- readaim.com
- 0
উত্তর।।ভূমিকাঃ- সমাজবিজ্ঞান মানুষের সামাজিক আচরণ, প্রতিষ্ঠান ও সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করে। এটি বিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে যুক্তিনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ পদ্ধতি অনুসরণ করে। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানকে প্রায়ই “মূল্যবোধ নিরপেক্ষ বিজ্ঞান” বলা হয়। এর কারণ হলো, এটি ব্যক্তিগত পক্ষপাত বা আবেগ থেকে মুক্ত থেকে তথ্য বিশ্লেষণ করে। নিচে এই বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১.বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা পদ্ধতি:- সমাজবিজ্ঞান বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে। এটি ব্যক্তিগত মতামত বা ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে না। গবেষণায় পরিসংখ্যান, পর্যবেক্ষণ ও যুক্তির ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতোই এটি প্রমাণভিত্তিক।
২.ব্যক্তিগত পক্ষপাতমুক্ত বিশ্লেষণ:- গবেষক তার নিজস্ব মূল্যবোধ বা পক্ষপাত গবেষণায় প্রভাব ফেলতে দেয় না। তথ্য উপস্থাপনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা হয়। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর উপর সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৩.সামাজিক সমস্যার বৈজ্ঞানিক সমাধানত:- সমাজবিজ্ঞান কুসংস্কার বা অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তিনির্ভর সমাধান দেয়। এটি সমাজের সমস্যাগুলোকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে। গবেষণার মাধ্যমে সামাজিক নীতি প্রণয়নে সহায়তা করে।
৪.তথ্য ও প্রমাণের উপর নির্ভরশীলতা:- সমাজবিজ্ঞান অনুমান বা ধারণার বদলে বাস্তব তথ্যের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়। জরিপ, সাক্ষাৎকার ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণার ফলাফল পুনরায় পরীক্ষা করা যায়, যা এর বৈজ্ঞানিক বৈধতা প্রমাণ করে।
৫.সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান:- এটি বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষের আচরণ নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করে। কোনো বিশেষ ধর্ম বা সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেয় না। বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করে।
৬.সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতা প্রচার:- সমাজবিজ্ঞান বৈষম্য, অসাম্য ও শোষণ নিয়ে গবেষণা করে। এটি সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে। গবেষণার মাধ্যমে দুর্বল সমস্যা তুলে ধরে।
৭.বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার সাথে সামঞ্জস্য:- সমাজবিজ্ঞান মনোবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কযুক্ত। এটি অন্যান্য বিজ্ঞানের মতোই পদ্ধতিগত গবেষণা করে। আন্তঃবিভাগীয় গবেষণার মাধ্যমে সমাজকে বোঝার চেষ্টা করে।
৮.গতিশীল সমাজের পরিবর্তন বিশ্লেষণ:- সমাজবিজ্ঞান সমাজের পরিবর্তনশীল প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করে। এটি প্রযুক্তি, রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রভাব নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করে। ভবিষ্যৎ সমাজের সম্ভাব্য রূপ নিয়ে পূর্বাভাস দেয়।
৯.নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পার্থক্য:- সমাজবিজ্ঞান নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা করে কিন্তু তা চাপিয়ে দেয় না। এটি বিভিন্ন সমাজের নৈতিক ব্যবস্থাকে তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করে। ব্যক্তির বিশ্বাস ও সমাজের কাঠামোর মধ্যে পার্থক্য করতে সাহায্য করে।
১০.বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি:- সমাজবিজ্ঞান বিশ্বব্যাপী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি স্বীকৃত বিজ্ঞান হিসেবে পড়ানো হয়। গবেষণাপত্রগুলো পিয়ার রিভিউ পদ্ধতির মাধ্যমে যাচাই করা হয়। এটি আন্তর্জাতিক স্তরে সমাজ বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
উপসংহার:- সমাজবিজ্ঞান একটি মূল্যবোধ নিরপেক্ষ বিজ্ঞান, কারণ এটি যুক্তি, প্রমাণ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ব্যক্তিগত পক্ষপাত বা আবেগ এড়িয়ে এটি সামাজিক সমস্যার সমাধান খোঁজে। সমাজের জটিল বিষয়গুলোকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে এটি আমাদের একটি সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে সাহায্য করে।
এক নজরে সমাজবিজ্ঞানকে ‘মূল্যবোধ নিরক্ষেপ বিজ্ঞান‘ বলার কারণ:-
🔹 বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা পদ্ধতি
🔹 ব্যক্তিগত পক্ষপাতমুক্ত বিশ্লেষণ
🔹 সামাজিক সমস্যার বৈজ্ঞানিক সমাধান
🔹 তথ্য ও প্রমাণের উপর নির্ভরশীলতা
🔹 সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান
🔹 সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতা প্রচার
🔹 বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার সাথে সামঞ্জস্য
🔹 গতিশীল সমাজের পরিবর্তন বিশ্লেষণ
🔹 নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পার্থক্য
🔹 বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি।
সমাজবিজ্ঞানকে ‘মূল্যবোধ নিরেক্ষ বিজ্ঞান’ বলা হয় কারণ এটি সমাজ ও মানুষের আচরণকে নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করে এবং তা মূল্যায়ন বা বিচার না করে শুধু পর্যবেক্ষণ করে। পিওর সোসিওলজি বা সমাজবিজ্ঞানের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ইউগেনিয়াস ডি’জিরণের নাম উল্লেখ করা যায়, যিনি ১৮৫০ সালে প্রথম সমাজবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ম্যাক্স ওয়েবার (১৯১৮) মূল্যবোধ নিরপেক্ষতার কথা বলেন, যেখানে তিনি সমাজবিজ্ঞানের উদ্দেশ্য হিসেবে গবেষণায় পক্ষপাতিত্ব না করার কথা উল্লেখ করেন। সমাজবিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায় নৈতিকতার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে চান, যেন তা সঠিক তথ্য প্রদান করতে পারে।

