- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: রুশো একজন বিতর্কিত এবং প্রভাবশালী চিন্তাবিদ ছিলেন, যিনি আধুনিক রাজনৈতিক দর্শন এবং শিক্ষাব্যবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন। তার মূল দর্শন ছিল মানুষের সহজাত স্বাধীনতা এবং সমাজের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে। তবে, তার চিন্তাভাবনার কিছু দিক, বিশেষ করে সামাজিক চুক্তি (Social Contract) এবং সাধারণ ইচ্ছা (General Will)-এর ধারণা, অনেক পণ্ডিতকে তাকে একজন সর্বাত্নকবাদী দার্শনিক হিসেবে চিহ্নিত করতে বাধ্য করেছে। তার মতে, ব্যক্তি তার সমস্ত অধিকার ও ক্ষমতা সমাজের কাছে সমর্পণ করে, যা একটি একক এবং অবিভাজ্য সার্বভৌম সত্তা তৈরি করে। এই সার্বভৌম সত্তাই সাধারণ ইচ্ছার মাধ্যমে শাসন করে। সমালোচকদের মতে, এই ব্যবস্থা ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য এবং অধিকারকে উপেক্ষা করে একটি সমষ্টিগত কর্তৃত্বকে চরম ক্ষমতা প্রদান করে।
১। সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে আত্মসমর্পণ: রুশোর সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো, প্রত্যেক ব্যক্তি তার সমস্ত অধিকার ও ক্ষমতা সমাজের কাছে নিঃশর্তভাবে সমর্পণ করবে। এই সমর্পণের মাধ্যমে একটি নতুন নৈতিক এবং সমষ্টিগত সত্তা বা রাষ্ট্র জন্ম নেবে। এই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব হবে সম্পূর্ণ এবং অবিভাজ্য। এর ফলে, ব্যক্তির কোনো নিজস্ব অধিকার বা ক্ষমতা অবশিষ্ট থাকে না, যা সে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে। এই ধরনের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের ধারণা সর্বাত্নকবাদের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য, যেখানে রাষ্ট্রের কাছে ব্যক্তির অস্তিত্ব গৌণ হয়ে যায় এবং রাষ্ট্রের ইচ্ছা ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর প্রাধান্য পায়। এই তত্ত্বের মাধ্যমে রুশো রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ক্ষমতাকে বৈধতা দেন, যা ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের অধীন করে তোলে।
২। সাধারণ ইচ্ছার সার্বভৌমত্ব: রুশো সাধারণ ইচ্ছাকে রাষ্ট্রের একমাত্র এবং চূড়ান্ত সার্বভৌম শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার মতে, সাধারণ ইচ্ছা হলো সমাজের সকল সদস্যের সমষ্টিগত কল্যাণ ও মঙ্গলের প্রতিফলন। এই ইচ্ছা কখনো ভুল করতে পারে না এবং এটি সবসময় জনস্বার্থে পরিচালিত হয়। সাধারণ ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তির ভিন্নমত বা ব্যক্তিগত ইচ্ছা গ্রহণযোগ্য নয়। যারা সাধারণ ইচ্ছার বিরোধিতা করে, তাদের “স্বাধীন হতে বাধ্য করা” হবে। এই ধারণাটি ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকারকে খর্ব করে। সাধারণ ইচ্ছার নামে একটি একক সমষ্টিগত দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা সর্বাত্নকবাদী শাসনের মূল ভিত্তি, যেখানে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং প্রশ্নাতীত।
৩। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বিলুপ্তি: রুশোর দর্শনে ব্যক্তির ব্যক্তিগত ইচ্ছা, অধিকার এবং স্বাধীনতাকে সমষ্টিগত সত্তা বা রাষ্ট্রের ইচ্ছার কাছে সম্পূর্ণরূপে বিলীন করে দেওয়া হয়েছে। তিনি মনে করতেন, মানুষ সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে তার প্রাকৃতিক স্বাধীনতা হারায়, কিন্তু তার পরিবর্তে একটি বৃহত্তর নাগরিক স্বাধীনতা লাভ করে। তবে, এই নাগরিক স্বাধীনতা রাষ্ট্রের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল। তার মতে, ব্যক্তি সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এবং সমাজের বাইরে তার কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই। এই ধারণাটি আধুনিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। রুশোর এই তত্ত্ব রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে, যেখানে ব্যক্তির স্বতন্ত্র পরিচয় ও মূল্যবোধের কোনো স্থান থাকে না।
৪। নাগরিক ধর্ম ও নৈতিকতা: রুশো রাষ্ট্রীয় ঐক্য এবং সংহতি বজায় রাখার জন্য একটি নাগরিক ধর্মের (Civil Religion) ধারণা দেন। এই ধর্ম ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে থাকবে এবং এর মূল উদ্দেশ্য হবে নাগরিকদের মধ্যে দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য তৈরি করা। এই ধর্মের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম থাকবে, যা মানা সকল নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক হবে। যারা এই নিয়ম মানতে অস্বীকার করবে, তাদের সমাজ থেকে বহিষ্কার করা হবে, এমনকি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হতে পারে। এই ধরনের রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত ধর্মীয় ও নৈতিক ব্যবস্থা সর্বাত্নকবাদী শাসনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, যেখানে রাষ্ট্র মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং বিবেককেও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
৫। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভাব: রুশোর দর্শনে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রতিরোধ বা অসহযোগিতার কোনো সুযোগ নেই। যেহেতু সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে জনগণ তাদের সকল অধিকার ও ক্ষমতা নিঃশর্তভাবে রাষ্ট্রের কাছে সমর্পণ করেছে, তাই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার বিদ্রোহ বা বিরোধিতা করার অধিকার তাদের থাকে না। রাষ্ট্র যখন সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায়, তখন তার সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করা যায় না। এই ধারণাটি রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে প্রশ্নাতীত করে তোলে। আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেখানে নাগরিকদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার থাকে, রুশোর এই দর্শন তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি সর্বাত্নকবাদী রাষ্ট্রকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদান করে।
৬। সম্পত্তি ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ: রুশো সম্পত্তির অধিকারকে প্রাকৃতিক অধিকার হিসেবে দেখেননি, বরং একে সমাজের দ্বারা সৃষ্ট একটি কৃত্রিম ব্যবস্থা হিসেবে দেখেছেন। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্র সমাজের সকল সদস্যের পক্ষ থেকে সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণ করবে। সমাজের প্রয়োজনে রাষ্ট্র যেকোনো ব্যক্তির সম্পত্তি অধিগ্রহণ করতে পারে। এই ধারণাটি সমাজতান্ত্রিক ও সর্বাত্নকবাদী রাষ্ট্রগুলোর নীতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারের চেয়ে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। রুশোর মতে, রাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো, এবং এই লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্রকে অসীম ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
৭। ব্যক্তির স্বাধীনতা নির্ধারণ: রুশো বিশ্বাস করতেন যে, ব্যক্তির স্বাধীনতা সাধারণ ইচ্ছার অধীন। তার মতে, একজন ব্যক্তি তখনই প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হয় যখন সে সাধারণ ইচ্ছার অনুসরণ করে। এর অর্থ হলো, একজন ব্যক্তি যদি তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা ত্যাগ করে সমাজের বৃহত্তর কল্যাণের জন্য কাজ করে, তবেই সে স্বাধীন। এই ধারণায় স্বাধীনতাকে ব্যক্তিগত পছন্দ বা অধিকারের পরিবর্তে সমষ্টিগত দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এই ধরনের স্বাধীনতা ব্যক্তির স্বায়ত্তশাসনকে সীমাবদ্ধ করে, কারণ ব্যক্তির স্বাধীনতাকে রাষ্ট্র বা সমষ্টির ইচ্ছার দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয়। এটি সর্বাত্নকবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যেখানে রাষ্ট্র স্বাধীনতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে।
৮। শাসক ও শাসিতের অভিন্নতা: রুশো বলেছেন যে, সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে জনগণই সার্বভৌম। কিন্তু তিনি এই সার্বভৌমত্বকে একটি একক এবং অবিভাজ্য সত্তা হিসেবে কল্পনা করেছেন, যা সাধারণ ইচ্ছার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এর ফলে, শাসক এবং শাসিতের মধ্যে কোনো স্পষ্ট বিভাজন থাকে না। জনগণই নিজেদের শাসক, তাই তাদের বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহ সম্ভব নয়। এই ধারণাটি আপাতদৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক মনে হলেও, বাস্তবে এটি একটি একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এই ব্যবস্থার ফলে, শাসকগোষ্ঠী নিজেদের জনগণের ইচ্ছার প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করে এবং তাদের ক্ষমতাকে সীমাহীন করে তোলে।
৯। রাষ্ট্রীয় শিক্ষার ওপর জোর: রুশো শিক্ষাব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখার পক্ষে ছিলেন। তার মতে, রাষ্ট্র শিশুদের এমনভাবে শিক্ষিত করবে, যাতে তারা ভালো নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে এবং রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকে। তিনি তার এমিল (Emile) গ্রন্থে একটি আদর্শ শিক্ষাপদ্ধতির কথা বলেছেন, যা ব্যক্তির বিকাশের ওপর জোর দিলেও, তার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় আনুগত্য তৈরি করা। এই ধরনের রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থা সর্বাত্নকবাদী রাষ্ট্রগুলোর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য, যেখানে শিশুদের মনকে রাষ্ট্রীয় আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তোলা হয়।
১০। ব্যক্তিগত মতামত ও ভিন্নমতের দমন: সাধারণ ইচ্ছার ধারণার কারণে রুশো ব্যক্তিগত মতামত ও ভিন্নমতের গুরুত্বকে খর্ব করেছেন। যেহেতু সাধারণ ইচ্ছা সবসময় সঠিক, তাই এর বিরুদ্ধে কোনো ভিন্নমত থাকতে পারে না। যারা ভিন্নমত পোষণ করে, তাদের সমাজের শত্রু হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ধরনের দমনমূলক নীতি সর্বাত্নকবাদী শাসনের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আধুনিক গণতন্ত্রে যেখানে ভিন্নমতকে সুস্থ বিতর্কের জন্য অপরিহার্য মনে করা হয়, রুশোর দর্শন তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি নাগরিকদের মধ্যে ভয় এবং আত্মসমর্পণের মনোভাব তৈরি করে।
১১। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য চূড়ান্ত: রুশোর মতে, রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হলো জনগণের কল্যাণ এবং সাধারণ মঙ্গল নিশ্চিত করা। এই মহৎ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য রাষ্ট্রকে যেকোনো উপায় অবলম্বন করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। যেহেতু রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য চূড়ান্ত এবং নৈতিকভাবে সঠিক, তাই এই উদ্দেশ্য অর্জনে রাষ্ট্র যে ক্ষমতা ব্যবহার করে, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যায় না। এই ধরনের চিন্তাভাবনা সর্বাত্নকবাদী শাসনকে নৈতিকভাবে বৈধতা দেয়, যেখানে শাসকরা নিজেদের কর্মকাণ্ডকে জনগণের কল্যাণের জন্য অপরিহার্য বলে দাবি করে।
১২। প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের বিরোধিতা: রুশো সরাসরি গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন এবং প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের বিরোধী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, প্রতিনিধিরা জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পারে না। তার মতে, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সরাসরি জনগণের হাতে থাকা উচিত। এই ধরনের সরাসরি গণতন্ত্র বাস্তবে প্রয়োগ করা কঠিন এবং এটি একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে পারে, যারা নিজেদের জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করে। এটি একটি স্বৈরাচারী শাসনের পথ খুলে দেয়, যেখানে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী নিজেদেরকে সমগ্র জনগণের ইচ্ছা হিসেবে উপস্থাপন করে।
১৩। প্রাকৃতিক অধিকারের অস্বীকৃতি: রুশো প্রাকৃতিক অধিকারের ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি মনে করতেন, অধিকার সমাজের দ্বারা সৃষ্ট এবং সমাজের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে, কোনো ব্যক্তির রাষ্ট্রের বাইরে কোনো সহজাত বা অপরিবর্তনীয় অধিকার নেই। এই ধারণাটি সর্বাত্নকবাদের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি, কারণ এটি রাষ্ট্রকে ব্যক্তির অধিকারকে নিয়ন্ত্রণ এবং সীমিত করার ক্ষমতা দেয়। যেখানে জন লক-এর মতো দার্শনিকরা প্রাকৃতিক অধিকারকে রাষ্ট্রের ওপর একটি সীমা হিসেবে দেখেছিলেন, রুশো সেই সীমাটি মুছে দিয়েছেন।
১৪। সামাজিক চুক্তির বাধ্যবাধকতা: সামাজিক চুক্তি হলো একটি অলঙ্ঘনীয় চুক্তি, যা থেকে কোনো ব্যক্তি নিজেকে প্রত্যাহার করতে পারে না। একবার এই চুক্তিতে প্রবেশ করলে, ব্যক্তিকে তার সমস্ত ক্ষমতা ও স্বাধীনতা সমাজের কাছে সমর্পণ করতে হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে গঠিত রাষ্ট্র থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। এই ধরনের বাধ্যবাধকতা সর্বাত্নকবাদী শাসনের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য, যেখানে নাগরিকদের রাষ্ট্রের সদস্য হিসেবে থাকতে বাধ্য করা হয়।
১৫। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের প্রতি পক্ষপাত: রুশো ছোট এবং সমজাতীয় রাষ্ট্রের পক্ষে ছিলেন, যেখানে জনগণের মধ্যে বিশ্বাস এবং ঐক্য সহজে বজায় রাখা সম্ভব। তার মতে, বড় এবং বৈচিত্র্যময় রাষ্ট্রে সাধারণ ইচ্ছা তৈরি করা কঠিন। এই ধরনের ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের ধারণা সর্বাত্নকবাদী শাসনের জন্য উপযুক্ত, কারণ সেখানে জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয় এবং ভিন্নমত দমন করা সহজ হয়।
১৬। ব্যক্তির স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের ক্ষমতা: রুশো বিশ্বাস করতেন যে, ব্যক্তির স্বাধীনতা রাষ্ট্রের ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। তার মতে, রাষ্ট্র ছাড়া ব্যক্তি অরাজকতার মধ্যে বাস করে, যেখানে কোনো প্রকৃত স্বাধীনতা নেই। রাষ্ট্রের আইন এবং শৃঙ্খলা ব্যক্তির স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। এই ধারণাটি আপাতদৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য হলেও, এটি রাষ্ট্রকে ব্যক্তির স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার চূড়ান্ত ক্ষমতা দেয়। রাষ্ট্র যখন স্বাধীনতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে, তখন তা সহজেই স্বৈরাচারে পরিণত হতে পারে।
১৭। মানুষের প্রাকৃতিক অবস্থা: রুশো মানুষের প্রাকৃতিক অবস্থাকে একটি নির্দোষ অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে মানুষ স্বাধীন এবং স্বনির্ভর ছিল। কিন্তু সমাজের কারণে মানুষ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ধারণাটি আধুনিক সর্বাত্নকবাদের একটি সাধারণ বিষয়, যেখানে একটি আদর্শ অতীতে ফিরে যাওয়ার এবং বর্তমানের সমস্যা দূর করার জন্য একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রয়োজন হয়। এই তত্ত্বের মাধ্যমে রুশো সমাজের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের জন্য রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ক্ষমতাকে সমর্থন করেছেন।
১৮। আইন প্রণয়নে জনমত: রুশো বিশ্বাস করতেন যে, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনগণের মতামতের সরাসরি প্রতিফলন হওয়া উচিত। তবে, তিনি এই মতামতকে “সাধারণ ইচ্ছা” হিসেবে দেখতেন, যা জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার চেয়ে একটি আদর্শ বা নৈতিক ইচ্ছার প্রতিফলন। এই ধরনের আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াটি একটি একক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দেয় এবং সংখ্যালঘুদের মতামতকে উপেক্ষা করে। এটি সর্বাত্নকবাদী শাসনকে জনমতের আড়ালে নিজেদের ক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ দেয়।
উপসংহার: রুশোর দর্শন, বিশেষ করে সামাজিক চুক্তি এবং সাধারণ ইচ্ছা-এর ধারণা, আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করলেও, এর কিছু দিক সর্বাত্নকবাদী চিন্তাভাবনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তার মতে, ব্যক্তি তার সমস্ত অধিকার ও ক্ষমতা নিঃশর্তভাবে রাষ্ট্রের কাছে সমর্পণ করে, যা রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করে তোলে। এই ব্যবস্থায় ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং ভিন্নমত উপেক্ষিত হয়। রুশোর এই চিন্তাধারা থেকে অনেক সমালোচক মনে করেন, তার দর্শন শেষ পর্যন্ত এমন এক রাষ্ট্রের জন্ম দেয়, যেখানে সমষ্টির নামে ব্যক্তি তার স্বাতন্ত্র্য এবং মৌলিক অধিকার হারিয়ে ফেলে।
- ১। সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে আত্মসমর্পণ
- ২। সাধারণ ইচ্ছার সার্বভৌমত্ব
- ৩। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বিলুপ্তি
- ৪। নাগরিক ধর্ম ও নৈতিকতা
- ৫। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভাব
- ৬। সম্পত্তি ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ
- ৭। ব্যক্তির স্বাধীনতা নির্ধারণ
- ৮। শাসক ও শাসিতের অভিন্নতা
- ৯। রাষ্ট্রীয় শিক্ষার ওপর জোর
- ১০। ব্যক্তিগত মতামত ও ভিন্নমতের দমন
- ১১। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য চূড়ান্ত
- ১২। প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের বিরোধিতা
- ১৩। প্রাকৃতিক অধিকারের অস্বীকৃতি
- ১৪। সামাজিক চুক্তির বাধ্যবাধকতা
- ১৫। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের প্রতি পক্ষপাত
- ১৬। ব্যক্তির স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের ক্ষমতা
- ১৭। মানুষের প্রাকৃতিক অবস্থা
- ১৮। আইন প্রণয়নে জনমত
জ্যাঁ-জাক রুশো ১৭৬২ সালে তার দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ প্রকাশ করেন: “সামাজিক চুক্তি (The Social Contract)” এবং “এমিল (Emile)”। এই গ্রন্থগুলো প্রকাশের পর ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। প্যারিসের পার্লামেন্ট উভয় গ্রন্থই পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেয় এবং রুশোকে গ্রেফতারের আদেশ জারি করে। রুশোকে তখন ফ্রান্সে নির্বাসিত হতে হয়। তার দর্শনের প্রভাব ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) সময় স্পষ্ট দেখা যায়, যখন বিপ্লবীরা “স্বাধীনতা, সমতা, এবং ভ্রাতৃত্ব (Liberty, Equality, Fraternity)”-এর স্লোগান ব্যবহার করে, যা রুশোর চিন্তাভাবনার প্রতিধ্বনি। ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম নেতা ম্যাক্সিমিলিয়েন রোবসপিয়ের (Maximilien Robespierre) রুশোর আদর্শের একজন বড় অনুসারী ছিলেন। রোবসপিয়ের তার “সন্ত্রাসের রাজত্ব (Reign of Terror)”-এর সময় রুশোর সাধারণ ইচ্ছার ধারণাকে ব্যবহার করে তার শাসনকে বৈধতা দেন, যেখানে ভিন্নমত পোষণকারীদের নির্মমভাবে দমন করা হয়েছিল।

