- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: রাষ্ট্র পরিচালনায় অর্থ সংগ্রহের দুটি প্রধান উপায় হলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর। এই দুই ধরনের কর ব্যবস্থার নিজস্ব কিছু সুবিধা এবং অসুবিধা রয়েছে, যা একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। নিচে এই দুই করের পক্ষে ও বিপক্ষে কিছু গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি আলোচনা করা হলো।
১.ন্যায়সঙ্গত বন্টন: এই কর ব্যবস্থায়, যাদের আয়ের ক্ষমতা বেশি, তাদের ওপর করের বোঝা বেশি পড়ে। এর ফলে, সমাজের ধনী ব্যক্তিরা তাদের আয়ের একটি বড় অংশ কর হিসেবে প্রদান করে, যা বৈষম্য কমাতে সাহায্য করে। এটি একটি প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা, কারণ এতে আয়ের বিভিন্ন স্তরের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কর হার নির্ধারিত হয়, যা সমাজে আর্থিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করে। এর মাধ্যমে সরকার দরিদ্রদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে।
২.স্থির রাজস্ব আয়: প্রত্যক্ষ কর থেকে সরকারের রাজস্ব আয় তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে, কারণ এই আয় সরাসরি ব্যক্তিগত ও কর্পোরেট আয় থেকে আসে। অর্থনৈতিক মন্দা বা বাজারের ওঠানামা সত্ত্বেও, আয়ের ওপর ভিত্তি করে কর আদায় অব্যাহত থাকে, যা সরকারের আর্থিক পরিকল্পনাকে শক্তিশালী করে। এর ফলে, সরকার বাজেট প্রণয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য উৎস পায়।
৩.দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি: প্রত্যক্ষ করদাতারা সরাসরি কর প্রদান করেন বলে তারা সরকারের খরচের বিষয়ে আরও সচেতন ও দায়বদ্ধ হন। তারা জানতে পারেন তাদের দেওয়া অর্থ কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যয় হচ্ছে, যা সরকারকে জনগণের কাছে আরও স্বচ্ছ এবং জবাবদিহি করতে বাধ্য করে। এই প্রক্রিয়ায় সরকার ও জনগণের মধ্যে এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরতা তৈরি হয়।
৪.মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: প্রত্যক্ষ করের হার বাড়িয়ে সরকার জনগণের ব্যয় করার ক্ষমতা কমাতে পারে, যা বাজারে চাহিদা কমিয়ে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে, জনগণের অতিরিক্ত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং মূল্যবৃদ্ধি সীমিত থাকে। এটি অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
৫.অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: প্রত্যক্ষ কর একটি দেশের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সরকারের পক্ষে এই করের হার পরিবর্তন করে অর্থনীতির গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। উদাহরণস্বরূপ, অর্থনৈতিক মন্দার সময় কর হার কমিয়ে বিনিয়োগ ও ভোগ বৃদ্ধি করা যায়, যা অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সহায়তা করে।
৬.অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস: প্রত্যক্ষ করের প্রগতিশীল নীতি ধনীদের কাছ থেকে বেশি কর আদায় করে এবং দরিদ্রদের উপর চাপ কমিয়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে সহায়তা করে। এই অতিরিক্ত রাজস্ব সরকার দরিদ্রদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করতে পারে, যা সমাজে একটি ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের পথ তৈরি করে।
৭.সরাসরি প্রভাব: করদাতারা সরাসরি তাদের আয়ের ওপর কর দেন, তাই তারা বুঝতে পারেন যে তারা রাষ্ট্রের উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখছেন। এই সচেতনতা জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি এক ধরনের মালিকানা ও দায়িত্ববোধ তৈরি করে, যা নাগরিক হিসেবে তাদের ভূমিকাকে আরও শক্তিশালী করে।
৮.স্বচ্ছতা ও পরিমাপযোগ্যতা: প্রত্যক্ষ করের হিসাব রাখা এবং এর প্রভাব পরিমাপ করা সহজ। যেহেতু এই কর সরাসরি আয়ের ওপর ভিত্তি করে গণনা করা হয়, তাই এর মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয় এবং কর প্রদানকারীর আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায়। এটি কর ফাঁকি রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
৯.প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা: প্রত্যক্ষ করের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি একটি প্রগতিশীল ব্যবস্থা। অর্থাৎ, যার আয় যত বেশি, তাকে তত বেশি হারে কর দিতে হয়। এই নীতি সমাজে একটি ন্যায্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনে সাহায্য করে এবং ধনীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত কর দরিদ্রদের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।
১.কর ফাঁকির প্রবণতা: যেহেতু প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ বেশি হতে পারে, তাই অনেক সময় করদাতারা কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেন। কর ফাঁকির ফলে সরকার তার কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয় এবং এটি অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এর ফলে, যে সকল ব্যক্তি সততার সাথে কর প্রদান করেন, তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
২.অর্থনীতিতে চাপ: উচ্চ হারে প্রত্যক্ষ কর আরোপ করা হলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অতিরিক্ত করের বোঝা ব্যবসায়ীদের নতুন উদ্যোগ গ্রহণে নিরুৎসাহিত করে।
৩.প্রশাসনিক জটিলতা: প্রত্যক্ষ কর আদায় এবং তার হিসাব রাখা বেশ জটিল এবং ব্যয়বহুল। প্রতিটি করদাতার আয়, ব্যয়, এবং অন্যান্য আর্থিক লেনদেন সঠিকভাবে নিরীক্ষণ ও যাচাই করতে প্রচুর জনবল ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজন হয়। এর ফলে প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
৪.সঞ্চয় হ্রাস: উচ্চ কর হার ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের পরিমাণ হ্রাস করতে পারে। মানুষ যদি তাদের আয়ের একটি বড় অংশ কর হিসেবে দিয়ে দেয়, তবে তাদের সঞ্চয়ের প্রবণতা কমে যায়, যা ভবিষ্যতে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি গঠনে বাধা দেয়। এটি দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
৫.অপ্রীতিকর অনুভূতি: প্রত্যক্ষ কর প্রদানের সময় করদাতাদের মধ্যে এক ধরনের অপ্রীতিকর বা নেতিবাচক অনুভূতি তৈরি হতে পারে। তাদের মনে হতে পারে যে তাদের কষ্টার্জিত আয়ের একটি অংশ জোরপূর্বক কেটে নেওয়া হচ্ছে। এই মানসিকতা জনগণের মধ্যে কর প্রদানের প্রতি অনিচ্ছা তৈরি করে।
৬.বিনিয়োগে নিরুৎসাহ: ব্যবসায়িক আয়ের ওপর উচ্চ হারে কর্পোরেট কর আরোপ করা হলে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হতে পারে। এর ফলে নতুন শিল্প স্থাপন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হতে পারে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে।
৭.জটিল আইন: প্রত্যক্ষ করের আইন প্রায়শই জটিল হয় এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বোঝা কঠিন। করের নিয়মাবলী, ছাড় এবং অন্যান্য বিষয়গুলো নিয়ে প্রায়শই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়, যা করদাতাদের জন্য সমস্যা তৈরি করে। এই জটিলতা কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগও তৈরি করে।
৮.রাজনৈতিক প্রভাব: প্রত্যক্ষ করের হার প্রায়শই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে কর নীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে, যা অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে অস্থিতিশীল করে তোলে। এই পরিবর্তনগুলো ব্যবসায়িক পরিবেশের ওপর অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
৯.ভোক্তার ওপর চাপ: যদিও প্রত্যক্ষ কর সরাসরি ভোক্তার ওপর চাপ ফেলে না বলে মনে করা হয়, তবে উচ্চ কর্পোরেট করের কারণে কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে, যার ফলে পরোক্ষভাবে ভোক্তাকেই সেই করের বোঝা বহন করতে হয়।
১.সুবিধাজনক সংগ্রহ: পরোক্ষ কর সংগ্রহ করা তুলনামূলকভাবে সহজ এবং কম ব্যয়বহুল। সরকার সরাসরি উৎপাদক, বিক্রেতা বা আমদানিকারকদের কাছ থেকে এই কর আদায় করে, যা প্রচুর সংখ্যক ব্যক্তির কাছ থেকে কর আদায়ের ঝামেলা এড়িয়ে যায়। এই কর পণ্যের মূল্যের সাথে অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাই আলাদাভাবে আদায়ের প্রয়োজন হয় না।
২.বিস্তৃত করের ভিত্তি: পরোক্ষ কর সমাজের প্রায় সকল মানুষের ওপর প্রযোজ্য হয়, কারণ প্রতিটি পণ্য বা সেবা ভোগের ওপর এই কর আদায় করা হয়। ফলে, এই করের ভিত্তি অনেক বিস্তৃত এবং এর মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয়ও ব্যাপক হয়। এমনকি নিম্ন আয়ের মানুষও এই কর প্রদান করে থাকে।
৩.কর ফাঁকি কঠিন: পরোক্ষ কর পণ্যের দামের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাই এটি ফাঁকি দেওয়া প্রায় অসম্ভব। একজন ব্যক্তি যখন কোনো পণ্য কেনেন, তখন অনিচ্ছাকৃতভাবেই কর প্রদান করেন, যা সরকারকে একটি নির্ভরযোগ্য এবং স্থিতিশীল রাজস্ব উৎস সরবরাহ করে। এর ফলে কর ফাঁকির সুযোগ সীমিত থাকে।
৪.নিয়ন্ত্রণে সহজ: এই করের হার পরিবর্তন করে সরকার সহজেই কিছু পণ্যের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যেমন, ক্ষতিকর পণ্যের (তামাক, অ্যালকোহল) ওপর উচ্চ কর আরোপ করে সরকার জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবদান রাখতে পারে। এর মাধ্যমে সমাজের কল্যাণমূলক উদ্দেশ্য সাধন করা সম্ভব হয়।
৫.অর্থনৈতিক গতিশীলতা: পরোক্ষ করের মাধ্যমে সরকার সহজেই অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। যেমন, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষার জন্য আমদানিকৃত পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে দেওয়া যায়। এর ফলে স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত হয় এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়।
৬.আয় বৈষম্য হ্রাস: পরোক্ষ করের মাধ্যমে সরকার বিলাসী পণ্যের ওপর উচ্চ কর আরোপ করে ধনীদের কাছ থেকে বেশি রাজস্ব আদায় করতে পারে। এই রাজস্ব দরিদ্রদের কল্যাণে ব্যয় করে সরকার আয় বৈষম্য কমাতে পারে। তবে এই প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম।
৭.সঞ্চয়ের ওপর প্রভাব কম: প্রত্যক্ষ করের মতো পরোক্ষ কর সঞ্চয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে না। মানুষ তার আয় থেকে সঞ্চয় করার পর যদি ব্যয় করে, তবেই এই কর প্রযোজ্য হয়, যা সঞ্চয়কে উৎসাহিত করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে।
৮.সামাজিক কল্যাণ: ক্ষতিকর পণ্যের ওপর উচ্চ কর আরোপ করে সরকার জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই নীতি কেবল রাজস্ব সংগ্রহই করে না, বরং সমাজের সামগ্রিক কল্যাণেও সহায়তা করে। এটি একটি কার্যকর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।
৯.অদৃশ্য কর: পরোক্ষ কর পণ্যের মূল্যের সাথে মিশে থাকে বলে অনেক সময় করদাতারা বুঝতে পারেন না যে তারা কর প্রদান করছেন। এতে করে জনগণের মধ্যে কর প্রদানের ব্যাপারে প্রত্যক্ষ করের মতো নেতিবাচক অনুভূতি তৈরি হয় না।
১.সমানুপাতিক কর: পরোক্ষ কর একটি সমানুপাতিক কর ব্যবস্থা, যা আয়ের সাথে সম্পর্কিত নয়। অর্থাৎ, একজন ধনী ব্যক্তি এবং একজন দরিদ্র ব্যক্তি একই পণ্য কিনলে একই পরিমাণ কর দেন। এটি সমাজের দরিদ্রদের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি চাপ সৃষ্টি করে, কারণ তাদের আয়ের একটি বড় অংশই ভোগ্যপণ্যের পেছনে ব্যয় হয়।
২.মুদ্রাস্ফীতির কারণ: যখন কোনো পণ্যের ওপর পরোক্ষ কর বৃদ্ধি করা হয়, তখন তার দাম বেড়ে যায়, যা মুদ্রাস্ফীতির কারণ হতে পারে। পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর ফলে দরিদ্র ও নিম্নবিত্তরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৩.অনিয়মিত রাজস্ব: পরোক্ষ করের রাজস্ব মানুষের ভোগ ও ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক মন্দার সময় মানুষ যখন ব্যয় কমিয়ে দেয়, তখন পরোক্ষ কর থেকে সরকারের আয়ও কমে যায়। এর ফলে সরকারের রাজস্ব আয় অনিয়মিত এবং অস্থিতিশীল হয়।
৪.দায়বদ্ধতার অভাব: পরোক্ষ কর জনগণ প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করে না, তাই তারা সরকারের ব্যয় এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তেমন সচেতন হয় না। এর ফলে সরকারের ওপর জনগণের দায়বদ্ধতা এবং জবাবদিহিতা কমে যেতে পারে, যা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাধা সৃষ্টি করে।
৫.অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি: পরোক্ষ করের সমানুপাতিক প্রকৃতি অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি করতে পারে। দরিদ্র মানুষের আয়ের একটি বড় অংশ প্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে খরচ হয়, তাই তাদের ওপর করের বোঝা বেশি পড়ে। এতে করে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে আয়ের ব্যবধান আরও বেড়ে যায়।
৬.ক্ষতিকর প্রভাব: পরোক্ষ করের হার বাড়ানো হলে এটি অনেক সময় অবৈধ পণ্য উৎপাদন বা চোরাচালানের মতো অনৈতিক কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে পারে। এর ফলে সরকার একদিকে যেমন রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়, অন্যদিকে সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলাও বিঘ্নিত হয়।
৭.বিকৃত চাহিদা: কিছু পণ্যের ওপর উচ্চ হারে পরোক্ষ কর আরোপ করা হলে বাজারে সেই পণ্যের স্বাভাবিক চাহিদা বিকৃত হতে পারে। মানুষ বিকল্প পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা সেই নির্দিষ্ট শিল্পের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এর ফলে বাজারের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়।
৮.অনুমিত কর: পরোক্ষ করকে প্রায়শই একটি ‘অনুমিত কর’ বলা হয় কারণ এটি পণ্যের মূল্যের সাথে অন্তর্ভুক্ত থাকে। এটি জনগণের মধ্যে কর প্রদানের বিষয়ে স্বচ্ছতা হ্রাস করে এবং তারা বুঝতে পারে না যে তারা আসলে কতটা কর প্রদান করছে। এই অস্বচ্ছতা সরকারের ওপর জনগণের আস্থা কমাতে পারে।
৯.প্রয়োজনীয় পণ্যে চাপ: অনেক সময় প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপরও পরোক্ষ কর আরোপ করা হয়, যা দরিদ্র মানুষের জন্য জীবনধারণ কঠিন করে তোলে। এই ধরনের কর নীতি দরিদ্রদের জীবনযাত্রার মানকে সরাসরি প্রভাবিত করে এবং তাদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে।
উপসংহার: প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর উভয়ই একটি দেশের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে সরকার ন্যায্যতা এবং বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করে, অন্যদিকে পরোক্ষ কর রাজস্ব সংগ্রহের একটি সহজ ও কার্যকর উপায় হিসেবে কাজ করে। একটি শক্তিশালী এবং ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য এই দুই ধরনের করের মধ্যে একটি সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রত্যক্ষ করের পক্ষে যুক্তি
- ⚖️ ন্যায়সঙ্গত বন্টন: আয়ের ক্ষমতা অনুযায়ী করের বোঝা ভাগ হয়, যা বৈষম্য কমায়।
- 📈 স্থির রাজস্ব আয়: সরকারের একটি নির্ভরযোগ্য এবং স্থিতিশীল আয়ের উৎস তৈরি হয়।
- 🔗 দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি: করদাতারা সরকারের ব্যয় সম্পর্কে সচেতন হন এবং সরকারকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করেন।
- 🛡️ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: জনগণের ব্যয় করার ক্ষমতা কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
- ⚙️ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: করের হার পরিবর্তন করে সরকার অর্থনীতির গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
- 🤝 অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস: ধনীদের থেকে বেশি কর নিয়ে দরিদ্রদের জন্য কল্যাণমূলক প্রকল্পে বিনিয়োগ করা যায়।
- 🎯 সরাসরি প্রভাব: করদাতারা রাষ্ট্রের উন্নয়নে নিজেদের সরাসরি অবদান অনুভব করেন।
- 💡 স্বচ্ছতা ও পরিমাপযোগ্যতা: করের হিসাব রাখা সহজ, যা কর ফাঁকি রোধে সহায়ক।
- 🚀 প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা: যার আয় বেশি, তার করের হারও বেশি, যা সমাজে ন্যায্যতা নিয়ে আসে।
প্রত্যক্ষ করের বিপক্ষে যুক্তি
- ❌ কর ফাঁকির প্রবণতা: উচ্চ কর হারের কারণে অনেকে কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে।
- 📉 অর্থনীতিতে চাপ: উচ্চ কর হার বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা দেয়।
- 🧶 প্রশাসনিক জটিলতা: কর আদায় ও হিসাব রাখার প্রক্রিয়া বেশ জটিল ও ব্যয়বহুল।
- 💸 সঞ্চয় হ্রাস: আয়ের বড় অংশ কর হিসেবে দেওয়ায় মানুষের সঞ্চয়ের প্রবণতা কমে যায়।
- 😠 অপ্রীতিকর অনুভূতি: কর দেওয়ার সময় করদাতাদের মধ্যে একটি নেতিবাচক অনুভূতি তৈরি হয়।
- 🛑 বিনিয়োগে নিরুৎসাহ: উচ্চ কর্পোরেট কর নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে।
- 📚 জটিল আইন: করের নিয়মাবলী সাধারণ মানুষের জন্য বোঝা কঠিন।
- ⛈️ রাজনৈতিক প্রভাব: সরকারের পরিবর্তনে কর নীতির পরিবর্তন অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে অস্থিতিশীল করে।
- 🛒 ভোক্তার ওপর চাপ: উচ্চ কর্পোরেট করের কারণে পণ্যের দাম বাড়তে পারে, যা পরোক্ষভাবে ভোক্তাকে প্রভাবিত করে।
পরোক্ষ করের পক্ষে যুক্তি
- 👍 সুবিধাজনক সংগ্রহ: এই কর সংগ্রহ করা সহজ এবং এতে প্রশাসনিক ব্যয় কম হয়।
- 🌍 বিস্তৃত করের ভিত্তি: সমাজের প্রায় সব স্তরের মানুষ পণ্য বা সেবা কেনার মাধ্যমে এই কর প্রদান করে।
- 🔒 কর ফাঁকি কঠিন: পণ্যের দামের সাথে যুক্ত থাকায় এই কর ফাঁকি দেওয়া প্রায় অসম্ভব।
- 🎛️ নিয়ন্ত্রণে সহজ: ক্ষতিকর পণ্যের ওপর উচ্চ কর বসিয়ে সরকার সেগুলোর ভোগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
- 🏭 অর্থনৈতিক গতিশীলতা: আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া যায়।
- 🏡 আয় বৈষম্য হ্রাস: বিলাসবহুল পণ্যের ওপর উচ্চ কর আরোপ করে ধনীদের থেকে বেশি রাজস্ব আদায় করা যায়।
- 🌱 সঞ্চয়ের ওপর প্রভাব কম: এই কর সরাসরি আয়ের ওপর প্রভাব ফেলে না, তাই সঞ্চয়কে উৎসাহিত করে।
- 💚 সামাজিক কল্যাণ: তামাক বা অ্যালকোহলের মতো ক্ষতিকর পণ্যের ওপর উচ্চ কর জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সাহায্য করে।
- 👻 অদৃশ্য কর: করদাতারা সরাসরি কর প্রদানের চাপ অনুভব করেন না, কারণ এটি পণ্যের দামের সাথে যুক্ত থাকে।
পরোক্ষ করের বিপক্ষে যুক্তি
- ⚖️ সমানুপাতিক কর: ধনী ও দরিদ্র নির্বিশেষে সবাইকে একই হারে কর দিতে হয়, যা দরিদ্রদের জন্য অন্যায্য।
- 🔥 মুদ্রাস্ফীতির কারণ: পণ্যের ওপর কর বাড়লে তার দাম বেড়ে যায়, যা মুদ্রাস্ফীতি ঘটায়।
- 〰️ অনিয়মিত রাজস্ব: অর্থনৈতিক মন্দার সময় মানুষের ব্যয় কমে গেলে সরকারের রাজস্ব আয়ও কমে যায়।
- 🤷♀️ দায়বদ্ধতার অভাব: জনগণ সরাসরি কর প্রদান করে না বলে সরকারের ব্যয়ের ব্যাপারে উদাসীন থাকে।
- ↔️ অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি: দরিদ্রদের আয়ের বড় অংশ ভোগে ব্যয় হওয়ায় তাদের ওপর করের বোঝা বেশি পড়ে।
- 🚨 ক্ষতিকর প্রভাব: উচ্চ করের কারণে অনেক সময় চোরাচালান ও অবৈধ ব্যবসা উৎসাহিত হয়।
- ↪️ বিকৃত চাহিদা: নির্দিষ্ট পণ্যে উচ্চ কর আরোপ করলে বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা ব্যাহত হতে পারে।
- 🌫️ অনুমিত কর: করের পরিমাণ পণ্যের মূল্যের সাথে যুক্ত থাকায় স্বচ্ছতার অভাব দেখা যায়।
- 🍞 প্রয়োজনীয় পণ্যে চাপ: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর আরোপ করলে দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়।
প্রাচীন রোমে কর ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোমান সম্রাট অগাস্টাস সাধারণ জনগণের ওপর বিভিন্ন ধরনের পরোক্ষ কর আরোপ করেন, যেমন, বিক্রয় কর এবং উত্তরাধিকার কর। ১৭৭৬ সালে অ্যাডাম স্মিথ তার বিখ্যাত গ্রন্থ “The Wealth of Nations”-এ করের চারটি মূল নীতি (ন্যায়, নিশ্চয়তা, সুবিধা, এবং মিতব্যয়) উল্লেখ করেন, যা আধুনিক কর ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। আধুনিক যুগে, ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার সময়, অনেক দেশ অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের জন্য কর নীতিতে বড় পরিবর্তন আনে। ২০০০-এর দশকে, বহু দেশে মূল্য সংযোজন কর (VAT) বা গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স (GST) চালু করা হয়, যা পরোক্ষ করের একটি আধুনিক সংস্করণ। ভারতের GST ব্যবস্থা, যা ২০১৭ সালে চালু হয়, ছিল একটি ঐতিহাসিক কর সংস্কারের উদাহরণ।

