- readaim.com
- 0
উত্তর::সূচনা:-বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার এক অবিস্মরণীয় নাম। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত এই প্রবাসী সরকার মুক্তিযুদ্ধের এক ক্রান্তিলগ্নে জাতির অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছিল। এই সরকারের সুদক্ষ পরিচালনায় disorganized প্রতিরোধ আন্দোলন একটি সমন্বিত জনযুদ্ধে রূপ নেয়, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের বহু আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা এনে দেয়। তাই, মুজিবনগর সরকারের কার্যাবলি জানা প্রত্যেক বাংলাদেশীর জন্য অপরিহার্য।
১.সরকার গঠন ও সাংবিধানিক বৈধতা প্রদান: ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল গঠিত মুজিবনগর সরকার ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আইনানুগ সরকার। এই সরকার গঠনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে এটি পরিষ্কার করা হয় যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নয়, বরং এটি একটি পরিকল্পিত ও منظم জনপ্রতিরোধ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি (বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি) এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে সরকার গঠিত হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই সরকার ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (পরবর্তীতে মুজিবনগর) শপথ গ্রহণ করে।
২.স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি: মুজিবনগর সরকার ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বা ‘Proclamation of Independence’ জারি করে। এই ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ঘোষিত স্বাধীনতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন ও অনুমোদন দেওয়া হয়। এটি মুক্তিযুদ্ধের আইনগত ভিত্তি রচনা করে এবং কেন বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে, তার যৌক্তিক কারণসমূহ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে। এই ঘোষণাপত্র একটি সংবিধান হিসেবেও কাজ করে, যা সরকার পরিচালনার অন্তর্বর্তীকালীন দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
৩.মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা ও সামরিক কাঠামো বিন্যাস: মুজিবনগর সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা। এই লক্ষ্যে সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ করা হয়। নিয়মিত সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী গঠনের পাশাপাশি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ, আনসার এবং ছাত্র-যুবকদের নিয়ে গণবাহিনী বা মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী গড়ে তোলা হয়। কর্নেল (পরবর্তীতে জেনারেল) এম. এ. জি. ওসমানীকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করে একটি সুশৃঙ্খল সামরিক কাঠামো তৈরি করা হয়, যা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
৪. আন্তর্জাতিক সমর্থন ও স্বীকৃতি আদায়: নবগঠিত এই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি আদায় করা। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক মিশন প্রেরণ করেন। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকার শুরু থেকেই বাংলাদেশকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করে। এছাড়াও, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ন্যায়সঙ্গত দাবি তুলে ধরা হয়, যা ধীরে ধীরে বিশ্বজনমতকে বাংলাদেশের পক্ষে আনতে সক্ষম হয়।
৫.শরণার্থী ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণকার্য পরিচালনা: পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস গণহত্যার শিকার হয়ে প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। মুজিবনগর সরকার ভারত সরকারের সহায়তায় এই বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর জন্য আশ্রয়, খাদ্য, বস্ত্র ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র থেকেও ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করে তা দুর্গত মানুষের মধ্যে বিতরণের সমন্বয় সাধন করা হয়। এটি ছিল একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ, যা মুজিবনগর সরকার দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করেছিল।
৬.প্রচার ও গণমাধ্যমকে সক্রিয় রাখা: মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে দেশে ও বিদেশে জনমত গঠন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখার জন্য মুজিবনগর সরকার প্রচারণার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ এ ক্ষেত্রে কিংবদন্তিতুল্য ভূমিকা পালন করে। এই বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত সংবাদ, দেশাত্মবোধক গান, রণাঙ্গনের খবর এবং বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারিত হতো, যা মুক্তিকামী জনতাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করত। এছাড়াও, বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও প্রকাশনার মাধ্যমেও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও লক্ষ্য প্রচার করা হয়।
৭.মুক্তাঞ্চলে বেসামরিক প্রশাসন চালু: যুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানি বাহিনী যেসব এলাকা থেকে বিতাড়িত হচ্ছিল, সেসব মুক্তাঞ্চলে বেসামরিক প্রশাসন চালু করা মুজিবনগর সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল। স্থানীয়ভাবে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়। এর মাধ্যমে প্রমাণ করা হয় যে, বাংলাদেশ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, প্রশাসনিক দিক থেকেও একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে প্রস্তুত।
৮.অর্থ ও রসদ সংগ্রহ: মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ও যুদ্ধাস্ত্রের প্রয়োজন ছিল। মুজিবনগর সরকার এই প্রয়োজন মেটাতে বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ ও রসদ সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। প্রবাসী বাঙালিদের পাঠানো অর্থ, বিভিন্ন বন্ধুরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সাহায্য এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগৃহীত সম্পদ মুক্তিযুদ্ধের রসদ জুগিয়েছে। এই আর্থিক ব্যবস্থাপনা মুক্তিযুদ্ধের গতিকে সচল রাখতে সহায়ক হয়েছিল।
৯.সমন্বয় ও নির্দেশনা প্রদান: মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামরিক командование, বিভিন্ন সেক্টর, প্রবাসী বাঙালি এবং আন্তর্জাতিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
১০.যুদ্ধপরবর্তী দেশ পুনর্গঠনের প্রাথমিক রূপরেখা প্রণয়ন: বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে মুজিবনগর সরকার শুধু যুদ্ধ পরিচালনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের জন্যও প্রাথমিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে শুরু করে। কীভাবে দ্রুততম সময়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল করা যায়, অবকাঠামো পুনরুদ্ধার করা যায় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা যায়, সে বিষয়ে রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়। এটি তাদের দূরদর্শিতার পরিচায়ক।
উপসংহার:- মুজিবনগর সরকার কেবল একটি প্রবাসী সরকার ছিল না, এটি ছিল বাঙালি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক। মাত্র নয় মাসের সংক্ষিপ্ত সময়ে এই সরকার অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়, প্রশাসন পরিচালনা এবং জনগণের মনোবল অক্ষুণ্ণ রাখার মতো জটিল ও কঠিন দায়িত্বসমূহ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পালন করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে মুজিবনগর সরকারের অবদান তাই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
❖ সরকার গঠন ও সাংবিধানিক বৈধতা প্রদান ❖ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি ❖ মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা ও সামরিক কাঠামো বিন্যাস ❖ আন্তর্জাতিক সমর্থন ও স্বীকৃতি আদায় ❖ শরণার্থী ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণকার্য পরিচালনা ❖ প্রচার ও গণমাধ্যমকে সক্রিয় রাখা ❖ মুক্তাঞ্চলে বেসামরিক প্রশাসন চালু ❖ অর্থ ও রসদ সংগ্রহ ❖ সমন্বয় ও নির্দেশনা প্রদান ❖ যুদ্ধপরবর্তী দেশ পুনর্গঠনের প্রাথমিক রূপরেখা প্রণয়ন
মুজিবনগর সরকার ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল গঠিত হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে, যা পরবর্তীতে মুজিবনগর নামে পরিচিতি লাভ করে। এই সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (পাকিস্তানে অন্তরীণ) এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। ২৫শে মার্চ, ১৯৭১-এর কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক গণহত্যার প্রেক্ষাপটে এই সরকারের আত্মপ্রকাশ ঘটে। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ বাংলাদেশ বিজয় লাভ করে। ২২শে ডিসেম্বর, ১৯৭১ মুজিবনগর সরকারের নেতৃবৃন্দ ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং ১০ই জানুয়ারি, ১৯৭২ বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে এই সরকারের ঐতিহাসিক ভূমিকার সফল পরিসমাপ্তি ঘটে।

