- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: আমরা সবাই সমাজে কিছু নিয়মকানুন মেনে চলি। এগুলো আমাদের আচরণ, কথাবার্তা এবং জীবনযাত্রার ধরনকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে রাখে। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সমাজের এই প্রচলিত নিয়ম বা প্রত্যাশা থেকে সরে যায়, তখন তাকে “বিচ্যুতি” বলা হয়। বিচ্যুতি কেবল অপরাধ নয়, এটি সমাজের আদর্শ থেকে যেকোনো ধরনের ভিন্নতাকেই বোঝায়। এই বিচ্যুতি আমাদের সামাজিক জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিচ্যুতি শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো “নিয়ম থেকে সরে যাওয়া” বা “পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া”। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, বিচ্যুতি হলো এমন কোনো আচরণ বা কার্যকলাপ যা সমাজের অধিকাংশ মানুষ কর্তৃক প্রত্যাশিত আদর্শ, মূল্যবোধ বা নিয়মাবলীর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এটি এমন একটি ধারণা যা শুধু অপরাধমূলক কাজকেই বোঝায় না, বরং সমাজে স্বাভাবিক বলে বিবেচিত আচরণ থেকে যেকোনো ধরনের বিচ্যুতিকেও বোঝায়। যেমন, একজন শিল্পী যিনি সমাজের গতানুগতিক পেশা ছেড়ে ব্যতিক্রমী জীবন বেছে নিয়েছেন, তিনিও এক অর্থে বিচ্যুত।
বিচ্যুতির সংজ্ঞা বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে দিয়েছেন। নিচে কিছু প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানীর দেওয়া সংজ্ঞা উল্লেখ করা হলো:
১। এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim): ডুর্খেইম-এর মতে, বিচ্যুতি হলো একটি স্বাভাবিক সামাজিক ঘটনা। এটি সমাজের নৈতিক কাঠামোকে স্পষ্ট করে এবং সমাজের ঐক্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। (Deviance is a normal social phenomenon that helps to clarify society’s moral boundaries and maintain social unity.)
২। অগাস্ট কোঁৎ (Auguste Comte): কোঁৎ সরাসরি বিচ্যুতিকে সংজ্ঞায়িত না করলেও তিনি সমাজের স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, যখন কোনো আচরণ সমাজের আদর্শ কাঠামোকে ব্যাহত করে, তখন তা বিচ্যুতি হিসেবে বিবেচিত হয়। (Though Comte did not directly define deviance, he emphasized social stability. According to him, any behavior that disrupts the ideal structure of society is considered deviant.)
৩। কার্ল মার্কস (Karl Marx): মার্কসের দৃষ্টিকোণ থেকে, বিচ্যুতি হলো মূলত সমাজের ক্ষমতা কাঠামোর প্রতিফলন। পুঁজিবাদের শোষণমূলক ব্যবস্থায় সমাজের নিম্নবর্গের মানুষেরা যে আচরণ করে, তা উচ্চবর্গের মানুষ বিচ্যুতি হিসেবে আখ্যায়িত করে। (From a Marxist perspective, deviance is a reflection of the social power structure. Behaviors of the lower classes are often labeled as deviant by the upper classes in a capitalist exploitative system.)
৪। অগবার্ন ও নিমকফ (Ogburn and Nimkoff): এই দুই সমাজবিজ্ঞানীর মতে, যখন কোনো ব্যক্তি সমাজের প্রত্যাশা থেকে ভিন্নভাবে আচরণ করে, তখন তাকে বিচ্যুত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। (According to Ogburn and Nimkoff, an individual is identified as deviant when they behave in a way that is different from societal expectations.)
৫। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber): ওয়েবার বিচ্যুতিকে ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদার প্রেক্ষাপটে দেখেছেন। তার মতে, সমাজের প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ ও নিয়মকে আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং এর বাইরে যাওয়া যেকোনো আচরণকে বিচ্যুতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। (Weber viewed deviance in the context of power and social status. According to him, the dominant groups in society establish their own values and norms as the ideal, and any behavior outside of these is defined as deviant.)
৬। টমাস হবস (Thomas Hobbes): হবসের মতে, বিচ্যুতি হলো প্রাকৃতিক অবস্থার একটি অংশ। সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে মানুষ স্বাভাবিক বিশৃঙ্খলা থেকে বেরিয়ে আসে এবং সমাজের নিয়ম মেনে চলার জন্য সম্মত হয়। যখন এই চুক্তি ভঙ্গ হয়, তখন বিচ্যুতি ঘটে। (According to Hobbes, deviance is a part of the natural state. Through a social contract, people emerge from natural chaos and agree to abide by social rules. When this contract is violated, deviance occurs.)
৭। জ্যাঁ-জ্যাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau): রুশো মনে করতেন, মানুষ জন্মগতভাবে ভালো। কিন্তু সমাজের দূষিত প্রভাব মানুষকে বিচ্যুত হতে বাধ্য করে। তাই বিচ্যুতি হলো সমাজের কাঠামোগত সমস্যার ফল। (Rousseau believed that people are inherently good. But the corrupting influence of society forces people to become deviant. Therefore, deviance is a result of structural problems in society.)
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে আমরা বলতে পারি, বিচ্যুতি হলো সমাজের প্রচলিত নিয়ম, আদর্শ বা মূল্যবোধের পরিপন্থী এমন কোনো আচরণ, যা সমাজের অধিকাংশ সদস্যের কাছে অপ্রত্যাশিত এবং অগ্রহণযোগ্য। এই বিচ্যুতি সমাজের স্থিতিশীলতাকে যেমন চ্যালেঞ্জ করে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে নতুন সামাজিক পরিবর্তনের পথও খুলে দেয়।
উপসংহার: বিচ্যুতি সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি একদিকে যেমন সমাজের নিয়মশৃঙ্খলা ভঙ্গ করে, তেমনি অন্যদিকে এটি সমাজের পরিবর্তনের একটি চালিকাশক্তি হিসেবেও কাজ করে। সমাজের নিয়মকানুনগুলো যখন পরিবর্তিত হয়, তখন যে আচরণগুলো আগে বিচ্যুতি হিসেবে বিবেচিত হতো, সেগুলো সময়ের সাথে সাথে স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে। তাই, বিচ্যুতিকে কেবল নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয়, বরং এটি সমাজের গতিশীলতা ও বিবর্তনের একটি সূচক হিসেবেও বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।
১৯৬০ সালের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সিভিল রাইটস মুভমেন্ট (Civil Rights Movement) এর সময় মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র (Martin Luther King Jr.) এর নেতৃত্বে সমাজের প্রচলিত বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছিল, তা তৎকালীন সময়ে এক ধরনের বিচ্যুতি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এটিই সমাজে ন্যায়বিচার ও সাম্য প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে, বিচ্যুতি কেবল সমাজের সমস্যা নয়, বরং সমাজের বিবর্তন ও অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

