- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: মাওবাদী আন্দোলন হলো বিশ্বব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-সশস্ত্র মতাদর্শ ও আন্দোলন, যা চীনের কমিউনিস্ট নেতা মাও সে-তুং (Mao Zedong)-এর চিন্তাধারা দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত। এই আন্দোলন প্রধানত কৃষকদের বিপ্লবে সামিল করে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বিদ্যমান রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রাখে। এটি বিশেষভাবে ভারত, নেপাল এবং ফিলিপাইনের মতো দেশগুলিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে।
‘মাওবাদী’ শব্দটি এসেছে মাও সে-তুং (Mao Zedong) এবং ‘বাদ’ বা ‘তন্ত্র’ (ism) থেকে। এর আক্ষরিক অর্থ হলো মাও সে-তুং-এর মতাদর্শ বা তত্ত্ব।
মাওবাদী আন্দোলন হলো মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি বিশেষ বিপ্লবী মতবাদ, যা চীনের নেতা মাও সে-তুং কর্তৃক বিকশিত হয়। এর মূল ভিত্তি হলো দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ (Protracted People’s War)-এর ধারণা, যেখানে দুর্বল কমিউনিস্ট বাহিনী গ্রামীণ এলাকায় ঘাঁটি তৈরি করে, কৃষকদের সংগঠিত করে এবং ধীরে ধীরে শহরকে ঘিরে ফেলে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। এই মতাদর্শ পুঁজিবাদ, সামন্তবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদকে প্রত্যাখ্যান করে এবং শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার ডাক দেয়।
১.ডেভিড হার্ভে (David Harvey), ভূগোলবিদ ও সামাজিক তাত্ত্বিক: “মাওবাদ হলো কৃষকদের কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শহুরে বুর্জোয়াদের বিরোধিতা করা এবং দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের একটি কৌশল, যা মূলত চীনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি।” (Maoism is a strategy of urban bourgeois opposition centered on peasants and the seizure of power through protracted people’s war, primarily based on the Chinese experience.)
২.স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন (Samuel P. Huntington), রাষ্ট্রবিজ্ঞানী: “মাওবাদী কৌশল হলো অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে কাজে লাগানো এবং গ্রামীণ সমর্থনকে ব্যবহার করে ক্ষমতা লাভের একটি পদ্ধতি, যা প্রথাগত মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের থেকে ভিন্নভাবে কৃষককে বিপ্লবী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে।” (The Maoist strategy is a method of exploiting internal conflict and utilizing rural support to gain power, distinguishing itself from conventional Marxism-Leninism by identifying the peasantry as the revolutionary force.)
৩.রঞ্জিত গুহ (Ranajit Guha), ইতিহাসবিদ (সাব-অল্টার্ন স্টাডিজের প্রবক্তা): “ঔপনিবেশিক এবং নব্য-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলিতে কৃষক বিদ্রোহের তাত্ত্বিকীকরণ এবং তাকে রাজনৈতিক কাঠামো প্রদানের একটি অন্যতম প্রচেষ্টা হলো মাওবাদ।” (Maoism is a significant attempt to theorize and provide a political framework for peasant rebellions in colonial and neo-colonial states.)
৪.অমর্ত্য সেন (Amartya Sen), অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক: “মাওবাদ কেবল সশস্ত্র বিপ্লব নয়, এটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজ ও মানুষের চেতনার রূপান্তরের উপরও জোর দেয়, যা অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধেও একটি সংগ্রাম।” (Maoism is not just about armed revolution, it also emphasizes the transformation of society and human consciousness through Cultural Revolution, which is a struggle against economic inequality as well as cultural dominance.)
৫.আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাঙ্ক (Andre Gunder Frank), সমাজবিজ্ঞানী: “মাওবাদ হলো তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য এমন এক বিপ্লবী মডেল, যা বহিরাগত সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ শোষণের বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তির পথ দেখায়।” (Maoism is a revolutionary model for developing countries in the Third World, which shows the path to national liberation against external imperialist influence and internal exploitation.)
৬.নম চমস্কি (Noam Chomsky), ভাষাবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক সমালোচক: “মাওবাদী আন্দোলন প্রায়শই প্রান্তিক ও সুবিধা বঞ্চিত জনগণের ক্ষোভকে পুঁজি করে এবং রাষ্ট্রের অত্যাচারের প্রতিক্রিয়ায় সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্ম দেয়।” (The Maoist movement often capitalizes on the resentment of marginalized and underprivileged populations and gives rise to armed resistance in reaction to state oppression.)
“মাওবাদী আন্দোলন হলো মাও সে-তুং-এর মতাদর্শে অনুপ্রাণিত এক রাজনৈতিক-সশস্ত্র সংগ্রাম, যা মূলত গ্রামীণ কৃষকদের মূল বিপ্লবী শক্তি হিসেবে সংগঠিত করে, দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের মাধ্যমে সংসদীয় রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে এবং পুঁজিবাদের অবসান ঘটিয়ে সর্বহারা শ্রেণীর শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়।”
উপসংহার: উপসংহারে বলা যায়, মাওবাদী আন্দোলন বিশ্ব ইতিহাসের এক জটিল ও বিতর্কিত অধ্যায়। এই আন্দোলন অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে প্রান্তিক মানুষের প্রতিবাদের প্রতীক হলেও, এর সশস্ত্র পথ এবং সহিংসতা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে এর কার্যকলাপ হ্রাস পেলেও, এর মূল কারণগুলি—দারিদ্র্য, ভূমি সংস্কারের অভাব এবং রাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থা—এখনও বর্তমান। তাই, কেবল সামরিক দমন নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এই আন্দোলনের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
মাওবাদী আন্দোলন হলো সশস্ত্র কৃষক বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য মাও সে-তুং-এর তাত্ত্বিক কৌশল ও তার প্রয়োগ।
মাওবাদী আন্দোলন চীনে ১৯৪৯ সালে সফল বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে। তবে, ভারতে নকশালবাড়িতে এই আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ১৯৬৭ সালে। এক সরকারি জরিপ (২০০৬) অনুসারে, সেসময় ভারতের প্রায় ২২০টি জেলার মধ্যে ৪০% জেলা মাওবাদী কার্যকলাপ দ্বারা প্রভাবিত ছিল। নেপালে ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত গৃহযুদ্ধ চলে, যার ফলস্বরূপ ২০০৮ সালে রাজতন্ত্রের অবসান হয় এবং মাওবাদীরা সরকার গঠন করে।

