- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: অর্থনীতিতে, স্থিতিস্থাপকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা যা কোনো পণ্যের চাহিদা বা সরবরাহের পরিবর্তন পরিমাপ করতে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে, চাহিদা স্থিতিস্থাপকতা বুঝতে পারা ব্যবসায়িক কৌশল এবং সরকারি নীতি নির্ধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চাহিদা স্থিতিস্থাপকতার দুটি প্রধান রূপ হলো দাম স্থিতিস্থাপকতা এবং আয় স্থিতিস্থাপকতা, যা ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে ক্রেতার প্রতিক্রিয়ার বিশ্লেষণ করে। এই দুটি ধারণার মধ্যে পার্থক্য জানা থাকলে বাজারের আচরণ এবং ভোক্তার কেনাকাটার প্রবণতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
১। সংজ্ঞাগত পার্থক্য:-
দাম স্থিতিস্থাপকতা: পণ্যের দামের পরিবর্তনের ফলে তার চাহিদার পরিমাণের যে আনুপাতিক পরিবর্তন হয়, তাকে দাম স্থিতিস্থাপকতা বলা হয়। সহজ কথায়, দাম বাড়লে বা কমলে চাহিদা কতটা সংবেদনশীলভাবে পরিবর্তিত হয়, তা এই ধারণা দিয়ে বোঝা যায়। যদি দামের সামান্য পরিবর্তনে চাহিদার ব্যাপক পরিবর্তন হয়, তবে সেটি স্থিতিস্থাপক চাহিদা।
আয় স্থিতিস্থাপকতা: ভোক্তার আয়ের পরিবর্তনের ফলে পণ্যের চাহিদার পরিমাণের যে আনুপাতিক পরিবর্তন হয়, তাকে আয় স্থিতিস্থাপকতা বলা হয়। এই ধারণা দিয়ে বোঝা যায়, মানুষের আয় বাড়লে বা কমলে কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের চাহিদা কীভাবে প্রভাবিত হয়। এটি পণ্যের প্রকৃতি যেমন – সাধারণ পণ্য, নিকৃষ্ট পণ্য বা বিলাসবহুল পণ্য – নির্ধারণে সাহায্য করে।
২। পরিমাপের ভিত্তি:-
দাম স্থিতিস্থাপকতা: এর পরিমাপের ভিত্তি হলো পণ্যের নিজস্ব দাম। অর্থাৎ, একটি পণ্যের দাম ১% পরিবর্তিত হলে তার চাহিদার পরিমাণ কত শতাংশ পরিবর্তিত হয়, তা এখানে হিসেব করা হয়। সূত্রটি হলো : (ΔQd/Qd)/(ΔP/P)। এই পরিমাপ সাধারণত ঋণাত্মক হয়, কারণ দাম ও চাহিদার মধ্যে একটি বিপরীত সম্পর্ক থাকে।
আয় স্থিতিস্থাপকতা: এর পরিমাপের ভিত্তি হলো ভোক্তার ব্যক্তিগত আয়। এর সাহায্যে দেখা যায়, আয় ১% পরিবর্তিত হলে কোনো পণ্যের চাহিদা কত শতাংশ পরিবর্তিত হয়। সূত্রটি হলো : (ΔQd/Qd)/(ΔI/I)। এই পরিমাপ ধনাত্মক বা ঋণাত্মক উভয়ই হতে পারে, যা পণ্যের ধরনের উপর নির্ভর করে।
৩। সম্পর্কের প্রকৃতি:-
দাম স্থিতিস্থাপকতা: দাম স্থিতিস্থাপকতা দাম ও চাহিদার পরিমাণের মধ্যে সম্পর্ক প্রকাশ করে। সাধারণত, এই সম্পর্কটি বিপরীতমুখী হয়। অর্থাৎ, দাম বাড়লে চাহিদা কমে এবং দাম কমলে চাহিদা বাড়ে। এই বিপরীতমুখী সম্পর্ককে অর্থনীতির মৌলিক সূত্রগুলোর একটি, অর্থাৎ চাহিদা বিধি (Law of Demand) দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়। আয় স্থিতিস্থাপকতা : আয় স্থিতিস্থাপকতা ভোক্তার আয় ও চাহিদার পরিমাণের মধ্যে সম্পর্ক প্রকাশ করে। বেশিরভাগ পণ্যের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক ধনাত্মক হয়, অর্থাৎ আয় বাড়লে চাহিদা বাড়ে। তবে, কিছু নিম্নমানের পণ্যের (Inferior goods) ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক ঋণাত্মক হয়, যেখানে আয় বাড়লে চাহিদা কমে।
৪। পণ্যের প্রকার:
দাম স্থিতিস্থাপকতা: দাম স্থিতিস্থাপকতা পণ্যের প্রকৃতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য, যেমন লবণ বা ওষুধ, সাধারণত অস্থিতিস্থাপক হয় কারণ দাম বাড়লেও এর চাহিদা খুব বেশি কমে না। অন্যদিকে, বিলাসবহুল পণ্য যেমন গাড়ি বা গয়না বেশি স্থিতিস্থাপক হয়, কারণ দাম সামান্য বাড়লে এদের চাহিদা অনেক কমে যায়।
আয় স্থিতিস্থাপকতা: আয় স্থিতিস্থাপকতা পণ্যের প্রকৃতি নির্ধারণে সাহায্য করে। যদি আয় স্থিতিস্থাপকতা ধনাত্মক হয়, তবে পণ্যটি স্বাভাবিক বা বিলাসবহুল পণ্য। যদি ঋণাত্মক হয়, তবে তা নিকৃষ্ট পণ্য। উদাহরণস্বরূপ, যদি আয় বাড়লে বাসের পরিবর্তে গাড়ির চাহিদা বাড়ে, তবে বাস একটি নিকৃষ্ট পণ্য।
৫। সিদ্ধান্ত গ্রহণ:
দাম স্থিতিস্থাপকতা: ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পণ্যের দাম নির্ধারণের জন্য দাম স্থিতিস্থাপকতা ব্যবহার করে। যদি কোনো পণ্য স্থিতিস্থাপক হয়, তবে দাম কমালে মোট রাজস্ব বাড়তে পারে, কারণ চাহিদার পরিমাণ অনেক বেশি বেড়ে যায়। অন্যদিকে, অস্থিতিস্থাপক পণ্যের ক্ষেত্রে দাম বাড়ালে মোট রাজস্ব বাড়ে।
আয় স্থিতিস্থাপকতা: বাজার গবেষণা এবং নতুন পণ্যের বিকাশের ক্ষেত্রে আয় স্থিতিস্থাপকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি কোম্পানি নতুন বাজারে প্রবেশ করার আগে সেখানকার মানুষের আয় এবং পণ্যের আয় স্থিতিস্থাপকতা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়া, অর্থনৈতিক মন্দা বা প্রবৃদ্ধি সময়ে কোন পণ্যের চাহিদা কেমন থাকবে, তা অনুমান করতেও এটি সাহায্য করে।
৬। নীতিগত প্রভাব:
দাম স্থিতিস্থাপকতা: সরকার কর আরোপ বা ভর্তুকি দেওয়ার ক্ষেত্রে দাম স্থিতিস্থাপকতা বিবেচনা করে। যদি কোনো পণ্যে কর আরোপ করা হয় এবং সেটি অস্থিতিস্থাপক হয় (যেমন সিগারেট), তবে সরকার বেশি রাজস্ব আদায় করতে পারে কারণ দাম বাড়লেও চাহিদা খুব বেশি কমে না।
আয় স্থিতিস্থাপকতা: অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে আয় স্থিতিস্থাপকতা গুরুত্বপূর্ণ। যখন কোনো দেশে আয় বৃদ্ধি পায়, তখন কোন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত তা নির্ধারণ করতে সরকার এই তথ্য ব্যবহার করে। উদাহরণস্বরূপ, যদি বিলাসবহুল পণ্যের আয় স্থিতিস্থাপকতা বেশি হয়, তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময়ে সেই শিল্পগুলো দ্রুত প্রসারিত হতে পারে।
৭। সম্পর্ক ও প্রভাব:
দাম স্থিতিস্থাপকতা: এটি সরাসরি একটি পণ্যের নিজস্ব বাজার এবং তার দামের উপর নির্ভরশীল। এটি মূলত ভোক্তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার একটি চিত্র তুলে ধরে। যখন একটি পণ্যের দাম বাড়ে, তখন ক্রেতা তাৎক্ষণিকভাবে সেটির পরিবর্তে অন্য পণ্য কেনার কথা ভাবতে পারে, যা এই স্থিতিস্থাপকতার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
আয় স্থিতিস্থাপকতা: এটি একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে কাজ করে, যেখানে ভোক্তার অর্থনৈতিক অবস্থা বা সামগ্রিক আয়ের পরিবর্তন বিবেচনা করা হয়। এই স্থিতিস্থাপকতা পণ্যের চাহিদা কেমন হবে, তা দীর্ঘ মেয়াদে পূর্বাভাস দিতে সাহায্য করে। এটি একটি পণ্যের সামগ্রিক বাজারের অবস্থান ও শ্রেণির উপর প্রভাব ফেলে।
৮। উদাহরণ ও প্রয়োগ:
দাম স্থিতিস্থাপকতা: ধরুন, একটি রেস্টুরেন্ট তার একটি খাবারের দাম ১০% কমালে যদি তার বিক্রি ২০% বেড়ে যায়, তবে এটি উচ্চ স্থিতিস্থাপকতার উদাহরণ। এই তথ্য ব্যবহার করে রেস্টুরেন্টটি দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
আয় স্থিতিস্থাপকতা: যদি কোনো ব্যক্তির আয় ১০% বাড়ার পর তার একটি নতুন স্মার্টফোনের চাহিদা ১৫% বেড়ে যায়, তবে স্মার্টফোনটির আয় স্থিতিস্থাপকতা ১.৫। এটি একটি বিলাসবহুল পণ্যের উদাহরণ, যেখানে আয় বাড়লে চাহিদা আনুপাতিকভাবে বেশি বাড়ে।
উপসংহার: দাম স্থিতিস্থাপকতা এবং আয় স্থিতিস্থাপকতা উভয়ই অর্থনীতির মৌলিক ধারণা হলেও তাদের উদ্দেশ্য এবং প্রয়োগ ভিন্ন। দাম স্থিতিস্থাপকতা পণ্যের নিজস্ব দামের সাথে চাহিদার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে, যা ব্যবসায়িক মূল্য নির্ধারণের জন্য অপরিহার্য। অন্যদিকে, আয় স্থিতিস্থাপকতা ভোক্তার আয়ের সাথে চাহিদার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে, যা পণ্যের ধরণ ও বাজার পরিস্থিতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দুটি ধারণা একে অপরের পরিপূরক এবং একটি সফল অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য উভয়কেই বিবেচনা করা জরুরি।
- ১। সংজ্ঞাগত পার্থক্য
- ২। পরিমাপের ভিত্তি
- ৩। সম্পর্কের প্রকৃতি
- ৪। পণ্যের প্রকার
- ৫। সিদ্ধান্ত গ্রহণ
- ৬। নীতিগত প্রভাব
- ৭। সম্পর্ক ও প্রভাব
- ৮। উদাহরণ ও প্রয়োগ
১৮৯০ সালে ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ আলফ্রেড মার্শাল তাঁর “Principles of Economics” গ্রন্থে প্রথম স্থিতিস্থাপকতার ধারণাটি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন। ১৯৪০-এর দশকে আমেরিকান অর্থনীতিবিদ হেনরি শোবার্লগ আয় স্থিতিস্থাপকতার ওপর গবেষণা করেন, যা ভোক্তার আচরণ বুঝতে সাহায্য করে। ১৯৫৪ সালে একটি জরিপে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় খাদ্য ও অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তুলনায় বিনোদন ও বিলাসবহুল পণ্যের চাহিদা অনেক বেশি বেড়েছিল।

