- readaim.com
- 0
উত্তর::প্রস্তাবনা: প্লেটোর ‘দি রিপাবলিক’ মানব ইতিহাসের এক অসাধারণ সৃষ্টি, যা আজও রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্রচিন্তার এক অনবদ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত। এই অমর গ্রন্থটিতে প্লেটো একটি আদর্শ রাষ্ট্রের রূপরেখা দিয়েছেন, যেখানে ন্যায়, প্রজ্ঞা ও সুশৃঙ্খলতা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়। কিন্তু অনেকেই এই গ্রন্থের কঠোর শাসনব্যবস্থা, ব্যক্তিস্বাধীনতার অভাব এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে কঠোর বিভাজনকে এক স্বৈরাচারী বা সর্বাত্মকবাদী শাসনের নীল নকশা বলে সমালোচনা করে থাকেন। এই নিবন্ধে আমরা প্লেটোর ‘দি রিপাবলিক’ গ্রন্থে বর্ণিত রাষ্ট্রব্যবস্থা কতটা সর্বাত্মকবাদী শাসনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. জ্ঞানী ও স্বৈরাচারী শাসকের কল্পনা: প্লেটো তার আদর্শ রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘দার্শনিক রাজা’র ধারণাকে তুলে ধরেছেন, যা সর্বাত্মকবাদের একটি মূল উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দার্শনিক রাজা হবেন সর্বোচ্চ জ্ঞানী এবং তার শাসন হবে অবাধ ও একচ্ছত্র। তিনি রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখবেন এবং তার সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত। এখানে সাধারণ মানুষের মতামতের কোনো গুরুত্ব নেই। প্লেটো মনে করেন, কেবল দার্শনিকরাই সত্য ও ন্যায় সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখেন, তাই তারাই শাসনের জন্য যোগ্য। এই একতরফা ক্ষমতা বন্টন এবং সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকা সর্বাত্মকবাদী শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই ধরনের শাসনব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত বা সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত থাকে, যা আধুনিক গণতন্ত্রের ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত।
২. ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা ও সমষ্টিগত কল্যাণ: প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রে ব্যক্তির ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণরূপে সমষ্টিগত কল্যাণের কাছে উৎসর্গ করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, ব্যক্তি রাষ্ট্রের একটি অংশ মাত্র এবং তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, এমনকি পরিবারকেও ত্যাগ করতে বাধ্য। এই দর্শনে ব্যক্তির নিজস্বতা ও স্বাতন্ত্র্যের কোনো স্থান নেই। সর্বাত্মকবাদী শাসনব্যবস্থায় ঠিক একই ধরনের নীতি লক্ষ্য করা যায়, যেখানে রাষ্ট্র সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে এবং ব্যক্তির স্বাধীনতাকে রাষ্ট্রের স্বার্থে বলি দেওয়া হয়। এখানে রাষ্ট্রের প্রয়োজনই সর্বাগ্রে এবং ব্যক্তির অধিকারকে সহজেই উপেক্ষা করা হয়।
৩. রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থার কঠোর নিয়ন্ত্রণ: প্লেটো তার আদর্শ রাষ্ট্রে একটি কঠোর, রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রস্তাব করেছেন। এখানে নাগরিকদের, বিশেষ করে অভিভাবকদের, শুধুমাত্র সেই ধরনের শিক্ষা দেওয়া হবে যা রাষ্ট্রের নৈতিক আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। শিশুদের জন্য কোন ধরণের গল্প বা সাহিত্য পড়া হবে, তাও রাষ্ট্রই ঠিক করবে। এমনকী, সংগীত ও শিল্পকলার উপরও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকবে। এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ সর্বাত্মকবাদী শাসনের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য, যেখানে শাসকশ্রেণী তাদের মতাদর্শ প্রচারে শিক্ষা ও সংস্কৃতির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এর মাধ্যমে জনগণকে শিশুকাল থেকেই একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শে দীক্ষিত করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে তারা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোনো প্রশ্ন না তুলতে পারে।
৪. সেনা ও অভিভাবকদের কঠোর জীবনযাপন: প্লেটো তার রিপাবলিকে রাষ্ট্রের অভিভাবক (Guardian) ও সৈনিকদের জন্য এক কঠোর ও ত্যাগী জীবনযাপনের প্রস্তাব করেছেন। এদের কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকবে না, কোনো পরিবার থাকবে না এবং তারা সম্মিলিতভাবে একটি সাধারণ ব্যারাকে বসবাস করবে। তাদের জীবন হবে সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের সেবায় নিবেদিত। তাদের ব্যক্তিগত সুখ বা আরাম-আয়েশের কোনো স্থান নেই। এই ব্যবস্থাটি অনেকটা সামরিক একনায়কতন্ত্র বা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের সৈন্যদের কঠোর জীবনযাপনের মতো। এই ধরনের ব্যবস্থা ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনকে রাষ্ট্রের অধীন করে তোলে এবং একটি সম্পূর্ণ অনুগত ও নিয়ন্ত্রিত শ্রেণি তৈরি করে, যা সর্বাত্মকবাদী শাসনের মূল ভিত্তি।
৫. তিন শ্রেণির সমাজে কঠোর বিভাজন: প্লেটো তার সমাজে তিনটি শ্রেণির কথা বলেছেন—শাসক (Philosopher-Kings), সৈনিক (Auxiliaries), এবং উৎপাদক (Producers)। এই শ্রেণি বিভাজন ছিল কঠোর এবং অপরিবর্তনীয়। এক শ্রেণির মানুষ অন্য শ্রেণিতে যেতে পারত না। ব্যক্তির জন্ম ও পেশা পূর্বনির্ধারিত ছিল। শাসকশ্রেণী প্রজ্ঞা দ্বারা, সৈনিকেরা সাহস দ্বারা এবং উৎপাদকেরা শ্রম দ্বারা সমাজকে সেবা করবে। এই অপরিবর্তনীয় শ্রেণি কাঠামো আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজের ধারণার পরিপন্থী। সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই সমাজের বিভিন্ন অংশকে কঠোরভাবে শ্রেণিবদ্ধ করে এবং তাদের মধ্যে কোনো প্রকারের গতিশীলতার সুযোগ দেয় না। এই ধরনের বিভাজন রাষ্ট্রের উপর শাসকশ্রেণির নিয়ন্ত্রণকে আরও সুদৃঢ় করে।
৬. সম্পত্তির বিলোপ ও সমষ্টিগত মালিকানা: প্লেটো তার রাষ্ট্রের শাসক ও সৈনিক শ্রেণির জন্য ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপের কথা বলেছেন। তাদের কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ থাকবে না। তারা রাষ্ট্রের দেওয়া সম্পদ ও সুবিধা ভোগ করবে। এই ব্যবস্থাটি অনেকটা সাম্যবাদী সমাজের ধারণার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা অনেক সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রে দেখা গেছে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ করে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। প্লেটো বিশ্বাস করতেন যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তি মানুষের মধ্যে লোভ ও স্বার্থপরতা তৈরি করে, যা রাষ্ট্রের ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর। এই ধারণাটি সর্বাত্মকবাদী শাসনে ব্যবহৃত একটি কৌশল, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পদ রাষ্ট্রের অধীনস্থ হয়।
৭. পরিবার প্রথার বিলোপ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ: প্লেটো তার আদর্শ রাষ্ট্রের অভিভাবক ও সৈনিক শ্রেণির জন্য পরিবার প্রথার বিলোপের প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, পরিবার মানুষের মধ্যে ব্যক্তিগত মোহ ও স্বার্থপরতা সৃষ্টি করে, যা রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্যকে হ্রাস করে। তাই তিনি একটি সম্মিলিত পরিবার ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন, যেখানে সন্তানরা রাষ্ট্রের অধীনে লালিত-পালিত হবে এবং কোনো শিশু তার প্রকৃত পিতামাতাকে চিনবে না। এই ব্যবস্থাটি আধুনিক সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রগুলোর একটি চরম সংস্করণ, যেখানে রাষ্ট্র পরিবারকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং শিশুদের রাষ্ট্রীয় আদর্শে গড়ে তোলে। এর ফলে ব্যক্তি তার জন্মগত সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাষ্ট্রের প্রতি সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
৮. মিথ্যার ব্যবহার ও প্রচার: প্লেটো তার ‘দি রিপাবলিক’-এ শাসকের দ্বারা ‘মহৎ মিথ্যা’ (Noble Lie) ব্যবহারের কথা বলেছেন। শাসকশ্রেণী রাষ্ট্রের বৃহত্তর কল্যাণের জন্য জনগণকে মিথ্যা কথা বলতে পারে। এই ‘মহৎ মিথ্যা’ হলো একটি গল্প, যেখানে বলা হয় যে, মানুষ মাটি থেকে জন্ম নিয়েছে এবং তাদের মধ্যে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জের মতো ধাতু আছে, যা তাদের শ্রেণি নির্ধারণ করে। এই মিথ্যাটি মানুষকে তাদের নির্দিষ্ট শ্রেণির প্রতি অনুগত রাখতে সাহায্য করবে। এই ধরনের রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচার সর্বাত্মকবাদী শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল, যেখানে জনগণের আনুগত্য ধরে রাখার জন্য সরকার সত্যকে বিকৃত করে বা ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য প্রচার করে।
৯. আইনের চেয়ে প্রজ্ঞার প্রাধান্য: প্লেটো তার আদর্শ রাষ্ট্রে প্রচলিত আইনের চেয়ে শাসক দার্শনিক রাজার প্রজ্ঞাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, একজন জ্ঞানী রাজা তার প্রজ্ঞা দিয়ে সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তাই তাকে নির্দিষ্ট আইনের বেড়াজালে আটকে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। এই ধারণাটি সর্বাত্মকবাদী শাসনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যেখানে শাসক কোনো আইন বা সংবিধানের তোয়াক্কা করেন না, বরং তার ইচ্ছাই আইন হয়ে দাঁড়ায়। এখানে আইন ও সংবিধানের পরিবর্তে শাসকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তই রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ করে, যা ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
১০. রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতির উপর জোর: প্লেটো তার রাষ্ট্রে রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতির উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো বিভেদ ও অনৈক্য। তাই তিনি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে রাষ্ট্রের স্বার্থই প্রাধান্য পাবে। এই অত্যধিক ঐক্য ও সংহতির উপর জোর দেওয়ার ফলস্বরূপ ব্যক্তি স্বাধীনতা ও ভিন্নমতের কোনো স্থান থাকে না। সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রগুলোও একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করে, যেখানে রাষ্ট্রের ঐক্য বজায় রাখার নামে ভিন্নমতকে দমন করা হয় এবং একটি একক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
১১. ভিন্নমত ও সমালোচনার দমন: প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রে রাষ্ট্রের সমালোচনা বা ভিন্নমত প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। যেহেতু দার্শনিক রাজাই হলেন প্রজ্ঞার মূর্ত প্রতীক, তাই তার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করার অর্থ হলো অজ্ঞতা প্রকাশ করা। এই ধরনের পরিবেশে ভিন্নমত পোষণকারী বা সমালোচনাকারীদের কঠোরভাবে দমন করা হয়। সর্বাত্মকবাদী শাসনব্যবস্থায় এটি একটি সাধারণ চিত্র, যেখানে শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা বা ভিন্নমত প্রকাশ করাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা হয় এবং এর জন্য কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়। এর ফলে জনগণের মধ্যে ভয় ও নীরবতা সৃষ্টি হয়।
১২. রাষ্ট্র কর্তৃক শিশুদের লালন-পালন: প্লেটোর রিপাবলিকে শিশুদের তাদের জন্মগত পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে লালন-পালনের কথা বলা হয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে শিশুরা তাদের পিতামাতার ব্যক্তিগত আদর্শের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় আদর্শে বেড়ে উঠবে। রাষ্ট্রই নির্ধারণ করবে তাদের শিক্ষা, জীবনধারা এবং পেশা। এই ধরনের ব্যবস্থা আধুনিক সমাজ ও গণতন্ত্রের ধারণার বিরোধী। এটি সর্বাত্মকবাদী শাসনের একটি চরম উদাহরণ, যেখানে রাষ্ট্র তার ভবিষ্যত নাগরিকদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং তাদের মধ্যে থেকে কোনো ধরনের ভিন্নমত বা ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য বিকাশের সুযোগ দেয় না।
১৩. অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ: প্লেটোর রাষ্ট্রব্যবস্থায় উৎপাদক শ্রেণি থাকলেও তাদের অর্থনীতি ছিল সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত। উৎপাদকেরা রাষ্ট্রের প্রয়োজনে উৎপাদন করবে, কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত লাভের আকাঙ্ক্ষা সীমিত থাকবে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ অর্থনীতির উপর রাষ্ট্রের একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে। সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়, যেখানে বাজারের উপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করা হয়। এর ফলে অর্থনীতি একটি কেন্দ্রীভূত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় পরিণত হয়, যেখানে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
১৪. গণতন্ত্রের প্রতি ঘৃণা ও সমালোচনা: প্লেটো তার ‘দি রিপাবলিক’ গ্রন্থে গণতন্ত্রের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি গণতন্ত্রকে অজ্ঞদের শাসন হিসেবে অভিহিত করেছেন, যেখানে অযোগ্য ও অশিক্ষিত মানুষরা শাসন করে। তিনি মনে করতেন, গণতন্ত্রে স্বাধীনতার নামে বিশৃঙ্খলা ও স্বেচ্ছাচারিতা সৃষ্টি হয়। এই গণতন্ত্রের প্রতি তার ঘৃণা সর্বাত্মকবাদী মানসিকতার একটি প্রতিচ্ছবি। সর্বাত্মকবাদী শাসকরা প্রায়শই গণতন্ত্রকে দুর্বল ও অকার্যকর বলে সমালোচনা করে এবং তাদের স্বৈরাচারী শাসনকে শক্তিশালী ও স্থিতিশীল বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করে। প্লেটোর এই সমালোচনা তার সর্বাত্মকবাদী চিন্তাধারার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
১৫. শ্রমের সুনির্দিষ্ট বিভাজন: প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রে নাগরিকদের মধ্যে শ্রমের সুনির্দিষ্ট ও কঠোর বিভাজন ছিল। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার প্রাকৃতিক দক্ষতা অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট পেশায় নিযুক্ত করা হতো এবং সে সারা জীবন সেই কাজই করত। এই ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তি তার পেশা পরিবর্তন করতে পারত না। এটি সমাজের সৃজনশীলতা ও গতিশীলতাকে নষ্ট করে। সর্বাত্মকবাদী শাসনব্যবস্থায়ও শ্রমের উপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং ব্যক্তিদের তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি নির্দিষ্ট পেশায় আবদ্ধ করা হয়। এই ধরনের সুনির্দিষ্ট বিভাজন সমাজের উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকে আরও শক্তিশালী করে।
১৬. সৈনিক ও অভিভাবক শ্রেণির জন্য কঠোর প্রশিক্ষণ: প্লেটো তার রিপাবলিকে সৈনিক ও অভিভাবকদের জন্য একটি দীর্ঘ ও কঠোর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। এই প্রশিক্ষণ তাদের শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকে সুশৃঙ্খল ও অনুগত করে তুলত। এই ধরনের প্রশিক্ষণ তাদের রাষ্ট্রের প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য তৈরি করতে সাহায্য করত। এটি সামরিক একনায়কতন্ত্র বা ফ্যাসিবাদী শাসনের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য, যেখানে সৈন্যদের কঠোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য তৈরি করা হয়। প্লেটোর এই ধারণা সামরিক সর্বাত্মকবাদের একটি অন্যতম দিক।
১৭. ব্যক্তির পরিবর্তে রাষ্ট্রের প্রাধান্য: প্লেটোর দর্শনে ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্রকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়েছে। ব্যক্তি রাষ্ট্রের একটি অংশ মাত্র, এবং তার জীবনের মূল্য হলো রাষ্ট্রের সেবা করা। এই ধারণাটি সর্বাত্মকবাদী শাসনের মূল ভিত্তি, যেখানে রাষ্ট্রের স্বার্থই সর্বাগ্রে এবং ব্যক্তির অধিকার, সুখ বা ইচ্ছা সম্পূর্ণভাবে গৌণ। এই ধরনের চিন্তাধারা ব্যক্তির আত্মসম্মান, স্বাধীনতা এবং স্বাতন্ত্র্যবোধকে উপেক্ষা করে এবং একটি দাসসুলভ মানসিকতা তৈরি করে। প্লেটোর এই চিন্তা আধুনিক মানবিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ বিপরীত।
১৮. ব্যক্তির নৈতিকতা রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত: প্লেটোর রাষ্ট্রে ব্যক্তির নৈতিকতা ও আদর্শ রাষ্ট্র দ্বারা নির্ধারিত হবে। রাষ্ট্রই ঠিক করবে কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ। দার্শনিক রাজা প্রজ্ঞার মাধ্যমে নৈতিকতার মানদণ্ড স্থাপন করবেন। ব্যক্তির নিজস্ব নৈতিক চিন্তাভাবনার কোনো স্থান থাকবে না। সর্বাত্মকবাদী শাসনব্যবস্থায়ও ঠিক একই নীতি অনুসরণ করা হয়, যেখানে রাষ্ট্র একটি একক নৈতিকতা ও আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে এবং এর বাইরে কোনো কিছুকে অনুমোদন দেয় না। এর ফলে সমাজের মধ্যে নৈতিক স্বাধীনতার পরিবর্তে একটি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়।
১৯. সৃষ্টিকর্মের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ: প্লেটো তার আদর্শ রাষ্ট্রে সাহিত্য, কবিতা ও শিল্পকলার উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, শিল্পীরা যদি সমাজের নৈতিক আদর্শের বিরুদ্ধে কোনো কিছু তৈরি করে, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। তাই তিনি সাহিত্যিক ও শিল্পীদের এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন, যাতে তারা কেবল রাষ্ট্রের আদর্শের অনুকূলে কাজ করে। সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রগুলোও একই ধরনের সেন্সরশিপ বা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, যাতে ভিন্নমত বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো বার্তা সমাজে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। এর ফলে সৃজনশীলতা এবং মুক্ত চিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
২০. রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকরণ: প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রে ক্ষমতা একজন দার্শনিক রাজার হাতে কেন্দ্রীভূত থাকবে। কোনো বিকেন্দ্রীকরণ বা ক্ষমতার বিভাজন থাকবে না। এই ধরনের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকরণ সর্বাত্মকবাদী শাসনের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে সমস্ত ক্ষমতা একজন নেতা বা একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে থাকে, যা জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার অভাব দেখা দেয়, যা স্বৈরাচারী শাসনকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
উপসংহার: প্লেটোর ‘দি রিপাবলিক’ গ্রন্থে বর্ণিত আদর্শ রাষ্ট্রকে সর্বাত্মকবাদী শাসনের নীল নকশা বলা যায়, কারণ এতে ব্যক্তিস্বাধীনতার অভাব, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, কঠোর শ্রেণি বিভাজন এবং ভিন্নমত দমনের মতো বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা আধুনিক সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। যদিও প্লেটোর উদ্দেশ্য ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, কিন্তু তার প্রস্তাবিত ব্যবস্থাটি মানুষের ব্যক্তিগত অধিকার ও স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে। তাই, প্লেটোর দার্শনিক চিন্তাধারা রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করলেও, এটি সর্বাত্মকবাদী শাসনের এক চরম দৃষ্টান্ত হিসেবেই বিবেচিত হয়ে থাকে।
১. 💠 জ্ঞানী ও স্বৈরাচারী শাসকের কল্পনা
২. 🎭 ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা ও সমষ্টিগত কল্যাণ
৩. 📚 রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থার কঠোর নিয়ন্ত্রণ
৪. 🎖️ সেনা ও অভিভাবকদের কঠোর জীবনযাপন
৫. 🏘️ তিন শ্রেণির সমাজে কঠোর বিভাজন
৬. 💰 সম্পত্তির বিলোপ ও সমষ্টিগত মালিকানা
৭. 👨👩👧👦 পরিবার প্রথার বিলোপ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ
৮. 🤥 মিথ্যার ব্যবহার ও প্রচার
৯. ⚖️ আইনের চেয়ে প্রজ্ঞার প্রাধান্য
১০. 🤝 রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতির উপর জোর
১১. 🚫 ভিন্নমত ও সমালোচনার দমন
১২. 👶 রাষ্ট্র কর্তৃক শিশুদের লালন-পালন
১৩. 🏭 অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ
১৪. 🗳️ গণতন্ত্রের প্রতি ঘৃণা ও সমালোচনা
১৫. 👷 শ্রমের সুনির্দিষ্ট বিভাজন
১৬. 🏋️ সৈনিক ও অভিভাবক শ্রেণির জন্য কঠোর প্রশিক্ষণ
১৭. 🏛️ ব্যক্তির পরিবর্তে রাষ্ট্রের প্রাধান্য
১৮. 📜 ব্যক্তির নৈতিকতা রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত
১৯. 🎨 সৃষ্টিকর্মের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ
২০. 👑 রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকরণ
প্লেটোর ‘দি রিপাবলিক’ বইটি খ্রিস্টপূর্ব ৩৮০ সালের দিকে লেখা হয়েছিল, যা তৎকালীন এথেনীয় গণতন্ত্রের সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত। এই সময়ে এথেন্স স্পার্টার বিরুদ্ধে পেলোপনেশীয় যুদ্ধে পরাজিত হয় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। প্লেটো এই অস্থিরতার সমাধানের জন্য একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। ২০শতাব্দীর ফ্যাসিবাদী ও কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো, যেমন হিটলারের জার্মানি (১৯৩৩-১৯৪৫) এবং স্ট্যালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন (১৯২৪-১৯৫৩), প্লেটোর অনেক ধারণার বাস্তবায়ন করে। এই শাসনব্যবস্থাগুলোতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা, ভিন্নমত দমন এবং একটি একক নেতার অধীনে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ দেখা যায়। বিখ্যাত দার্শনিক কার্ল পপার তার ‘দ্য ওপেন সোসাইটি অ্যান্ড ইটস এনিমিজ’ গ্রন্থে প্লেটোর দর্শনকে ‘সর্বাত্মকবাদের উৎস’ হিসেবে চিহ্নিত করেন, যা রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।

