- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা:
বেকারত্ব বাংলাদেশের একটি প্রধান জাতীয় সমস্যা। কর্মক্ষম মানুষের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে এক বড় বাধা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং দারিদ্র্যের মতো মৌলিক ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। দেশের বিপুল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানের আওতায় আনা না গেলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই প্রবন্ধে আমরা বাংলাদেশের বেকারত্বের কিছু প্রধান কারণ নিয়ে আলোচনা করব।
১। ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা: বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মূলত মুখস্থনির্ভর এবং বাস্তবমুখী শিক্ষার অভাব রয়েছে। আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে তত্ত্বীয় জ্ঞানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যেখানে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ কম। ফলে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশের পর প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও ব্যবহারিক জ্ঞানের অভাবে কর্মসংস্থান খুঁজে পায় না। চাকরির বাজারের চাহিদা ও শিক্ষা কারিকুলামের মধ্যে এই সমন্বয়হীনতা বেকারত্ব বাড়িয়ে তুলছে।
২। অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ: দেশের শিল্প ও কৃষি খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাব একটি বড় সমস্যা। নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে না ওঠায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। দেশি ও বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও আমরা যথেষ্ট সফল হতে পারিনি। অবকাঠামোগত দুর্বলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে অনেক বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন না, যার ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকে।
৩। প্রযুক্তিগত অক্ষমতা: বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর। কিন্তু বাংলাদেশের বেশিরভাগ তরুণ আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ নয়। ডিজিটাল দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবে তারা অনেক উচ্চ বেতনের চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিল্প কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় সনাতন পদ্ধতির কর্মসংস্থানগুলো কমে যাচ্ছে, যা নতুনভাবে দক্ষ কর্মী তৈরি করতে না পারলে বেকারত্বের হার আরও বাড়বে।
৪। জনসংখ্যার আধিক্য: সীমিত সম্পদের তুলনায় বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যা বেকারত্বের একটি অন্যতম কারণ। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করে, কিন্তু সে তুলনায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় না। বিশেষ করে গ্রামের দিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ খুবই কম। ফলে গ্রামীণ বেকারত্বও একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানোর জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
৫। দক্ষ জনশক্তির অভাব: আমাদের দেশে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও দক্ষ জনশক্তির অভাব রয়েছে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় আগ্রহ কম। ফলে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা শেষে কেবল সাধারণ সরকারি ও বেসরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু চাকরির বাজারে যে ধরনের দক্ষ কর্মী প্রয়োজন, সেই ধরনের কর্মীর জোগান কম। এর ফলে অনেক পদ শূন্য থাকলেও উপযুক্ত প্রার্থীর অভাবে নিয়োগ সম্পন্ন হয় না।
৬। চাকরির ধারণার সীমাবদ্ধতা: আমাদের সমাজে চাকরির প্রতি একটি গতানুগতিক ধারণা রয়েছে, যেখানে সরকারি বা নির্দিষ্ট কিছু বেসরকারি চাকরিকে বেশি সম্মানজনক মনে করা হয়। উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা কম। বেশিরভাগ তরুণ চাকরির পেছনে দৌড়ায়, নতুন কিছু শুরু করার ঝুঁকি নিতে চায় না। এই সীমাবদ্ধ ধারণার কারণে সৃষ্টিশীল পেশা এবং নিজের উদ্যোগে কিছু করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকে সেদিকে যায় না, যা বেকারত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
৭। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা: রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। হরতাল, অবরোধ এবং রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়। এর ফলে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় বা নতুন করে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চায় না। এর ফলস্বরূপ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না এবং বিদ্যমান অনেক চাকরিও ঝুঁকির মুখে পড়ে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি কঠিন হয়ে পড়ে।
উপসংহার: বাংলাদেশের বেকারত্ব একটি বহুমাত্রিক সমস্যা যার সমাধান করতে হলে একটি সামগ্রিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা অপরিহার্য। এছাড়া, তরুণদের মাঝে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের সমন্বিত উদ্যোগে বেকারত্ব কমিয়ে আনা সম্ভব।
- ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা
- অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ
- প্রযুক্তিগত অক্ষমতা
- জনসংখ্যার আধিক্য
- দক্ষ জনশক্তির অভাব
- চাকরির ধারণার সীমাবদ্ধতা
- রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা
২০২৩ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ৩.৫১%। এর মধ্যে শিক্ষিত বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে বেশি, যা প্রায় ৪.৫০%। ১৯৭০ সালের দিকে বাংলাদেশের বেকারত্বের হার ছিল ১০-১৫%, যা বর্তমানে কমে এসেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় এই হার কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামানো যাচ্ছে না। ২০২১ সালে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রতি বছর প্রায় ২০ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, যা এখনো সম্ভব হয়নি।

