- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ভারতীয় সংবিধান হল পৃথিবীর বৃহত্তম লিখিত সংবিধান এবং এটি ভারতের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি। বহু বছর ধরে চিন্তা-ভাবনা, আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে তৈরি হওয়া এই সংবিধান দেশের শাসন কাঠামো, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও কর্তব্য এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলিকে সুনিশ্চিত করে। এই সংবিধানের অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলিই ভারতকে বিশ্বের দরবারে এক গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
লিখিত এবং সুদীর্ঘ: বিশ্বের সমস্ত স্বাধীন দেশের সংবিধানের মধ্যে ভারতের সংবিধানটি হল সবচেয়ে দীর্ঘ এবং বিস্তারিত লিখিত দলিল। এর কারণ হল, সংবিধানে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার উভয়ের শাসন কাঠামো বিশদে বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়াও, মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি, তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা এবং জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত বিধানগুলির বিস্তারিত উল্লেখ থাকায় এর কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে। সংবিধানের এই ব্যাপকতা ও সুস্পষ্টতাই এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। (১)
নমনীয় ও অনমনীয়তার মিশ্রণ: ভারতীয় সংবিধান নমনীয়তা (Flexible) এবং অনমনীয়তা (Rigid)-এর এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে এই বৈশিষ্ট্যটি ফুটে ওঠে। কিছু অংশ সাধারণ আইন প্রণয়নের মতোই সহজে সংশোধন করা যায়, যা এর নমনীয়তা দেখায়। আবার, কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংশোধনের জন্য সংসদে বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং মোট রাজ্যের অর্ধেকেরও বেশি রাজ্যের আইনসভার অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, যা এর অনমনীয় প্রকৃতিকে তুলে ধরে। এই ভারসাম্য বজায় রেখে সংবিধান সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তনের প্রয়োজন মেটাতে পারে। (২)
সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র: সংবিধানের প্রস্তাবনাতেই ভারত একটি সার্বভৌম (Sovereign), সমাজতান্ত্রিক (Socialist), ধর্মনিরপেক্ষ (Secular), গণতান্ত্রিক (Democratic) সাধারণতন্ত্র (Republic) হিসাবে ঘোষিত হয়েছে। ‘সার্বভৌম’ বলতে বোঝায় ভারত অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সব বিষয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন। ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দটি সকলের জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতা স্থাপনের লক্ষ্যকে বোঝায়। ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ হল রাষ্ট্রের কোনো বিশেষ ধর্ম না থাকা এবং সব ধর্মকে সমান সম্মান দেওয়া। ‘গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র’ মানে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালনা এবং রাষ্ট্রের প্রধানের নির্বাচন। এই মূলনীতিগুলি ভারতীয় রাষ্ট্রের চরিত্রকে সংজ্ঞায়িত করে। (৩)
একক নাগরিকত্ব: ভারতে একক নাগরিকত্বের (Single Citizenship) ধারণা চালু আছে। এর মানে হল, কোনো ব্যক্তি ভারতের যে রাজ্যেই বাস করুক না কেন, সে কেবল ভারতেরই নাগরিক। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দ্বৈত নাগরিকত্বের (কেন্দ্রীয় ও রাজ্য) বিপরীত। একক নাগরিকত্বের এই নীতিটি দেশের ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং সমগ্র দেশে নাগরিকদের সমান অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে। এটি আঞ্চলিক ভেদাভেদ দূর করে জাতীয় সংহতির অনুভূতিকে শক্তিশালী করে। (৪)
মৌলিক অধিকার: সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে নাগরিকদের জন্য ছয়টি মৌলিক অধিকারের (Fundamental Rights) নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এই অধিকারগুলি জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল ভারতীয় নাগরিকের ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশের জন্য অপরিহার্য। এই অধিকারগুলি আদালতে বলবৎযোগ্য, অর্থাৎ কেউ এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে। এই অধিকারগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সাম্যের অধিকার, স্বাধীনতার অধিকার, শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার এবং সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার। এই অধিকারগুলি নাগরিকদের স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষা করে। (৫)
রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি: সংবিধানের চতুর্থ অধ্যায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিসমূহ বা ডিপিএসপি (Directive Principles of State Policy) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই নীতিগুলি আইনগতভাবে বলবৎযোগ্য না হলেও, এগুলি রাষ্ট্রকে আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনুসরণ করতে উৎসাহিত করে। এগুলির মূল লক্ষ্য হল ভারতে একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র (Welfare State) প্রতিষ্ঠা করা। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করাই এই নীতিগুলির উদ্দেশ্য। সরকার এই নীতিগুলি মেনে চললে জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। (৬)
মৌলিক কর্তব্য: ১৯৫০ সালের মূল সংবিধানে মৌলিক কর্তব্যগুলি ছিল না। পরবর্তীকালে, ১৯৭৬ সালের ৪২তম সংবিধান সংশোধনীতে নাগরিকদের জন্য দশটি মৌলিক কর্তব্য যুক্ত করা হয় (বর্তমানে ১১টি)। এই কর্তব্যগুলি নাগরিকদের মনে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধের অনুভূতি জাগায় এবং দেশের স্বাধীনতা, সংহতি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করার মতো দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। যদিও এই কর্তব্যগুলি আইনিভাবে বলবৎযোগ্য নয়, তবুও এটি নাগরিকদের দায়িত্বশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। (৭)
সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার: ভারতীয় সংবিধান সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের (Universal Adult Franchise) নীতি গ্রহণ করেছে। এর অর্থ হল, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, শিক্ষা বা সম্পত্তির পার্থক্য নির্বিশেষে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী সকল ভারতীয় নাগরিক ভোট দেওয়ার অধিকার পায়। এই নীতিটি দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তি মজবুত করে এবং জনগণকে সরাসরি সরকার গঠনে অংশ নিতে সুযোগ দেয়। এটি গণতন্ত্রের মূল মন্ত্র “এক ব্যক্তি, এক ভোট”-এর ধারণাকে বাস্তবায়িত করে। (৮)
যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এককেন্দ্রিকতার ঝোঁক: ভারতের সংবিধান মূলত যুক্তরাষ্ট্রীয় (Federal) হলেও, এর মধ্যে এককেন্দ্রিকতার (Unitary) কিছু উপাদান বিদ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে ক্ষমতার বিভাজন (কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে), লিখিত সংবিধান এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা। কিন্তু এককেন্দ্রিকতার ঝোঁক দেখা যায় জরুরি অবস্থার বিধান, একক নাগরিকত্ব, শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্যপালের নিয়োগের ক্ষেত্রে। এই মিশ্র ব্যবস্থাটি দেশের ঐক্য ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। (৯)
সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা: ভারত ওয়েস্টমিনস্টার মডেলের উপর ভিত্তি করে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা বা মন্ত্রিসভা-শাসিত সরকার (Parliamentary System) গ্রহণ করেছে। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের নামসর্বস্ব প্রধান (রাষ্ট্রপতি) এবং প্রকৃত শাসক প্রধান (প্রধানমন্ত্রী) থাকেন। মন্ত্রীসভা তাদের কাজের জন্য সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভার কাছে যৌথভাবে দায়বদ্ধ থাকে। এই শাসন ব্যবস্থা আইন প্রণয়ন ও নির্বাহী ক্ষমতার মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয় নিশ্চিত করে। (১০)
স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা: ভারতের সংবিধানে একটি সুসংগঠিত, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থার (Independent Judiciary) ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিচারব্যবস্থা সংবিধানের রক্ষক হিসেবে কাজ করে এবং মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করে। সুপ্রিম কোর্ট হল দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় এবং এর সিদ্ধান্ত সারা দেশে প্রযোজ্য। বিচারকদের নিয়োগ ও অপসারণ পদ্ধতি যথেষ্ট সুরক্ষিত হওয়ায় বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে মুক্ত থেকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে। (১১)
সংবিধানের প্রাধান্য: ভারতীয় সংবিধানকে দেশের সর্বোচ্চ আইন হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকার কর্তৃক প্রণীত যেকোনো আইন যদি সংবিধানের পরিপন্থী হয়, তবে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট সেই আইনকে অসাংবিধানিক ও বাতিল ঘোষণা করতে পারে। এই সাংবিধানিক প্রাধান্য (Supremacy of the Constitution) রাষ্ট্রের সকল শাখা ও প্রতিষ্ঠানকে সংবিধানের নির্দেশিকা মেনে চলতে বাধ্য করে। এটি সংবিধানকে রক্ষা করে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে। (১২)
বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা: বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা (Judicial Review) ভারতীয় সংবিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগ কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের নির্বাহী আদেশ ও আইনগুলির সাংবিধানিক বৈধতা পরীক্ষা করতে পারে। যদি কোনো আইন সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বা বিধান লঙ্ঘন করে, তবে বিচার বিভাগ সেটিকে বাতিল করার ক্ষমতা রাখে। এই ক্ষমতা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করে এবং সরকারের ক্ষমতাকে সংবিধানের সীমার মধ্যে রাখে। (১৩)
তিন স্তরের সরকার: মূল সংবিধান শুধুমাত্র কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার নিয়ে গঠিত ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে, ১৯৯২ সালের ৭৩তম ও ৭৪তম সংবিধান সংশোধনীতে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠানগুলি (পঞ্চায়েত ও পৌরসভা) যুক্ত করে তিন স্তরের সরকার (Three-Tier Government) ব্যবস্থা চালু করা হয়। এটি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করে এবং তৃণমূল স্তরে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। এর ফলে স্থানীয় মানুষজন তাদের সমস্যা সমাধানে এবং উন্নয়নের কাজে সরাসরি অংশ নিতে পারে। (১৪)
জরুরি অবস্থার বিধান: ভারতীয় সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে জরুরি অবস্থা (Emergency Provisions) ঘোষণা করার ক্ষমতা প্রদান করে। এটি তিন ধরনের হতে পারে: জাতীয় জরুরি অবস্থা ($352$ ধারা), রাজ্যে সাংবিধানিক অচলাবস্থা বা রাষ্ট্রপতি শাসন ($356$ ধারা), এবং আর্থিক জরুরি অবস্থা ($360$ ধারা)। এই বিধানগুলি দেশের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য, সংহতি ও নিরাপত্তা রক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। জরুরি অবস্থার সময়, দেশের শাসন ব্যবস্থা মূলত এককেন্দ্রিক রূপ নেয়, যা দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। (১৫)
কেন্দ্রীয় প্রবণতা: যদিও ভারতে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো রয়েছে, তবে সংবিধান কেন্দ্রীয় সরকারকে বেশি ক্ষমতা প্রদান করে একটি শক্তিশালী কেন্দ্র (Strong Centre) সৃষ্টি করেছে। রাজ্য তালিকাভুক্ত বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও কেন্দ্র হস্তক্ষেপ করতে পারে। এটি নিশ্চিত করে যে দেশে কোনো অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক সঙ্কটকালে কেন্দ্রীয় সরকার কার্যকরভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হবে। এই কেন্দ্রীয় প্রবণতা দেশের অখণ্ডতা ও স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। (১৬)
ভাষা সংক্রান্ত বিধান: ভারতীয় সংবিধান সরকারি ভাষা (Official Language) সম্পর্কিত বিস্তারিত বিধান অন্তর্ভুক্ত করেছে। বর্তমানে সংবিধানে ২২টি ভাষাকে স্বীকৃত ভাষা (Recognized Languages) হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই বিধানগুলি দেশের ভাষাগত বৈচিত্র্যকে সম্মান জানায় এবং বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও প্রশাসনিক কাজকর্মে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি ভাষাভিত্তিক বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয় সংহতি বজায় রাখতে সহায়ক। (১৭)
উপসংহার: ভারতীয় সংবিধান তার এই অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলির মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক আদর্শ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জনগণের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করেছে। লিখিত ও সুদীর্ঘ প্রকৃতি, নমনীয়তা ও অনমনীয়তার ভারসাম্য, মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এটিকে বিশ্বের এক অন্যতম সফল সংবিধানে পরিণত করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু সংশোধনের মাধ্যমে এটি পরিবর্তনশীলতা বজায় রেখে ভারতের জনগণের জন্য একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি হিসাবে কাজ করে চলেছে।

