- readaim.com
- 0
উত্তর::প্রাককথা: সুশাসন মানে এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে সরকার এবং সমাজের সকল প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে, স্বচ্ছভাবে এবং জবাবদিহিতার সঙ্গে কাজ করে। এটি শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, বরং নাগরিক সমাজ, বেসরকারি খাত এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। একটি দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হলে সেখানে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো জনগণের কল্যাণ সাধন এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
সুশাসন (Good Governance) শব্দটি প্রধানত দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত: ‘সু’ (Good) এবং ‘শাসন’ (Governance)।
শাব্দিক অর্থ: ‘সু’ শব্দের অর্থ হলো ‘ভালো’ বা ‘সুন্দর’, আর ‘শাসন’ শব্দের অর্থ হলো ‘পরিচালনা’ বা ‘নিয়ন্ত্রণ’। তাই শাব্দিক অর্থে সুশাসন মানে হলো ‘ভালো বা সুন্দর পরিচালনা’।
সুশাসন একটি বহুমাত্রিক এবং গতিশীল ধারণা। এটি এমন এক পদ্ধতি, যেখানে দেশের সরকার, প্রশাসন এবং সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠান জনগণের স্বার্থে কাজ করে। সুশাসনের মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, অংশগ্রহণ, ন্যায়পরায়ণতা, দক্ষতা, এবং সংবেদনশীলতা। এটি শুধু সরকারি ব্যবস্থার উন্নতি নয়, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসে।
বিভিন্ন গবেষক ও মনীষী সুশাসনকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো:
১। ডিমক ও ডিমক (Dimock and Dimock): তাদের মতে, “সুশাসন হলো এমন একটি প্রশাসন, যা জনগণের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা পূরণে কার্যকর ও দক্ষ।” (Good governance is an administration that is effective and efficient in meeting the needs and aspirations of the people.)
২। এল.ডি. হোয়াইট (L.D. White): তিনি বলেন, “প্রশাসন হলো একটি বিজ্ঞান, যা লক্ষ্য অর্জনে সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে।” (Public administration is the art and science of management as applied to the affairs of the state.)
৩। উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson): তার মতে, “সুশাসন হলো সরকারি কাজ-কর্মের প্রতিটি দিককে সঠিকভাবে পরিচালিত করার কৌশল।” (Good governance is the science and art of carrying out all the operations of a government.)
৪। সাইমন, স্মিথবার্গ ও থম্পসন (Simon, Smithburg and Thompson): তারা বলেন, “প্রশাসন হলো একটি সমবায়মূলক দলীয় প্রচেষ্টা, যা জননীতি বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়।” (Public administration is the cooperative group effort in a public setting.)
৫। ডোয়াইট ওয়াল্ডো (Dwight Waldo): তার মতে, “প্রশাসন হলো সরকারের কার্যক্রম এবং এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের আচরণ।” (Public administration is a field of study and practice that is concerned with the implementation of public policies and programs.)
৬। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary): অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুযায়ী, “সুশাসন হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতা প্রয়োগের মধ্য দিয়ে নীতি ও কার্যক্রম পরিচালিত হয়।” (Good governance is the exercise of power and authority through which policies and actions are directed.)
৭। অধ্যাপক ফিফনার ও প্রেসথাস (P. Fiffner and Presthus): তাদের মতে, “সুশাসন হলো জনসেবার বিজ্ঞান, শিল্প এবং দর্শন, যা জনস্বার্থ নিশ্চিত করে।” (Public administration is the science, art, and philosophy of public service, which ensures public interest.)
উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে আমরা বলতে পারি, সুশাসন হলো এমন একটি শাসন ব্যবস্থা, যেখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, জনগণের অংশগ্রহণ এবং আইনের শাসন নিশ্চিত হয়। এটি একটি জনকল্যাণমূলক সরকার ব্যবস্থা, যা জনগণের অধিকার রক্ষা করে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করে। সংক্ষেপে, এটি এমন এক পরিবেশ, যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের আস্থা অর্জন করে এবং কার্যকরভাবে দেশ পরিচালনা করে।
১। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা: আইনের শাসন নিশ্চিত করা সুশাসনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এর অর্থ হলো আইন সবার জন্য সমান এবং কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সমাজে ধনী-গরীব, ক্ষমতাশালী-সাধারণ মানুষ নির্বিশেষে সবার জন্য আইনের প্রয়োগ নিরপেক্ষ ও কঠোর হতে হবে। বিচার ব্যবস্থা যেন স্বাধীন ও পক্ষপাতহীন হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবে যেন বিচার প্রভাবিত না হয়, সেদিকে কঠোর নজর রাখতে হবে। এতে করে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে এবং সমাজে শৃঙ্খলা বজায় থাকবে।
২। দুর্নীতি দমন: দুর্নীতি বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে এক বড় বাধা। এটি সরকারের দক্ষতা কমিয়ে দেয় এবং জনগণের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে। দুর্নীতি দমনের জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার সঠিক প্রয়োগ অপরিহার্য। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করতে হবে, যাতে তারা কোনো চাপ ছাড়াই তাদের কাজ করতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে। এর জন্য ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে আর্থিক লেনদেন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের তথ্য প্রকাশ করা যেতে পারে।
৩। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: সরকারের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সুশাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি কর্মকর্তাদের কাজের মানদণ্ড নির্ধারণ এবং তাদের কর্মকাণ্ডের নিয়মিত মূল্যায়ন করা উচিত। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা দরকার, যাতে জনগণ সরকারি সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পারে। তথ্য অধিকার আইনকে আরও কার্যকর করতে হবে, যাতে নাগরিকরা সহজেই সরকারি তথ্য পেতে পারে। যখন সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করে, তখন ভুল বা অনিয়মের সুযোগ কমে যায়।
৪। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: একটি সুস্থ ও স্বাধীন গণমাধ্যম সুশাসনের জন্য জরুরি। গণমাধ্যম সরকারের কর্মকাণ্ডের উপর নজর রাখে এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর প্রকাশ করে। গণমাধ্যমকে নির্ভয়ে সংবাদ পরিবেশনের সুযোগ দেওয়া উচিত এবং তাদের উপর কোনো রাজনৈতিক বা অন্য কোনো চাপ প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও তার সঠিক বাস্তবায়ন জরুরি, যাতে সাংবাদিকরা নিরাপদে কাজ করতে পারে। স্বাধীন গণমাধ্যম শক্তিশালী জনমত গঠনে সহায়তা করে এবং সরকারকে আরও বেশি দায়িত্বশীল করে তোলে।
৫। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাখতে হবে, যাতে বিচারকরা কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত হয়ে নিরপেক্ষভাবে রায় দিতে পারেন। বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও মেধার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। বিচারকদের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ উন্নত করতে হবে, যাতে তারা কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। একটি স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা জনগণের অধিকার রক্ষা করে এবং সরকারের ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখে।
৬। স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ: স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও কার্যকর করা সুশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দিতে হবে, যাতে তারা স্থানীয় জনগণের চাহিদা অনুযায়ী উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে, যাতে তারা নিজেদের এলাকার উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখতে পারে। এর ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে স্বশাসন ও দায়িত্ববোধ তৈরি হবে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের উপর চাপ কমবে।
৭। জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি: সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের মতামত ও পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ফোরামের মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে সরকারের নিয়মিত আলাপ-আলোচনা হওয়া দরকার। স্থানীয় পর্যায়ে ওয়ার্ড কমিটি, নাগরিক কমিটি গঠন করে জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা যেতে পারে। যখন জনগণ নিজেদেরকে শাসন প্রক্রিয়ার অংশ মনে করে, তখন তারা আরও দায়িত্বশীল হয় এবং সরকারি সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে।
৮। প্রশাসনিক সংস্কার: সরকারি প্রশাসনকে আরও দক্ষ, জনবান্ধব ও কার্যকর করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং জনগণের জন্য সরকারি সেবা সহজলভ্য করা জরুরি। ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে ই-গভর্নেন্স চালু করা যেতে পারে, যাতে নাগরিকরা সহজেই অনলাইনে বিভিন্ন সরকারি সেবা পেতে পারে। সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং তাদের কাজের মূল্যায়ন করে পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এর ফলে প্রশাসনের দক্ষতা বাড়বে এবং জনগণের হয়রানি কমবে।
৯। নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার: একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য। নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে তারা কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে। ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা এবং স্বচ্ছ ব্যালট বা ইভিএম ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। নির্বাচনে কালো টাকা ও পেশীশক্তির ব্যবহার রোধ করার জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা জনগণের আস্থা তৈরি করে এবং প্রকৃত জনপ্রতিনিধিদের নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ দেয়।
১০। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংস্কার: পুলিশসহ অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ হতে হবে। তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। পুলিশকে জনগণের বন্ধু হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে জনগণ তাদের উপর আস্থা রাখতে পারে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে মানবাধিকার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং কোনো প্রকার হয়রানি বা নির্যাতনের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এর ফলে সমাজে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
১১। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: সমাজে ধনী-গরীব, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সুশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করতে হবে। নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি সুযোগ-সুবিধা যেন সবাই সমানভাবে পায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। সমাজে সমতা ও বৈষম্যহীন পরিবেশ তৈরি করতে পারলে সবার মধ্যে এক ধরনের সম্প্রীতি ও আস্থা তৈরি হবে।
১২। প্রযুক্তি ব্যবহার: সরকারি সেবায় প্রযুক্তি ব্যবহার করে ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠা করা সুশাসনের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। এতে করে সেবার মান উন্নত হয় এবং দুর্নীতি কমে। জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ভূমি রেজিস্ট্রেশন, ট্যাক্স প্রদান ইত্যাদি সরকারি সেবা অনলাইনে প্রদান করা যেতে পারে। এটি জনগণের সময় বাঁচায় এবং হয়রানি কমায়। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্যের দ্রুত আদান-প্রদান সম্ভব হয়, যা সরকারি কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করে তোলে। এর ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পায়।
১৩। সুশীল সমাজের ভূমিকা: সুশীল সমাজ সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, নাগরিক গ্রুপ, এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান সরকারকে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে পরামর্শ দিতে পারে। তারা সরকারের কর্মকাণ্ডের উপর নজর রাখতে পারে এবং অনিয়ম তুলে ধরতে পারে। সুশীল সমাজের শক্তিশালী উপস্থিতি সরকারের উপর এক ধরনের নৈতিক চাপ তৈরি করে, যা তাদেরকে আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করে। সরকার ও সুশীল সমাজের মধ্যে একটি গঠনমূলক সম্পর্ক থাকা জরুরি।
১৪। নৈতিকতার প্রচার: সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই নৈতিকতার প্রচার ও অনুশীলন সুশাসনের জন্য অত্যাবশ্যক। সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের মনোভাব তৈরি করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যাতে নতুন প্রজন্ম ছোট থেকেই নৈতিক মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন হয়। সমাজে ভালো কাজের জন্য স্বীকৃতি দেওয়া এবং খারাপ কাজের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। একটি নৈতিক সমাজব্যবস্থা তৈরি করতে পারলে দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগ কমে যাবে।
১৫। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: গণতন্ত্রকে শুধু নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা জরুরি। এর অর্থ হলো গণতান্ত্রিক নিয়ম ও মূল্যবোধকে সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিষ্ঠিত করা। রাজনৈতিক দলগুলোকে দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা করতে হবে। বিরোধী দলগুলোকে তাদের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করতে দেওয়া উচিত। সংসদকে কার্যকর করতে হবে এবং সেখানে গঠনমূলক আলোচনা ও বিতর্ক নিশ্চিত করা দরকার। এর ফলে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে এবং জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে।
১৬। শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণ: শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। শিক্ষাক্রমে নৈতিক শিক্ষা, নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব, এবং সুশাসনের ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার ক্ষমতা তৈরি করতে হবে, যাতে তারা সমাজে প্রচলিত অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শেখে। একটি শিক্ষিত ও সচেতন সমাজ সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য।
১৭। মানব সম্পদ উন্নয়ন: দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানব সম্পদ সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা জনগণের সেবা আরও ভালোভাবে প্রদান করতে পারে। কর্মীদের কাজের স্বীকৃতি ও উপযুক্ত বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করা উচিত, যাতে তারা দুর্নীতির দিকে ঝুঁকে না পড়ে। একটি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।
উপসংহার: বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা কোনো এক দিনের কাজ নয়, বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এর জন্য দরকার সরকারি ও বেসরকারি সব পক্ষের আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের সার্বিক প্রশাসনিক কাঠামো মজবুত হবে, দুর্নীতি কমবে এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত হবে। এর ফলে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
সুশাসন:- জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের কল্যাণে পরিচালিত একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং ন্যায়ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা।
সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ:-
- ⚖️ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা
- 🚫 দুর্নীতি দমন
- 🤝 স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ
- 📰 গণমাধ্যমের স্বাধীনতা
- 👨⚖️ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
- 🏡 স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ
- 👥 জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি
- 🏛️ প্রশাসনিক সংস্কার
- 🗳️ নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার
- 👮 আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংস্কার
- ⚖️ সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা
- 💻 প্রযুক্তি ব্যবহার
- 🗣️ সুশীল সমাজের ভূমিকা
- 💖 নৈতিকতার প্রচার
- ✊ গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ
- 🎓 শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণ
- 🧑🤝🧑 মানব সম্পদ উন্নয়ন
বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে জনগণের মৌলিক অধিকার ও আইনের শাসনের কথা বলা হয়েছে। ১৯৯৫ সালে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এর রিপোর্টে বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন সংস্কারের প্রেরণা দেয়। ২০০৪ সালে প্রণীত তথ্য অধিকার আইন (RTI) জনগণের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করে, যদিও এর বাস্তবায়ন এখনও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। ২০১০ সালে প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) এর জরিপে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টিতে সহায়ক হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে, ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি বড় অভিযান চালিয়েছিল, যা জনগণের মধ্যে সুশাসন নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার করে। এই সব ঘটনা ও পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে যে, সুশাসন একটি চলমান সংগ্রামের নাম।

