- readaim.com
- 0
উত্তর::উপস্থাপনা: আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সরকারি প্রশাসনের পাশাপাশি বেসরকারি প্রশাসনের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে পরিচালিত বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান, সংগঠন বা সংস্থার ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিকেই সাধারণভাবে বেসরকারি প্রশাসন বলা হয়। এটি সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, যেমন—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, এবং জনকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। সহজ ভাষায়, এটি এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে অলাভজনক বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত সংস্থাগুলো তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য কার্যক্রম পরিচালনা করে।
শাব্দিক অর্থ: ‘বেসরকারি’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো যা সরকারের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণাধীন নয়, অর্থাৎ যা ব্যক্তিগত বা স্বাধীন উদ্যোগে পরিচালিত হয়। আর ‘প্রশাসন’ শব্দের অর্থ হলো সুশৃঙ্খলভাবে কোনো কাজ পরিচালনা করা বা ব্যবস্থাপনা। সুতরাং, বেসরকারি প্রশাসন বলতে বোঝায় ব্যক্তি মালিকানাধীন বা অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা।
বেসরকারি প্রশাসন হলো একটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থা যা সরকারি প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে পরিচালিত হয়। এটি মূলত মুনাফা-ভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, অলাভজনক সংস্থা, বা বিভিন্ন এনজিও-কে অন্তর্ভুক্ত করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করা, যা হতে পারে মুনাফা অর্জন, জনসেবা প্রদান, বা সামাজিক উন্নয়ন।
আপনার দেওয়া তালিকা থেকে কয়েকজন গবেষকের নাম এখানে উল্লেখ করা হলো:
১। এল.ডি. হোয়াইট (L.D. White): তিনি প্রশাসনকে এমন একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন যা কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য পরিচালিত হয়, তবে এর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রশাসনকেই অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
২। অধ্যাপক ফিফনার ও প্রেসথাস (P. Fiffner and Presthus): তাঁদের মতে, প্রশাসন হলো একটি মানবীয় ও সামাজিক প্রক্রিয়া, যা কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তিকে একত্রিত করে। এই সংজ্ঞাটি সরকারি এবং বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
৩। সাইমন, স্মিথবার্গ ও থাম্পসন (Simon, Smithburg and Thompson): তাঁদের মতে, প্রশাসন হলো সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং উদ্দেশ্য পূরণের একটি কৌশল। এটি একটি ব্যাপক প্রক্রিয়া, যা সরকারি এবং বেসরকারি উভয় প্রশাসনকেই বোঝায়।
সবাই সরাসরি ‘বেসরকারি প্রশাসন’-এর সংজ্ঞা দেননি, বরং অনেকে সাধারণ প্রশাসনের সংজ্ঞা দিয়েছেন। এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো:
৪। এল. ডি. হোয়াইট (L.D. White): “Administration is a process common to all group efforts, public or private, civil or military, large or small, to achieve a common purpose.” (প্রশাসন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যা একটি সাধারণ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সরকারি বা বেসরকারি, বেসামরিক বা সামরিক, ছোট বা বড়, সমস্ত গোষ্ঠীগত প্রচেষ্টার মধ্যে সাধারণ।)
৫। উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson): “Administration is the detailed and systematic execution of public law.” (প্রশাসন হলো জনআইনের বিস্তারিত এবং সুশৃঙ্খল প্রয়োগ।) যদিও এটি সরকারি প্রশাসনের সংজ্ঞা, এর মূলনীতিগুলি বেসরকারি ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
৬। ডিমক ও ডিমক (Dimock and Dimock): “Administration is the direction, coordination, and control of human and material resources to achieve a specific objective.” (প্রশাসন হলো একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য মানব ও বস্তুগত সম্পদের পরিচালনা, সমন্বয় এবং নিয়ন্ত্রণ।)
৭। লুথার গুলিক (Luther Gulick): লুথার গুলিক যদিও সরাসরি সংজ্ঞা দেননি, তবে তিনি প্রশাসনের মূলনীতিগুলো (POSDCORB) তুলে ধরেছেন, যা সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রশাসনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
৮। ডোয়াইট ওয়াল্ডো (Dwight Waldo): “Administration is the art and science of management as applied to an organization.” (প্রশাসন হলো একটি সংগঠনে প্রয়োগকৃত ব্যবস্থাপনার শিল্প এবং বিজ্ঞান।)
৯। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary): “The process or activity of running a business, organization, etc.” (একটি ব্যবসা, সংস্থা ইত্যাদি পরিচালনার প্রক্রিয়া বা কার্যক্রম।)
১০। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber): তিনি তাঁর আমলাতন্ত্রের (Bureaucracy) মডেলের মাধ্যমে প্রশাসনের একটি সাংগঠনিক কাঠামো তুলে ধরেছেন, যা সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানের জন্যই প্রাসঙ্গিক।
উপরের আলোচনা থেকে আমরা বলতে পারি, বেসরকারি প্রশাসন হলো সেই ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া যা ব্যক্তিগত বা অলাভজনক সংস্থাগুলো তাদের লক্ষ্য পূরণের জন্য মানব সম্পদ, অর্থ, এবং অন্যান্য উপাদানের সুষ্ঠু সমন্বয় ও ব্যবহারের মাধ্যমে পরিচালনা করে। এটি মূলত মুনাফা অর্জন, সামাজিক কল্যাণ, বা জনসেবার মতো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে নিবেদিত।
উপসংহার: বেসরকারি প্রশাসন আধুনিক সমাজের এক অপরিহার্য অংশ। এটি সরকারি প্রশাসনের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে এবং সমাজের বিভিন্ন চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ব্যবস্থাটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ, উদ্ভাবন এবং দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, এটি আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে এক শক্তিশালী চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
বেসরকারি প্রশাসন হলো ব্যক্তি মালিকানাধীন বা অলাভজনক সংস্থাগুলোর উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য পরিচালিত ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক প্রক্রিয়া।
বিশ্ব ব্যাংক (World Bank) এর একটি জরিপ অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে অলাভজনক সংস্থার সংখ্যা প্রায় ৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বেসরকারি প্রশাসনের প্রসারের ইঙ্গিত দেয়। ২০১৯ সালের একটি গবেষণা অনুসারে, বাংলাদেশের জিডিপিতে (GDP) বেসরকারি খাতের অবদান প্রায় ৭০%। এসব তথ্য প্রমাণ করে যে, বেসরকারি প্রশাসন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে একটি বিশাল ভূমিকা রাখে।

