- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: পরিবার হলো সমাজের মূল ভিত্তি। পারিবারিক সম্পর্ক যখন ভেঙে যায়, তখন তা শুধু ব্যক্তি নয়, বরং পুরো সমাজেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রণীত হয়েছে পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫। এই অধ্যাদেশটি বাংলাদেশের পারিবারিক আইনগুলোকে সহজ ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছে। এটি মূলত বিবাহ, মোহরানা, ভরণপোষণ, সন্তানের অভিভাবকত্ব এবং দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে।
১। বিবাহ বিচ্ছেদ: পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫-এর ধারা ৫ অনুযায়ী, বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত মামলা পারিবারিক আদালতে দায়ের করা হয়। এই ধারার অধীনে মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য স্বামী বা স্ত্রী আবেদন করতে পারেন। এখানে তালাক, খোলা, মুবারাত বা অন্য যেকোনো উপায়ে বিচ্ছেদের আবেদন করা হয়। আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন এবং আইন অনুযায়ী বিচ্ছেদ কার্যকর করার অনুমতি দেন। এর মাধ্যমে একটি সহজ এবং দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়, যা পরিবারের সদস্যদের জন্য সহায়ক।
২। মোহরানা: বিয়ের সময় স্ত্রীকে দেওয়া মোহরানা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য এই অধ্যাদেশের ধারা ৫ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন স্বামী মোহরানা পরিশোধে ব্যর্থ হন, তখন স্ত্রী এই ধারার অধীনে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। আদালত উভয় পক্ষের দলিল ও সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই করে মোহরানার পরিমাণ নির্ধারণ করেন এবং স্বামীকে তা পরিশোধের নির্দেশ দেন। এই প্রক্রিয়াটি নিশ্চিত করে যে, স্ত্রীর অধিকার সুরক্ষিত থাকে এবং তিনি তার প্রাপ্য মোহরানা পেতে পারেন।
৩। ভরণপোষণ: পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে ভরণপোষণ একটি অপরিহার্য বিষয়। এই অধ্যাদেশের ধারা ৫ অনুযায়ী, স্ত্রী এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের ভরণপোষণ সংক্রান্ত মামলা পারিবারিক আদালতে দায়ের করা হয়। যখন স্বামী তার স্ত্রী বা সন্তানদের ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করেন, তখন স্ত্রী বা সন্তানের পক্ষ থেকে আদালতে আবেদন করা যায়। আদালত স্বামীর আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণ করেন এবং তা নিয়মিত পরিশোধের নির্দেশ দেন। এর ফলে স্ত্রী ও সন্তানেরা আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন না।
৪। দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার: দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার হলো সেই অধিকার, যেখানে স্বামী বা স্ত্রী তাদের দাম্পত্য জীবন পুনরায় শুরু করতে চান। যখন কোনো এক পক্ষ অপর পক্ষকে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া ত্যাগ করে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ এই অধ্যাদেশের ধারা ৫ অনুযায়ী পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন। আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন এবং যদি কোনো আইনসম্মত কারণ না থাকে, তাহলে আদালত পুনরায় একসাথে থাকার জন্য নির্দেশ দেন। এটি মূলত দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার একটি প্রচেষ্টা।
৫। সন্তানের অভিভাবকত্ব: বিবাহ বিচ্ছেদের পর সন্তানের ভবিষ্যৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই অধ্যাদেশের ধারা ৫-এর অধীনে, সন্তানের অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধান সংক্রান্ত মামলা পারিবারিক আদালতে দায়ের করা হয়। আদালত সন্তানের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন এবং সন্তানের বয়স, মানসিক অবস্থা, এবং উভয় পিতামাতার আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আদালত সাধারণত মায়ের জিম্মায় সন্তানকে রাখার সিদ্ধান্ত নেন, তবে সন্তানের সর্বোত্তম স্বার্থে যেকোনো পক্ষকে অভিভাবকত্ব দিতে পারেন।
উপসংহার: পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ বাংলাদেশের পারিবারিক আইন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে একটি কার্যকর আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। বিবাহ বিচ্ছেদ, মোহরানা, ভরণপোষণ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার এবং সন্তানের অভিভাবকত্বের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে সমাধানের মাধ্যমে এই অধ্যাদেশটি পারিবারিক শান্তি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। এই আইনটি পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিচারিক পরিবেশ তৈরি করেছে।
১. বিবাহ বিচ্ছেদ ২. মোহরানা ৩. ভরণপোষণ ৪. দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার ৫. সন্তানের অভিভাবকত্ব।
পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ মূলত মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-কে অনুসরণ করে প্রণীত হয়েছে। এই অধ্যাদেশের কারণে পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক আদালত ব্যবস্থা চালু হয়। ১৯৭২ সালের আইনি সংস্কারে প্রথম পারিবারিক আদালত গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে বাস্তবায়িত হয়। এক জরিপে দেখা গেছে, এই আইন কার্যকর হওয়ার পর পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

