- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা:- বিচ্যুত আচরণ হলো মানুষের সামাজিক নিয়ম ও প্রথা থেকে বিচ্যুত হয়ে এমন কিছু কাজ বা আচরণ করা যা সাধারণত সমাজে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে ধরা হয়। সমাজে একজন ব্যক্তি যখন তার প্রচলিত আচরণগুলোর বাইরে কিছু করে, তখন তাকে বিচ্যুত আচরণ বলা হয়। এই আচরণের মাধ্যমে সমাজের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং আইনগত কাঠামোতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। এখন আমরা এই বিচ্যুত আচরণের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য আলোচনা করবো।
বিচ্যুত আচরণের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:-
১.বিচ্যুত আচরণ সমাজের নিয়মাবলীর বিরুদ্ধে:- বিচ্যুত আচরণ মূলত সমাজের প্রচলিত নিয়ম ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে হয়ে থাকে। যখন কোনো ব্যক্তি সমাজের স্বীকৃত আদর্শ থেকে সরে গিয়ে এমন কিছু আচরণ করে যা সাধারণভাবে অনুমোদিত নয়, তখন এটি বিচ্যুত আচরণ হিসেবে গণ্য হয়। সমাজের কাঠামোতে এই ধরনের আচরণ একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করে যা সমাজের কাঠামোকে দুর্বল করে দিতে পারে।
২.নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি:- বিচ্যুত আচরণ সামাজিক অস্থিরতা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। যদি একজন ব্যক্তি নিয়মের বাইরে গিয়ে আচরণ করে, তা অন্যান্যদের জন্য উদাহরণ হতে পারে, যার ফলে সমাজে আরও বেশি নৈরাজ্য এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে সামাজিক শান্তি বিঘ্নিত হয় এবং মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভয় বা অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়।
৩.আগ্রহ ও মনোযোগ আকর্ষণ:- বিচ্যুত আচরণ এমনকি কিছু ক্ষেত্রে লোকজনের মধ্যে আগ্রহ এবং মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে। অনেক সময়, বিচ্যুত আচরণ সামাজিক দৃষ্টি আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যেও হয়ে থাকে, যেমন কোনও বিশেষ আচরণ বা কাজের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ। এই ধরনের আচরণ আসলে ব্যক্তি তার প্রতিষ্ঠিত জায়গা থেকে কিছুটা দূরে চলে আসে এবং মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
৪. মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা:- বিচ্যুত আচরণ অনেক সময় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বা মানসিক অসুস্থতার প্রকাশ হতে পারে। কোনো ব্যক্তি যদি দীর্ঘ সময় ধরে বিচ্যুত আচরণ প্রদর্শন করে, তবে এটি তার মানসিক অবস্থার অবনতির ইঙ্গিত হতে পারে। এ ধরনের সমস্যা যেমন ডিপ্রেশন, উদ্বেগ বা অন্য কোনো মানসিক সমস্যা থেকে উদ্ভূত হতে পারে।
৫. অপরাধমূলক আচরণ:- বিচ্যুত আচরণের মধ্যে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সৃষ্টি হতে পারে, যেমন চুরি, মাদক সেবন, সহিংসতা, বা অন্য কোনো ধরনের সামাজিক অপরাধ। এই ধরনের আচরণ সমাজের নৈতিকতা এবং আইনগত কাঠামোর বিপরীতে চলে এবং সামাজিক শান্তি এবং নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
৬.অস্থিরতা ও পরিণতির আশঙ্কা:- বিচ্যুত আচরণের ফলে অনেক সময় ব্যক্তি নিজেও অস্থিরতায় ভোগে এবং ভবিষ্যতে তার জন্য নানা পরিণতি ঘটতে পারে। সে যদি অপরাধমূলক কাজ করে, তবে তাকে আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হতে পারে। এমনকি এটি তার সামাজিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
৭.সমাজের জন্য ক্ষতিকর পরিণতি:- বিচ্যুত আচরণ সমাজের জন্য নানা ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি একজন ব্যক্তি মাদক সেবন করে, তা শুধু তার নিজের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং সমাজের সবার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। এটি স্বাস্থ্য সেবা খাত, আইন ব্যবস্থা এবং সমাজের উন্নতির জন্য ব্যাপক ক্ষতি সৃষ্টি করতে পারে।
৮.প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা:- বিচ্যুত আচরণ অনেক সময় সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি করতে পারে। যখন একজন ব্যক্তি সমাজের কাছ থেকে বিচ্যুত হয়, তখন সে তার পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং সে আরও একাকী হয়ে যেতে পারে। সামাজিক একত্রিত হওয়ার ধারণা ভেঙে পড়তে পারে এবং সমাজের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধি পায়।
৯.অনিয়ন্ত্রিত আচরণের বৃদ্ধি:- বিচ্যুত আচরণ অনেক সময় অতি অনিয়ন্ত্রিত আচরণের কারণে হয়ে থাকে। বিশেষ করে যখন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সামাজিক চাপে থাকে, তাদের মনোভাব এবং আচরণে সহিংসতা ও অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। অস্থিরতার কারণে তারা আরও এক ধরনের নিয়ন্ত্রণহীনতা অনুভব করতে থাকে।
১০.বিকল্প ও সমাধানের প্রস্তাব:- বিচ্যুত আচরণের সমাধান হিসেবে সমাজকে আরো সচেতন ও সহানুভূতির সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। এমনকি ব্যক্তিদের সঠিক পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান করা জরুরি, যেন তারা সমাজের সাধারণ নিয়মে ফিরে আসতে পারে। একে অপরকে সহায়তা প্রদান এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।
উপসংহার:- বিচ্যুত আচরণ সমাজের জন্য একটি সমস্যা সৃষ্টি করে এবং এটি ব্যক্তির পাশাপাশি পুরো সমাজের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে, যদি এই আচরণগুলো সঠিকভাবে মোকাবিলা করা যায়, তাহলে মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করা সম্ভব। সমাজের প্রতি দায়িত্বশীলতা ও সহানুভূতি বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা এই সমস্যা মোকাবিলা করতে পারি।
এক নজরে সামাজিক বিচ্যুত আচরণের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো:-
⭐ বিচ্যুত আচরণ সমাজের নিয়মাবলীর বিরুদ্ধে
⭐ নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি
⭐ আগ্রহ ও মনোযোগ আকর্ষণ
⭐ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা
⭐ অপরাধমূলক আচরণ
⭐ অস্থিরতা ও পরিণতির আশঙ্কা
⭐ সমাজের জন্য ক্ষতিকর পরিণতি
⭐ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
⭐ অনিয়ন্ত্রিত আচরণের বৃদ্ধি
⭐ বিকল্প ও সমাধানের প্রস্তাব।
বিচ্যুত আচরণের ঘটনা সমাজে নানা সময় নানা রূপে প্রকাশ পায়। ১৯৭০ সালে ডেভিড রোসমন-এর একটি জরিপে বলা হয়েছিল যে, বিচ্যুত আচরণ সমগ্র সমাজে দেখা যায়, তবে এটি সমাজের সামগ্রিক কাঠামোর উপর নির্ভর করে। ২০০৭ সালে “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা” জানিয়েছিল যে, মানসিক সমস্যা ও বিচ্যুত আচরণ মানুষের মানসিক সুস্থতার জন্য হুমকি। বর্তমানে, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই আচরণগুলো সমাজে অনেক বেশি চোখে পড়ে এবং এর সমাধান দরকার।

