- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: দৃষ্টিবাদ বা দৃষ্টবাদ বলতে সাধারণত সমাজবিজ্ঞান ও দর্শনের একটি ধারাকে বোঝায় যা শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানকে বৈধ ও নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে। সহজ ভাষায়, এটি এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে অনুমিত বা অবৈজ্ঞানিক ধারণার পরিবর্তে কেবল বাস্তব ও প্রামাণ্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
দৃষ্টবাদ, ইংরেজিতে Positivism নামে পরিচিত, হলো একটি দার্শনিক মতবাদ। এই মতবাদ অনুযায়ী, শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে যে জ্ঞান অর্জন করা যায়, তা-ই প্রকৃত ও নির্ভরযোগ্য জ্ঞান। এর মূল ধারণা হলো, মানুষের জ্ঞান এমন কিছু বিষয়ের ওপর সীমাবদ্ধ থাকা উচিত যা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায় এবং যার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব। এটি রূপক বা অলৌকিক ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং সমাজের ঘটনাগুলোকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো একই নিয়মে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে।
শাব্দিক অর্থ: Positivism শব্দটি ফরাসি “positivisme” থেকে এসেছে, যার মূল হলো “positif”। এই শব্দটির অর্থ হলো “প্রকৃত, বাস্তব, বা নিশ্চিত”। সুতরাং, শাব্দিক অর্থে দৃষ্টবাদ হলো এমন একটি দর্শন যা কেবল নিশ্চিত বা বাস্তব তথ্যের উপর ভিত্তি করে গঠিত।
দৃষ্টবাদ মূলত ফরাসি দার্শনিক অগাস্ট কোঁৎ (Auguste Comte)-এর হাত ধরে বিকশিত হয়, যিনি এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত। যদিও উপরে উল্লেখিত অনেক পণ্ডিত দৃষ্টবাদ নিয়ে সরাসরি সংজ্ঞা দেননি, তবে যারা এই দর্শনের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত, তাদের মধ্যে থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা নিচে দেওয়া হলো।
১। অগাস্ট কোঁৎ (Auguste Comte) “দৃষ্টবাদ হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যা শুধুমাত্র সেই জ্ঞানকে গ্রহণ করে যা পর্যবেক্ষণযোগ্য ঘটনা থেকে পাওয়া যায় এবং যা প্রাকৃতিক নিয়মের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়।” (Positivism is a system which recognizes only positive facts and observable phenomena, explained by natural laws.)
২। এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim) “দৃষ্টবাদ হলো সমাজকে এমন একটি প্রাকৃতিক বিজ্ঞান হিসেবে দেখা, যা সামাজিক ঘটনাগুলোকে বস্তুনিষ্ঠভাবে এবং পর্যবেক্ষণযোগ্য উপায়ে অধ্যয়ন করে।” (Positivism is the view of sociology as a natural science that studies social facts objectively and through observation.)
৩। এল.ডি. হোয়াইট (L.D. White) “প্রশাসনিক দৃষ্টবাদ হলো সেই বিশ্বাস যে, প্রশাসনিক বিজ্ঞানকে রাজনৈতিক মূল্যবোধ থেকে আলাদা করে একটি নিরপেক্ষ, দক্ষ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে অধ্যয়ন করা যায়।” (Administrative positivism is the belief that public administration can be studied as a neutral, efficient and scientific discipline, separate from political values.)
৪। অধ্যাপক ফিফনার ও প্রেসথাস (P. Fiffner and Presthus) “প্রশাসনিক দৃষ্টবাদ হলো কর্মদক্ষতা ও অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল একটি মতবাদ, যা একটি কঠোর পদ্ধতিগত এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সরকারি কার্যক্রমকে উন্নত করার চেষ্টা করে।” (Administrative positivism is a doctrine relying on efficiency and economy, which attempts to improve governmental operations through rigorous methodological and scientific analysis.)
৫। উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson) “প্রশাসন একটি বৈজ্ঞানিক কার্য এবং এর লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোকে কার্যকর করা, যা রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে মুক্ত।” (Administration is a scientific activity and its purpose is to execute political decisions, free from political debates.)
৬। সাইমন, স্মিথবার্গ ও থাম্পসন (Simon, Smithburg and Thompson) “প্রশাসন হলো সেই পদ্ধতি যেখানে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য বস্তুনিষ্ঠ ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, যা কোনো ব্যক্তিগত অনুভূতির দ্বারা প্রভাবিত হয় না।” (Administration is the method where objective and rational decisions are made to achieve specific goals, free from personal feelings.)
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, দৃষ্টবাদ কেবল একটি দার্শনিক মতবাদ নয়, বরং এটি একটি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি যা জ্ঞান ও গবেষণাকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে আবদ্ধ করে। এটি আমাদের শেখায় যে, কোনো কিছুকে সত্যি বলে মেনে নেওয়ার আগে সেটিকে অবশ্যই বাস্তব প্রমাণ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। এর মাধ্যমে সমাজবিজ্ঞান এবং অন্যান্য মানবীয় বিজ্ঞানগুলো প্রথাগত ও অনুমাননির্ভর পদ্ধতির পরিবর্তে একটি বস্তুনিষ্ঠ এবং বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই, দৃষ্টবাদ আমাদের চিন্তা ও গবেষণাকে আরও যুক্তিসঙ্গত এবং নির্ভরযোগ্য করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দৃষ্টবাদ হলো এমন এক দর্শন যা কেবল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও পর্যবেক্ষণযোগ্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জ্ঞানকে বৈধতা দেয়।
দৃষ্টবাদ ১৯ শতকে অগাস্ট কোঁৎ দ্বারা প্রবর্তিত হয় এবং এটি আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করে। কোঁতের “তিন-স্তরের নিয়ম” (Law of Three Stages) অনুসারে, মানব সমাজ ধর্মতত্ত্ব, অধিবিদ্যা এবং সর্বশেষে দৃষ্টবাদী স্তরের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। ১৮৪০-এর দশকে কোঁৎ এই দর্শনকে জনপ্রিয় করে তোলেন, যা পরবর্তীতে এমিল ডুর্খেইম, হার্বার্ট স্পেন্সার এবং জন স্টুয়ার্ট মিলের মতো প্রভাবশালী চিন্তাবিদদের দ্বারা প্রসারিত হয়। ১৯২৯ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার পর থেকে দৃষ্টবাদী চিন্তাভাবনা প্রশাসনিক বিজ্ঞানে নতুন গুরুত্ব লাভ করে, যা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেয়।

