- readaim.com
- 0
উত্তর::উপস্থাপনা: প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এমন একটি নীতি যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করে। এটি নিশ্চিত করে যে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তারা জনগণের কাছে তাদের কাজের জন্য দায়বদ্ধ। সহজ কথায়, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা হলো সরকারি কর্মকর্তাদের এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে তারা তাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত এবং কাজের ফলাফল সম্পর্কে জনগণকে তথ্য জানাতে এবং তাদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন। এই ব্যবস্থা সরকারি প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও সততা নিশ্চিত করে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অপরিহার্য ভূমিকা রাখে।
শাব্দিক অর্থে: ‘প্রশাসনিক জবাবদিহিতা’ (Administrative Accountability) দুটি শব্দের সমন্বয়— ‘প্রশাসনিক’ এবং ‘জবাবদিহিতা’। ‘প্রশাসনিক’ বলতে সরকারি বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত বিষয়কে বোঝানো হয়, আর ‘জবাবদিহিতা’ বলতে কোনো কাজ, সিদ্ধান্ত বা আচরণের জন্য দায়বদ্ধতা বা কারণ দর্শানোর বাধ্যবাধকতাকে বোঝায়।
সুতরাং, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বলতে বোঝায় সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক শাখা ও তাদের কর্মকর্তারা তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। এটি শুধু আইনগত বাধ্যবাধকতাই নয়, বরং এটি একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বও।
অনেক গবেষক ও মনীষী প্রশাসনিক জবাবদিহিতার সংজ্ঞা দিয়েছেন, যা এই ধারণাটিকে আরও সুস্পষ্ট করে তোলে। এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো:
১। ডিমক ও ডিমক (Dimock and Dimock): “প্রশাসনিক জবাবদিহিতা হলো প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সেই বাধ্যবাধকতা, যার মাধ্যমে তারা তাদের কার্যকলাপ এবং প্রদত্ত ক্ষমতা ব্যবহারের জন্য তাদের রাজনৈতিক প্রধান ও জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য।” (Administrative accountability is the obligation of administrators to account for their activities and the use of their delegated authority to their political superiors and to the public.)
২। এল.ডি. হোয়াইট (L.D. White): “জবাবদিহিতা হলো দায়িত্বের একটি সম্পর্ক, যেখানে একজন ব্যক্তি অন্য একজন বা একটি সংস্থার কাছে তার কার্যকলাপের জন্য দায়বদ্ধ।” (Accountability is a relationship of responsibility in which one person is accountable for his actions to another person or to an organization.)
৩। পি. ফিফনার ও আর. প্রেসথাস (P. Fiffner and R. Presthus): “প্রশাসনিক জবাবদিহিতা হলো সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে প্রশাসন রাজনৈতিকভাবে তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকে।” (Administrative accountability is the process by which the administration is held politically responsible for its actions to the legislature.)
৪া ডোয়াইট ওয়াল্ডো (Dwight Waldo): “জবাবদিহিতা হলো নির্দিষ্ট বিধি-বিধান, আইন এবং নীতিমালার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা।” (Accountability is the obligation to adhere to specific rules, laws, and policies.)
৫। উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson): “প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা উচিত, কারণ তাদের কাজ জনগণের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করে।” (Administrative officials should be held accountable, as their work is the implementation of the will of the people.)
৬। লুথার গুলিক (Luther Gulick): “জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানের একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।” (To ensure accountability, there must be a clear system of administrative control and supervision.)
৭। সাইমন, স্মিথবার্গ ও থম্পসন (Simon, Smithburg, and Thompson): “প্রশাসনিক জবাবদিহিতা হলো সেই ব্যবস্থা যেখানে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা তাদের গৃহীত সিদ্ধান্তের জন্য তাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং জনসাধারণের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন।” (Administrative accountability is the system by which administrative officials are held responsible for their decisions to their superiors and to the public.)
উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে, আমরা বলতে পারি, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা হলো সরকারি কর্মকর্তাদের একটি নৈতিক, রাজনৈতিক ও আইনগত বাধ্যবাধকতা, যার মাধ্যমে তারা তাদের দায়িত্ব পালন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সরকারি সম্পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সততার সাথে জনগণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যা সুশাসন, জনগণের আস্থা এবং সরকারি কার্যক্রমের দক্ষতা নিশ্চিত করে।
উপসংহার: প্রশাসনিক জবাবদিহিতা একটি সুস্থ ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রাণ। এর মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা রোধ করা যায় এবং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে। এটি কেবল সরকারি কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি নাগরিকদের অংশগ্রহণ ও সমালোচনার অধিকারকেও সুরক্ষিত করে। ফলস্বরূপ, একটি শক্তিশালী জবাবদিহিতা ব্যবস্থা সমাজকে সুশাসনের পথে পরিচালিত করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের বিশ্বাস বৃদ্ধি করে।
প্রশাসনিক জবাবদিহিতা হলো সরকারি কর্মকর্তাদের এমন একটি বাধ্যবাধকতা, যার মাধ্যমে তারা তাদের কাজের জন্য জনগণ ও কর্তৃপক্ষের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন।
১৯৮০-এর দশকের পর থেকে বিশ্বজুড়ে প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। ১৯৯২ সালে বিশ্বব্যাংকের এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৮০% উন্নয়নশীল দেশেই সুশাসনের অভাব রয়েছে, যার মূল কারণ হলো দুর্বল প্রশাসনিক জবাবদিহিতা। ২০০০-এর দশকে ই-গভর্নেন্সের প্রচলন প্রশাসনিক জবাবদিহিতাকে আরও শক্তিশালী করেছে, যেখানে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে সরকারি পরিষেবা ও তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

