- readaim.com
- 0
উত্তর::উপস্থাপনা: তুলনামূলক প্রশাসন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। এটি বিভিন্ন দেশ, সংস্কৃতি, ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রশাসনিক কাঠামো, প্রক্রিয়া, ও নীতিসমূহকে তুলনা করে একটি গভীর ও বিস্তৃত ধারণা দেয়। এটি শুধু একটি তত্ত্বীয় আলোচনা নয়, বরং বাস্তব প্রশাসনিক সমস্যার সমাধানেও এটি কার্যকর দিকনির্দেশনা প্রদান করে। বিভিন্ন দেশের প্রশাসনিক সাফল্য ও ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে উন্নত করাই এর মূল লক্ষ্য।
শাব্দিক অর্থ: তুলনামূলক প্রশাসন (Comparative Public Administration) শব্দটির শাব্দিক অর্থ হলো ‘তুলনা’ (comparative) এবং ‘প্রশাসন’ (public administration)। অর্থাৎ, এটি বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যবস্থা, কাঠামো, নীতি, ও কার্যপ্রণালীর মধ্যে তুলনামূলক অধ্যয়ন।
তুলনামূলক প্রশাসন একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ পদ্ধতি, যা বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে বিদ্যমান সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যগুলো চিহ্নিত করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রশাসনের কার্যকারিতা, দক্ষতা, এবং কার্যকারণের বিষয়ে সাধারণ সূত্র ও নীতি খুঁজে বের করা। এটি কেবল উন্নত বা অনুন্নত দেশগুলোর প্রশাসনিক ব্যবস্থার তুলনা করে না, বরং একই দেশের বিভিন্ন প্রদেশের প্রশাসনিক কাঠামো এবং সময়ের সাথে এর বিবর্তনকেও বিশ্লেষণ করে।
বিভিন্ন গবেষক, মনীষী, ও অধ্যাপকরা তুলনামূলক প্রশাসনকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিচে তাদের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞা দেওয়া হলো:
১। অধ্যাপক ফিফনার ও প্রেসথাস (P. Fiffner and Presthus): তাদের মতে, “তুলনামূলক প্রশাসন হলো প্রশাসন ব্যবস্থার আন্তঃসাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ এবং এটি একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।” (Comparative public administration is the cross-cultural analysis of administrative systems and it is a scientific method.)
২। ডিমক ও ডিমক (Dimock and Dimock): তারা বলেছেন, “তুলনামূলক প্রশাসন বিভিন্ন দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা, যা প্রশাসনকে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তুলনা করে।” (Comparative public administration is the comparison of administrative systems of different countries, relating administration to its social and political environment.)
৩। ডোয়াইট ওয়াল্ডো (Dwight Waldo): তিনি বলেন, “তুলনামূলক প্রশাসন মূলত একটি তাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত গবেষণা, যা প্রশাসনিক ব্যবস্থাসমূহকে তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে অধ্যয়ন করে।” (Comparative public administration is primarily a theoretical and methodological study that examines administrative systems within their political, social, economic, and cultural contexts.)
৪। এল.ডি. হোয়াইট (L.D. White): তার মতে, “তুলনামূলক প্রশাসন এমন একটি অধ্যয়ন, যা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় স্তরে বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থার তুলনা করে।” (Comparative public administration is a study that compares various administrative systems at both domestic and international levels.)
৫। সাইমন, স্মিথবার্গ ও থাম্পসন (Simon, Smithburg and Thompson): তাদের মতে, “তুলনামূলক প্রশাসন হলো প্রশাসনিক আচরণের পদ্ধতিগত তুলনামূলক বিশ্লেষণ।” (Comparative public administration is the systematic comparative analysis of administrative behavior.)
উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলির আলোকে আমরা বলতে পারি যে, তুলনামূলক প্রশাসন হলো এমন একটি পদ্ধতিগত অধ্যয়ন, যা ভিন্ন ভিন্ন দেশের বা সংস্কৃতির প্রশাসনিক ব্যবস্থা, কাঠামো, নীতি, এবং কার্যপ্রণালীর মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য বিশ্লেষণ করে। এর মূল লক্ষ্য হলো প্রশাসনের কার্যকারিতা ও আচরণের কারণগুলো খুঁজে বের করা এবং একটি সাধারণ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করা, যা প্রশাসনিক জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে।
উপসংহার: তুলনামূলক প্রশাসন কেবল একটি একাডেমিক বিষয় নয়, বরং এটি আধুনিক রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে উন্নত করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এটি বিভিন্ন দেশের সফল ও ব্যর্থ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের প্রশাসনিক সংস্কারে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে, কোন প্রশাসনিক মডেল কোন পরিবেশে সবচেয়ে কার্যকর, এবং কীভাবে একটি নির্দিষ্ট দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট তার প্রশাসনিক কাঠামোকে প্রভাবিত করে। এটি একটি গতিশীল ক্ষেত্র যা সময়ের সাথে সাথে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহায্য করে এবং প্রশাসনিক জ্ঞানের দিগন্ত প্রসারিত করে।
তুলনামূলক প্রশাসন হলো বিভিন্ন দেশের বা সংস্কৃতির প্রশাসনিক ব্যবস্থার পদ্ধতিগত তুলনা, যা তাদের কার্যকারিতা ও আচরণকে বোঝার জন্য একটি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার করে।
১৯৩০-এর দশকে তুলনামূলক প্রশাসনের ধারণাটি বিকশিত হতে শুরু করে, তবে এর স্বর্ণযুগ ছিল ১৯৫০-এর দশক। ১৯৫৬ সালে আমেরিকান পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-এর রিপোর্টে এই বিষয়ের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালের ফ্রাঙ্কফুর্ট সম্মেলন এবং ১৯৬৮ সালের ফিটজউইলিয়াম সম্মেলনে এই গবেষণা পদ্ধতি আরও জোরদার হয়। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রশাসনিক সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

