- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তি এবং জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষার শেষ আশ্রয়স্থল। বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং স্বৈরাচারী প্রবণতা রোধে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা অপরিহার্য। নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত হয়ে বিচার বিভাগ যাতে নির্ভয়ে কাজ করতে পারে, সেই উপায়সমূহ নিচে আলোচনা করা হলো।
বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা করার উপায়সমূহ:
১। সাংবিধানিক নিশ্চয়তা: বাংলাদেশের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের কথা বলা হয়েছে। এই সাংবিধানিক নির্দেশনাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে হবে যেন কোনো সরকারই সাধারণ আইনের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে না পারে। সংবিধানের এই মৌলিক কাঠামোকে চিরতরে অপরিবর্তনীয় ঘোষণা করে বিচারালয়ের সর্বোচ্চ মর্যাদা ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
২। পৃথক সচিবালয়: বিচার বিভাগের জন্য সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও স্বাধীন একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি। বর্তমানে অধস্তন আদালতের প্রশাসনিক অনেক সিদ্ধান্তের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা স্বাধীনতার পরিপন্থী। সুপ্রিম কোর্টের অধীনে একটি পৃথক সচিবালয় গঠিত হলে বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও ছুটি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ বন্ধ হবে।
৩। নিয়োগে স্বচ্ছতা: উচ্চ ও অধস্তন উভয় আদালতে বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনা প্রয়োজন। বিচারক নিয়োগের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট, স্থায়ী এবং স্বাধীন ‘বিচারক নিয়োগ কমিশন’ গঠন করা উচিত। দলীয় রাজনৈতিক বিবেচনা বা স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে উঠে মেধা, সততা, দক্ষতা ও নৈতিকতাকে একমাত্র মাপকাঠি ধরে বিচারক নিয়োগ দিলে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও জনআস্থা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
৪। আর্থিক স্বনির্ভরতা: বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো এর নিজস্ব এবং পর্যাপ্ত আর্থিক বাজেট ও স্বনির্ভরতা। প্রতি বছর বাজেটে বিচার বিভাগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের অধীনে ন্যস্ত করা উচিত। এই অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে আইন বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দিলে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে তার প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ও দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।
৫। চাকরির নিরাপত্তা: বিচারকদের কর্মকালের স্থায়িত্ব এবং চাকরির সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য আবশ্যক। কোনো সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণিত অসদাচরণ ছাড়া কোনো বিচারককে যেন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পদচ্যুত বা অপসারিত না করা যায়। চাকরির এই আইনগত সুরক্ষা বিচারকদের যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ, ভয়ভীতি বা প্রলোভনের ঊর্ধ্বে উঠে সম্পূর্ণ নির্ভয়ে রায় প্রদানের সাহস জোগাবে।
৬। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল: উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাত থেকে সরিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে পুনঃঅর্পণ করা উচিত। বিচারকদের জবাবদিহিতা ও অপসারণের দায়িত্ব রাজনীতিমুক্ত ও পেশাদার বিচারকদের হাতে থাকাই যুক্তিযুক্ত। এর ফলে বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক দল বা সংসদের অযাচিত আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ থাকবে না এবং বিচার বিভাগের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন থাকবে।
৭। মেধাসম্পন্ন বিচারক: বিচার বিভাগে যোগ্য, সৎ এবং অত্যন্ত মেধাবী আইনজীবীদের বিচারক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ধারা আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করে সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাদারিত্বকে অগ্রাধিকার দিলে বিচার ব্যবস্থার মান উন্নত হবে।
৮। আদর্শ বেতন কাঠামো: বিচারকদের সামাজিক মর্যাদা রক্ষার্থে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে একটি আকর্ষণীয় ও স্বাধীন বেতন কাঠামো প্রবর্তন করা উচিত। সরকারি অন্যান্য আমলাদের চেয়ে বিচারকদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সম্মানজনক পর্যায়ে রাখা প্রয়োজন। আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে বিচারকদের দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে হ্রাস পায় এবং তারা সম্পূর্ণ সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
৯। উন্নত প্রশিক্ষণ: নবীন ও প্রবীণ সকল স্তরের বিচারকদের জন্য নিয়মিত আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক মানের বিচারিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। জুডিশিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং ইনস্টিটিউটকে (জেটিআই) আরও আধুনিকায়ন করে তথ্যপ্রযুক্তি ও সমসাময়িক আইনের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। উন্নত প্রশিক্ষণ বিচারকদের বিচারিক দক্ষতা বৃদ্ধি করবে এবং জটিল মামলার দ্রুত ও সঠিক নিষ্পত্তিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
১০। অবকাঠামোগত উন্নয়ন: দেশের উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের আদালতসমূহের ভৌত অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন প্রয়োজন। বিচারকদের বসার কক্ষ, এজলাস এবং মামলার নথিপত্র সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। উপযুক্ত কর্মপরিবেশ না থাকলে বিচারকরা মনস্তাত্ত্বিকভাবে চাপের মধ্যে থাকেন, যা প্রকারান্তরে তাদের বিচারিক কাজের গতি ও স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করে।
১১। ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া: সমগ্র বিচার ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ তথ্যপ্রযুক্তি বা ই-জুডিশিয়ারি ব্যবস্থার আওতায় এনে আধুনিকায়ন করতে হবে। মামলার ফাইলিং, কজ লিস্ট, রায় প্রকাশ এবং নোটিশ জারির প্রক্রিয়া অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা উচিত। বিচার প্রক্রিয়ায় ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত হলে দীর্ঘসূত্রতা কমবে, দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে এবং সাধারণ মানুষের কাছে বিচার প্রাপ্তির বিষয়টি অত্যন্ত সহজ ও স্বচ্ছ হবে।
১২। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তকরণ: বিচার বিভাগকে সকল ধরনের দলীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত আদালতকে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার মানসিকতা পরিহার করা। বিচারকরা যাতে কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগত না হয়ে শুধুমাত্র সংবিধান ও আইনের অনুগত থাকেন, সেই সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেশে গড়ে তুলতে হবে।
১৩। কঠোর নিরাপত্তা: বিচারক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে পর্যাপ্ত ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক। চাঞ্চল্যকর ও সংবেদনশীল মামলার রায় প্রদানের সময় বিচারকরা প্রায়শই অপরাধী চক্রের দ্বারা নানামুখী হুমকির সম্মুখীন হন। রাষ্ট্র যদি বিচারকদের সার্বক্ষণিক ও নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে তারা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করতে পারবেন না।
১৪। মিডিয়া ট্রায়াল বন্ধ: কোনো বিচারাধীন মামলা নিয়ে গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতিরিক্ত চর্চা বা ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ বন্ধ হওয়া উচিত। গণমাধ্যমের অনাকাঙ্ক্ষিত ও একপেশে প্রচারণার কারণে অনেক সময় বিচারকদের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি হয়। বিচার বিভাগকে স্বাধীন রাখতে হলে জনআবেগের জোয়ারে না ভেসে আইনের চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।
১৫। বার ও বেঞ্চের সমন্বয়: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে আইনজীবী সমিতি (বার) এবং বিচারকদের (বেঞ্চ) মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। আইনজীবীদের দলীয় রাজনীতি বিচারালয়ের পরিবেশকে যেন কলুষিত না করে সেদিকে বার কাউন্সিলকে কঠোর নজর রাখতে হবে। বার ও বেঞ্চের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও পেশাদারিত্বের সম্পর্ক আদালতের পবিত্রতা রক্ষা করে এবং বিচারিক স্বাধীনতাকে মজবুত ভিত্তি দান করে।
১৬। সুনির্দিষ্ট বদলি নীতি: অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি এবং পদোন্নতির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট, যৌক্তিক ও স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করা অত্যন্ত প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিবেচনায় বা আইন মন্ত্রণালয়ের একক ইচ্ছায় কোনো বিচারককে শাস্তি হিসেবে ঢাকার বাইরে বা দুর্গম এলাকায় বদলি করা যাবে না। মেধা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় পদোন্নতি এবং বদলি নীতি চালু থাকলে বিচারকরা স্বস্তিতে কাজ করতে পারবেন।
১৭। জনসচেতনতা বৃদ্ধি: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলনে সাধারণ জনগণের সচেতনতা ও সক্রিয় সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং বুদ্ধিজীবী মহলকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার গুরুত্ব সম্পর্কে সর্বদা সোচ্চার ও সজাগ থাকতে হবে। জনগণ যখন আদালতের স্বাধীনতার পক্ষে ঢাল হিসেবে দাঁড়াবে, তখন কোনো স্বৈরাচারী শক্তির পক্ষেই বিচার বিভাগকে কুক্ষিগত করা সম্ভব হবে না।
সমাপনি: পরিশেষে বলা যায়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল কাগজের কলমে বা সংবিধানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, এর বাস্তব প্রয়োগ ঘটাতে হবে। নির্বাহী বিভাগের সদিচ্ছা, রাজনৈতিক দলগুলোর পরমতসহিষ্ণুতা এবং বিচারকদের নিজস্ব সততাই পারে একটি প্রকৃত স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। বিচার বিভাগ স্বাধীন হলে দেশ দুর্নীতিমুক্ত হবে এবং প্রতিটি নাগরিক তার ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে। একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার কোনো বিকল্প নেই।