- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বিংশ শতকের শেষে যে গণতন্ত্রকে মানব সভ্যতার শেষ গন্তব্য মনে করা হয়েছিল, একবিংশ শতকের সাম্প্রতিক বিশ্বব্যবস্থায় তা এক গভীর ও বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি। বিশ্বজুড়ে আজ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, মূল্যবোধ এবং জনআস্থার দেয়ালে ফাটল ধরছে। স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার উত্থান এবং ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণ বর্তমান সময়ে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে এক বড় প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
১। পপুলিজমের উত্থান: সাম্প্রতিক বিশ্বে উগ্র পপুলিজম বা জনতোষণবাদের উত্থান গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক দেশে নেতারা জনগণের আবেগ ও মেরুকরণকে পুঁজি করে ক্ষমতায় আসছেন। তারা জটিল রাষ্ট্রীয় সমস্যার অতি-সরলীকৃত ও সস্তা সমাধান দিয়ে আমজনতাকে বিভ্রান্ত করছেন। এর ফলে বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ধ্বংস হচ্ছে এবং সমাজে অসহিষ্ণুতা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা: একটি সবল গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো তার স্বাধীন ও শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ। কিন্তু বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং দুর্নীতি দমন সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। শাসকগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে এসব প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করায় এগুলো তাদের নিরপেক্ষতা হারাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের এই ক্ষয়িষ্ণু রূপ সাধারণ মানুষের মনে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি চরম অনীহা তৈরি করছে।
৩। ভুয়া তথ্যের বিস্তার: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহারের ফলে ভুয়া তথ্য ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানো বর্তমান সময়ে মহামারি আকার ধারণ করেছে। নির্বাচনের সময় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। নাগরিকরা সঠিক ও নিরপেক্ষ তথ্য না পাওয়ায় তাদের ভোটাধিকারের সঠিক প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই ডিজিটাল অপপ্রচার গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ভেতরের স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক বিশ্বাসকে প্রতিনিয়ত বিষাক্ত করে তুলছে।
৪। আর্থসামাজিক বৈষম্য: অর্থনৈতিক অসমতা ও ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার আকাশচুম্বী ব্যবধান গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় অর্থনৈতিক সম্পদ ও ক্ষমতা অল্প কিছু মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হয়ে পড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ মনে করছে যে প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কেবল ধনীদের স্বার্থ রক্ষা করে। এই চরম ক্ষোভ ও হতাশা থেকে মানুষ ক্রমান্বয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে।
৫। স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা: গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়েও অনেক দেশের সরকার প্রধানরা পরবর্তীতে স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ প্রদর্শন করছেন। তারা আইন পরিবর্তন করে নিজেদের ক্ষমতার মেয়াদ বাড়াচ্ছেন এবং বিরোধী দলকে দমন করছেন। দৃশ্যত গণতান্ত্রিক কাঠামো বজায় থাকলেও ভেতরে ভেতরে একনায়কতন্ত্র চর্চা করা হচ্ছে, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ছদ্মবেশী স্বৈরতন্ত্র বলছেন। এই প্রবণতা বিশ্বজুড়ে প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিচ্ছে।
৬। ভোটের রাজনীতি: বর্তমান সময়ে অনেক দেশে নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় বা নামমাত্র খেলায় পরিণত হয়েছে। নির্বাচনের স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে বিশ্বব্যাপী নানামুখী প্রশ্ন ও বিতর্ক উঠছে। কারচুপি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং টাকার খেলার কারণে সাধারণ ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। ভোটাধিকারের এই অবমূল্যায়ন সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বৈধতাকেই চরম সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
৭। মানবাধিকার লঙ্ঘন: গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো নাগরিকদের মৌলিক ও মানবাধিকারের সুনিশ্চিত সুরক্ষা প্রদান করা। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্বব্যবস্থায় বাক-স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার মারাত্মকভাবে খর্ব করা হচ্ছে। ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধ করতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে নিষ্ঠুরভাবে ব্যবহার করার ঘটনা অহরহ ঘটছে। মানবাধিকারের এই চরম বিপর্যয় বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক কাঠামোর মূল সৌন্দর্যকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।
৮। বিচারহীনতার সংস্কৃতি: আইনের শাসন যেখানে দুর্বল, সেখানে গণতন্ত্র কখনোই মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে can না। বর্তমান বিশ্বে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার এক ভয়ানক বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করায় সাধারণ নাগরিকরা তীব্র আইনি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এই বিচারহীনতা সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি চরম অনাস্থা আনছে।
৯। ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব: পরাশক্তিদের মধ্যকার তীব্র দ্বন্দ ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের বিস্তারকে ব্যাহত করছে। অনেক বড় দেশ নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য অন্যান্য দেশের স্বৈরাচারী সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে। গণতন্ত্রের প্রসার বা মানবাধিকার রক্ষার চেয়ে এখন কৌশলগত অংশীদারিত্ব রাষ্ট্রগুলোর কাছে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। এই দ্বিমুখী নীতি ও স্বার্থের রাজনীতি বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে ব্যাপকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে।
১০। নজরদারি পুঁজিবাদ: আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ও গোপনীয়তা আর সুরক্ষিত নয়। বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে নাগরিকদের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছে। বিগ ডাটা বিশ্লেষণ করে মানুষের চিন্তাভাবনা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে গোপনে নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করা হচ্ছে। এই ডিজিটাল নজরদারি নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে কেড়ে নিয়ে গণতন্ত্রের মূল চেতনাকে বিপন্ন করছে।
১১। মতাদর্শিক মেরুকরণ: বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় রাজনৈতিক ও সামাজিক দলগুলোর মধ্যে চরম মতাদর্শিক মেরুকরণ বা বিভাজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরমতসহিষ্ণুতা এবং সমঝোতার যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ছিল, তা আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে প্রতিপক্ষ না ভেবে শত্রু ভাবাপন্ন মনে করছে এবং সমাজ বিভক্ত হচ্ছে। এই চরম বিভাজনের ফলে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে অচলাবস্থা তৈরি হচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে।
১২। দুর্নীতির বিস্তার: রাজনীতি ও প্রশাসনে লাগামহীন দুর্নীতি বর্তমান সময়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধেছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকা জনকল্যাণে ব্যয় না হয়ে আমলা ও রাজনীতিবিদদের পকেটে চলে যাচ্ছে। নীতিহীন এই অর্থলিপ্সা রাষ্ট্রীয় সেবামূলক খাতগুলোকে পঙ্গু করে দিচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে। দুর্নীতির এই সর্বগ্রাসী রূপ দেখে নাগরিকরা গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে তীব্রভাবে সন্দিহান হয়ে পড়েছেন।
১৩। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: গণমাধ্যমকে বলা হয় গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ, যা সরকারের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কর্পোরেট ও রাষ্ট্রীয় চাপে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অনেক সংবাদমাধ্যম এখন নিরপেক্ষ খবর প্রকাশের চেয়ে সরকারের তোষামোদি বা সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার এই অভাব নাগরিকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে খর্ব করে গণতন্ত্রকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে।
১৪। উগ্র জাতীয়তাবাদ: সংকীর্ণ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান বিশ্বব্যবস্থায় গণতন্ত্রের উদারপন্থী চেতনাকে গ্রাস করে ফেলছে। নিজেদের জাতি বা গোষ্ঠীকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে সংখ্যালঘুদের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। উগ্র জাতীয়তাবাদী স্লোগান দিয়ে বহুত্ববাদী সমাজকে ভেঙে এককেন্দ্রিক সমাজ তৈরির চেষ্টা চলছে। এই উগ্রতা বহিরাগত ও ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের প্রতি ঘৃণা ছড়াচ্ছে, যা উদার গণতান্ত্রিক দর্শনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
১৫। নাগরিক উদাসীনতা: বর্তমান যুগের তরুণ ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের চরম উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে। তারা মনে করছেন ভোট দিয়ে বা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে সমাজ ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। এই রাজনৈতিক বিমুখতা বা উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিরা রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ করছে। সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণের এই অভাব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে ফাঁপা ও দুর্বল করে দিচ্ছে।
১৬। কর্পোরেট আধিপত্য: আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় বহুজাতিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক সময় জনগণের মঙ্গলের চেয়ে এই সব বড় বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মুনাফার স্বার্থে রাষ্ট্রীয় আইন ও নীতি প্রণয়ন করা হয়। নির্বাচনগুলোতে দলগুলো বিপুল পরিমাণ কর্পোরেট ফান্ড গ্রহণ করায় তারা পুঁজিপতিদের দাসে পরিণত হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ভোটের মূল্য কমে যাচ্ছে এবং গণতন্ত্র কর্পোরেটতন্ত্রে রূপ নিচ্ছে।
১৭। পরিবেশগত বিপর্যয়: জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত সংকট বর্তমান বিশ্বের সরকারগুলোর শাসনক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতা নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। সম্পদ ও খাদ্যের অভাবের কারণে অনেক অঞ্চলে সামাজিক অস্থিরতা এবং বাস্তুচ্যুতির মতো ঘটনা ঘটছে। এই তীব্র সংকটগুলো মোকাবেলা করতে গিয়ে অনেক সময় জরুরি অবস্থা জারি ও কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হচ্ছে। পরিবেশগত এই বিপর্যয় পরোক্ষভাবে নাগরিক অধিকার সংকুচিত করে গণতান্ত্রিক পরিবেশকে বিঘ্নিত করছে।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, সাম্প্রতিক বিশ্বব্যবস্থায় গণতন্ত্র নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। তবে এই সমস্ত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও মানুষের স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার জন্য গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, নাগরিক সচেতনতা এবং সৎ ও জবাবদিহিতামূলক নেতৃত্বই পারে এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে। বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের এই ক্রান্তিলগ্ন উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং শুদ্ধ গণতান্ত্রিক চর্চার পুনরুজ্জীবন আজ সময়ের দাবি।