- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র। এই গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটি হলো ভারতের রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতিকে দেশের প্রথম নাগরিক হিসেবেও সম্মান করা হয়। যদিও প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতেই প্রকৃত ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে, তবুও রাষ্ট্রপতি দেশের প্রধান এবং সাংবিধানিক কাঠামো রক্ষা করেন। এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচন প্রক্রিয়া অত্যন্ত অনন্য ও পরোক্ষ প্রকৃতির। এই প্রবন্ধে আমরা ভারতীয় রাষ্ট্রপতির নির্বাচন পদ্ধতিকে সহজ, সরল ও আকর্ষণীয় ভাষায় আলোচনা করব, যাতে সাধারণ মানুষও এই প্রক্রিয়াটি বুঝতে পারে।
১।নির্বাচক মণ্ডলী: রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রত্যক্ষভাবে সাধারণ মানুষের ভোটে হয় না, বরং একটি বিশেষ ‘নির্বাচক মণ্ডলী’ দ্বারা সম্পন্ন হয়। এই মণ্ডলীর সদস্যরা হলেন লোকসভা ও রাজ্যসভার নির্বাচিত সাংসদ এবং রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের (যেমন দিল্লি ও পুদুচেরি) বিধানসভার নির্বাচিত বিধায়করা। তবে, রাজ্য বিধান পরিষদের সদস্য বা মনোনীত সাংসদ/বিধায়করা এই নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না, যা এই পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রীয় অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়।
২।সমান মূল্য নয়: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিটি ভোটারের ভোটের মূল্য সমান নয়। সাংসদদের ভোটের মূল্য সব রাজ্যে এক হলেও, বিধায়কদের ভোটের মূল্য নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের জনসংখ্যা এবং সেই রাজ্যের বিধানসভার আসন সংখ্যার ওপর। এই কারণে উত্তর প্রদেশ বা মহারাষ্ট্রের মতো বড় রাজ্যের বিধায়কের ভোটের মূল্য সিকিম বা গোয়ার মতো ছোট রাজ্যের বিধায়কের ভোটের মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে থাকে। এই পদ্ধতিটি দেশের বিভিন্ন রাজ্যের জনসমষ্টির প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করে।
৩।আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব: ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ পদ্ধতির ভিত্তিতে হয়, যদিও শব্দটি জটিল মনে হতে পারে, এর মূল ধারণাটি বেশ সরল। এখানে একাধিক প্রার্থী থাকলেও, ভোটাররা কেবল একজনকেই ভোট দেন না; বরং তাদের পছন্দের ক্রমানুসারে (১, ২, ৩, ইত্যাদি) প্রার্থীদের তালিকা তৈরি করেন। এটি মূলত একক হস্তান্তরযোগ্য ভোট পদ্ধতি (Single Transferable Vote) নামে পরিচিত। এই পদ্ধতিটি নিশ্চিত করে যে বিজয়ী প্রার্থী যেন কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সমর্থনই নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধির সমর্থন লাভ করে।
৪।ভোটের মূল্য নির্ধারণ: বিধায়কদের ভোটের মূল্য একটি নির্দিষ্ট সূত্র অনুসারে নির্ধারিত হয়। সূত্রটি হলো: $\text{ভোটের মূল্য} = \frac{\text{রাজ্যের মোট জনসংখ্যা}}{\text{রাজ্যের মোট নির্বাচিত বিধায়কের সংখ্যা}} \div 1000$। এই সূত্রটি ব্যবহার করা হয় যাতে জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিটি রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব সমানভাবে সুরক্ষিত হয়। বর্তমানে, ১৯৭৭ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে এই জনসংখ্যা গণনা করা হয়। এই জটিল হিসাবের মাধ্যমেই প্রতিটি বিধায়কের ভোটের সঠিক সাংখ্যিক মূল্য বের করা হয়।
৫।সাংসদদের ভোটের মূল্য: সাংসদদের ভোটের মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতিটিও বিধায়কদের থেকে কিছুটা ভিন্ন। সাংসদদের ভোটের মূল্য বের করার জন্য সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নির্বাচিত বিধায়কদের মোট ভোটের মূল্যকে লোকসভা ও রাজ্যসভার নির্বাচিত সাংসদদের মোট সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা হয়। এর ফলে ভারতের প্রত্যেক নির্বাচিত সাংসদের ভোটের মূল্য সমান হয় এবং সেই মূল্যকে এক একটি ভোট হিসেবে গণ্য করা হয়। এই প্রক্রিয়া কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে একটি সাংবিধানিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।
৬।গোপন ব্যালট: রাষ্ট্রপতি নির্বাচন গোপন ব্যালটের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ, ভোটার (সাংসদ ও বিধায়ক) কে কাকে ভোট দিলেন, তা প্রকাশ করা হয় না। যদিও এটি একটি গোপন প্রক্রিয়া, প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের সদস্যদের নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য নির্দেশ বা ‘হুইপ’ জারি করতে পারে না, যেমনটা অন্যান্য সংসদীয় ভোটে করা হয়। ভোটাররা তাদের নিজস্ব পছন্দ ও বিবেচনার ভিত্তিতে ভোট প্রদান করতে স্বাধীন থাকেন। তবে, তাদের ব্যালটে কেবল ক্রমানুসারে পছন্দ উল্লেখ করতে হয়।
৭।জয়ের জন্য ন্যূনতম কোটা: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য একজন প্রার্থীকে মোট বৈধ ভোটের একটি নির্দিষ্ট ‘কোটা’ বা সংখ্যা অর্জন করতে হয়। অর্থাৎ, বিজয়ী প্রার্থীকে অবশ্যই ৫১% এর বেশি ভোট পেতে হবে। এই পদ্ধতিটি নিশ্চিত করে যে রাষ্ট্রপতি সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন নিয়েই নির্বাচিত হন।
৮।গণনার পদ্ধতি: প্রথম ধাপে, প্রতিটি প্রার্থীর প্রথম পছন্দের (১ নম্বর) ভোটগুলি গণনা করা হয়। যদি কোনো প্রার্থী এই প্রথম গণনায় প্রয়োজনীয় কোটা অর্জন করতে ব্যর্থ হন, তবে নির্বাচন প্রক্রিয়া দ্বিতীয় ধাপে যায়। সবচেয়ে কম ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থীকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং তার ব্যালটগুলিতে থাকা দ্বিতীয় পছন্দের ভোটগুলি অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে যতক্ষণ না কোনো একজন প্রার্থী প্রয়োজনীয় কোটা অর্জন করেন। এই পদ্ধতিটি ভোটের অপচয় কমিয়ে দেয়।
৯।বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষমতা: ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংক্রান্ত যেকোনো ধরনের বিতর্ক বা বিরোধ নিষ্পত্তির চূড়ান্ত ক্ষমতা শুধুমাত্র সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত থাকে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া চলাকালীন বা ফলাফল ঘোষণার পর কোনো প্রার্থী যদি কোনো অনিয়ম বা বিতর্ক উত্থাপন করেন, তবে তার নিষ্পত্তি কেবল সর্বোচ্চ আইনি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই হতে পারে। আদালতের সিদ্ধান্তই এই ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়। এই সাংবিধানিক ব্যবস্থা নির্বাচন প্রক্রিয়ার পবিত্রতা এবং আইনি বৈধতা নিশ্চিত করে।
উপসংহার: ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি নিঃসন্দেহে বিশ্বের অন্যতম জটিল এবং সুচিন্তিত একটি প্রক্রিয়া। এটি কেবল একজন ব্যক্তিকে নির্বাচন করে না, বরং দেশের সাংবিধানিক মূল্যবোধ, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের নীতির প্রতিচ্ছবি বহন করে। এই পদ্ধতি নিশ্চিত করে যে রাষ্ট্রপতি, যিনি দেশের সাংবিধানিক প্রধান, তিনি যেন সমগ্র জাতির প্রতিনিধি হিসেবে যথাযথ আইনি ও রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে এই আসনে আসীন হতে পারেন।
🔸 নির্বাচক মণ্ডলী 🔸 সমান মূল্য নয় 🔸 আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব 🔸 ভোটের মূল্য নির্ধারণ 🔸 সাংসদদের ভোটের মূল্য 🔸 গোপন ব্যালট 🔸 জয়ের জন্য ন্যূনতম কোটা 🔸 গণনার পদ্ধতি 🔸 বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষমতা।
ঐতিহাসিকভাবে, ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি ১৯৫০ সালের সংবিধানের ধারা ৫৪ ও ৫৫ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৪ সালের সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় স্পষ্ট করে যে নির্বাচনী মণ্ডলী অসম্পূর্ণ থাকলেও নির্বাচন বৈধ হবে। ১৯৭৬ সালের ৪২তম সংবিধান সংশোধনীতে স্থির করা হয় যে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বিধায়কদের ভোটের মূল্য গণনার জন্য ১৯৭১ সালের আদমশুমারি ব্যবহার করা হবে, যা পরে ২০০২ সালের ৮৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, যাতে জনসংখ্যার ভিত্তিতে রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে আপাতত কোনো পরিবর্তন না আসে।

