- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: গণতন্ত্র কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়, এটি মানুষের অধিকার ও সাম্যের প্রতীক। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার লোভ এবং বৈষম্য দেখে মনে প্রশ্ন জাগে—’গণতন্ত্র কি অলীক’ বা একটি অলীক কল্পনা মাত্র? এই চিরন্তন ও জটিল প্রশ্নটির অন্তর্নিহিত সত্য এবং বাস্তবতা উন্মোচন করাই এই নিবন্ধের মূল লক্ষ্য।
১। ধারণাগত আদর্শ: গণতন্ত্রের মূল কথাই হলো জনগণের শাসন যেখানে সবার সমান অধিকার থাকবে। কিন্তু বাস্তবে এই আদর্শিক রূপটি কেবল কেতাবেই রয়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে অলীক মনে হয়। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে সবসময়ই সাধারণ মানুষের চেয়ে প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণ বেশি দেখা যায়। ফলে আদর্শ ও বাস্তবতার এই বিশাল দূরত্ব গণতন্ত্রকে একটি সুন্দর স্বপ্নের মতো রূপ দেয়।
২। ভোটের রাজনীতি: নির্বাচন এলেই জনগণের কদর বাড়ে এবং নানা ধরনের প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে যায়। তবে ভোট শেষ হওয়ার পরপরই সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ আর দেখা যায় না। রাজনীতিবিদদের এই ক্ষণস্থায়ী মনোযোগের কারণে সাধারণ ভোটাররা নিজেদেরকে প্রতারিত মনে করেন। এই প্রক্রিয়ার কারণে অনেকেই মনে করেন যে প্রকৃত গণতন্ত্র আসলে একটি অলীক মরীচিকা মাত্র।
৩। অর্থের প্রভাব: বর্তমান যুগের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন এবং রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে অর্থের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ধনী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই মূলত দলীয় মনোনয়ন পান এবং রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন। সাধারণ বা যোগ্য মানুষের পক্ষে অর্থ ছাড়া নির্বাচনে জয়ী হওয়া এখন প্রায় অসম্ভব। ফলে গণতন্ত্র সাধারণের শাসন না হয়ে ধনীদের শাসনে পরিণত হচ্ছে।
৪। ক্ষমতার অপব্যবহার: জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে অনেকেই পরবর্তীতে স্বৈরাচারী আচরণ শুরু করেন। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতি তখন শাসনব্যবস্থার প্রধান অংশ হয়ে দাঁড়ায়। আইনের শাসন তখন কেবল সাধারণ মানুষের জন্য প্রযোজ্য হয়, ক্ষমতাশালীদের জন্য নয়। এই ধরনের বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি দেখে সাধারণ মানুষের মনে গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন জাগে।
৫। বাকস্বাধীনতার অভাব: গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো মানুষের মুক্তভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই ভিন্নমতের মানুষকে দমন করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করার এই চেষ্টা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে। যখন মানুষ কথা বলতে ভয় পায়, তখন গণতন্ত্র অলীক মনে হওয়াই স্বাভাবিক।
৬। অধিকারের বৈষম্য: কাগজে-কলমে সব নাগরিক সমান হলেও বাস্তবে ধনী-দরিদ্রের অধিকারের আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। শিক্ষা, চিকিৎসা এবং আইনি সহায়তার ক্ষেত্রে গরিব মানুষ সবসময়ই অবহেলিত থাকে। অন্যদিকে প্রভাবশালীরা খুব সহজেই সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকে। এই মৌলিক বৈষম্যই প্রমাণ করে যে সাম্যের গণতন্ত্র এখনো একটি অলীক ধারণা।
৭। দুর্নীতির বিস্তার: গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর অন্যতম বড় ব্যর্থতা হলো সমাজের সর্বস্তরে দুর্নীতির বিস্তার রোধ করতে না পারা। সরকারি সেবা থেকে শুরু করে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প, সবখানেই দুর্নীতি জেঁকে বসেছে। সাধারণ মানুষের করের টাকার সঠিক ব্যবহার না হয়ে তা গুটিকয়েক মানুষের পকেটে যায়। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্যকেই পুরোপুরি ব্যর্থ করে দেয়।
৮। রাজনৈতিক সহিংসতা: নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এবং দলীয় কোন্দলের কারণে রাজনৈতিক সহিংসতা এখন নিত্যদিনের ব্যাপার। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষের জীবন এবং সম্পদ বিপন্ন হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতার পরিবর্তনের যে শান্তিপূর্ণ পথ থাকার কথা, তা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। এই সহিংস পরিবেশ মানুষের মনে গণতন্ত্রের প্রতি চরম অনীহা তৈরি করে।
৯। আইনের প্রয়োগ: আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতিটি গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, আইন দুর্বলকে শাসন করে আর শক্তিশালীকে রক্ষা করে। অপরাধী যদি প্রভাবশালী হয়, তবে সে অনায়াসে পার পেয়ে যায়। আইনের এই দ্বিমুখী নীতি সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার আশাকে অলীক কল্পনায় পরিণত করে।
১০। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পাশাপাশি আমলাতন্ত্র রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করে। তবে অনেক সময় আমলাদের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য জনগণের ভোগান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। জনগণের সেবক না হয়ে তারা নিজেদেরকে শাসকের আসনে বসিয়ে রাখেন। এই জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক শাসনকে সাধারণ মানুষের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
১১। জনগণের উদাসীনতা: বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং রাজনৈতিক নোংরামির কারণে সাধারণ মানুষ রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। অনেক সময় নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কম হতে দেখা যায়। মানুষ যখন শাসন প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়াকে নিরর্থক মনে করে, তখন গণতন্ত্র তার কার্যকারিতা হারায়। এই উদাসীনতা গণতন্ত্রকে একটি অর্থহীন ও অলীক ব্যবস্থায় রূপ দেয়।
১২। দলাদলির রাজনীতি: জাতীয় স্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থকে বড় করে দেখাই বর্তমান রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। বিরোধী পক্ষকে দমন করা এবং নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখাই দলগুলোর মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। দেশের সার্বিক উন্নয়ন এবং জনগণের কল্যাণ এই দলাদলির ভিড়ে হারিয়ে যায়। এই নোংরা কাদা ছোঁড়াছুড়ির রাজনীতি গণতন্ত্রের সৌন্দর্যকে পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়।
১৩। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি: নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারে নানা আকর্ষণীয় ও অসম্ভব প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণের আর কোনো বাস্তব উদ্যোগ দেখা যায় না। জনগণকে বোকা বানিয়ে ভোট নেওয়ার এই কৌশল এখন একটি নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়েছে। এই প্রতারণার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে গণতন্ত্রের অর্থ অলীক ঠেকে।
১৪। বিচারহীনতার সংস্কৃতি: সমাজে যখন বড় বড় অপরাধের সঠিক বিচার হয় না, তখন অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার কারণে সমাজে এক ধরণের বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়। সাধারণ মানুষ তখন নিজেদেরকে সম্পূর্ণ অসহায় এবং অরক্ষিত মনে করতে শুরু করে। এই নিরাপত্তাহীনতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা চিরতরে কমিয়ে দেয়।
১৫। শিক্ষার অভাব: একটি সফল গণতন্ত্রের জন্য সচেতন এবং শিক্ষিত নাগরিক সমাজ অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু অনেক সমাজেই শিক্ষার সঠিক আলো না থাকায় মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়। অসাধু রাজনীতিবিদরা মানুষের এই অজ্ঞতাকে পুঁজি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে। সচেতনতার এই অভাবই গণতন্ত্রকে একটি অলীক বা অবাস্তব ধারণায় পরিণত করে।
১৬। পুঁজিবাদের নিয়ন্ত্রণ: বর্তমান বিশ্বে রাজনীতি ও অর্থনীতি একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এবং পুঁজিপতিরা সরকারের নীতি নির্ধারণে পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে। সাধারণ মানুষের কল্যাণের চেয়ে এই সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষা করা সরকারের অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায়। পুঁজিবাদী এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে গণতন্ত্রের আসল রূপটি ঢাকা পড়ে যায়।
১৭। উন্নয়নের অসমতা: গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর আমলে উন্নয়ন হলেও তা দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছায় না। রাজধানী বা প্রধান শহরগুলোর উন্নয়ন হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকে। এই আঞ্চলিক ও সামাজিক বৈষম্য দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। উন্নয়নের এই অসম বণ্টন প্রমাণ করে যে সবার জন্য গণতন্ত্র এখনো অলীক।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বাস্তবতার নিরিখে গণতন্ত্রকে অনেক সময় অলীক বা অধরা মনে হতেই পারে। তবে সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও মানুষের স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প আজও তৈরি হয়নি। গণতন্ত্রকে অলীক মরীচিকা থেকে মুক্ত করতে প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা, সৎ নেতৃত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক সততা। সবার সম্মিলিত প্রয়াসেই কেবল গণতন্ত্র তার প্রকৃত ও কার্যকর রূপ ফিরে পেতে পারে।