ষে নয়। 🚫
৯. সৃষ্ট ক্ষমতার ঊর্ধ্বে। ✨
১০. যুদ্ধ ও শান্তি ঘোষণা।⚔️
১১. সম্পত্তির অধিকার নিয়ন্ত্রণ। 🏡
১২. শিক্ষার উপর নিয়ন্ত্রণ। 📚
১৩. বিচার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ।🧑⚖️
১৪. ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ। 🙏
১৫. সীমিত স্বাধীনতা। 🗽
১৬. সাজাপ্রদানের ক্ষমতা। ⛓️
১৭. স্বয়ংসম্পূর্ণ। 🛡️
১৮. ব্যক্তিগত অধিকারের উৎস। 📝
১৯. নাগরিকদের আনুগত্য। 🙏
টমাস হবসের “লেভিয়াথান” গ্রন্থটি ১৬৫১ সালে প্রকাশিত হয়, যা ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের (1642-1651) প্রেক্ষাপটে রচিত। এই গৃহযুদ্ধ হবসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং তিনি দেখতে পেয়েছিলেন যে, ক্ষমতার বিভাজন ও দুর্বল কেন্দ্রীয় শক্তির কারণে সমাজে কী ভয়ংকর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। এই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি এমন একটি সার্বভৌম তত্ত্ব তৈরি করেন, যা রাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকে ন্যায্যতা দেয়। হবসের মতে, গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি এড়াতে একটি শক্তিশালী, অবিভাজ্য সার্বভৌম শক্তি অপরিহার্য। ১৬৬০ সালে রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দ্বিতীয় চার্লসের ক্ষমতায় আগমন তাঁর তত্ত্বের একটি বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে একটি কেন্দ্রীয় শক্তি ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান ঘটায়। তাঁর তত্ত্বটি পরবর্তীতে জঁ-জ্যাক রুশো এবং জন লকের মতো দার্শনিকদের সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যদিও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন ছিল। হবস আধুনিক রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্পর্কে একটি মৌলিক কাঠামো তৈরি করেন।

