- readaim.com
- 0
উত্তর::সূত্রপাত: আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় শাসন বিভাগ বা নির্বাহী বিভাগের গুরুত্ব অপরিসীম। সরকার পরিচালনায় মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করা এই বিভাগটির ক্ষমতা ক্রমশ বাড়ছে। আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শাসন বিভাগের ক্রমবর্ধমান প্রভাব গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাসন বিভাগের ক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনের মূল কারণগুলো নিচে সহজ ও সাবলীল ভাষায় আলোচনা করা হলো:-
রাষ্ট্রের ভূমিকার পরিবর্তন: আগে যেখানে রাষ্ট্রের প্রধান কাজ ছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা, এখন তা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণসহ আরও অনেক নতুন ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে ভূমিকা রাখতে হচ্ছে। এই বিস্তৃত দায়িত্ব পালনের জন্য শাসন বিভাগকে নতুন নতুন আইন ও নীতি প্রণয়ন এবং সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষমতা দিতে হচ্ছে, যা তাদের সামগ্রিক প্রভাবকে বাড়িয়ে তুলছে। উদাহরণস্বরূপ, উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ধারণার উন্মোচন এবং ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার পর ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের “নিউ ডিল” কর্মসূচি শাসন বিভাগের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও বিশ্বায়ন: বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে প্রতিটি রাষ্ট্রকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে হচ্ছে। এসব চুক্তি বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার জন্য শাসন বিভাগকে দেশের অভ্যন্তরে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। এর ফলে, আইন প্রণয়নকারী সংস্থাগুলোর চেয়ে শাসন বিভাগের ক্ষমতা ও প্রভাব অনেক বেড়ে যায়।
প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার: আধুনিক সমাজে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং বিতরণের ক্ষমতা শাসন বিভাগকে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা ডিজিটালাইজেশন করার মাধ্যমে শাসন বিভাগ সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারছে, যা তাদের কার্যকারিতা ও দৃশ্যমানতা বাড়িয়ে তুলেছে। এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তাদের আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করে তুলছে।
জরুরি অবস্থা ও সংকট মোকাবিলা: প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী (যেমন কোভিড-১৯), সন্ত্রাসবাদ বা অর্থনৈতিক সংকটের মতো পরিস্থিতিতে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এমন সময়ে, শাসন বিভাগকে জরুরি ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এই ক্ষমতা সাধারণত সাময়িক হলেও, এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে শাসন বিভাগের প্রভাবকে শক্তিশালী করে।
আইন প্রণয়নের জটিলতা ও কার্যকারিতা: আধুনিক আইনগুলো প্রায়শই অত্যন্ত জটিল ও কারিগরি প্রকৃতির হয়, যা আইনসভাগুলোর পক্ষে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রণয়ন করা কঠিন হতে পারে। এক্ষেত্রে, আইনসভাগুলো প্রায়শই শাসন বিভাগকে নির্দিষ্ট বিষয়ে বিস্তারিত বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা অর্পণ করে। এর ফলে, শাসন বিভাগ কেবল আইন বাস্তবায়নকারী নয়, বরং আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠে।
আইনসভায় সময়স্বল্পতা ও বিশেষজ্ঞতার অভাব: সংসদ বা আইনসভাগুলোর সেশন সীমিত থাকে এবং তাদের পক্ষে প্রতিটি বিস্তারিত বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখা সবসময় সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে, শাসন বিভাগের অধীনে থাকা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান নিয়ে কাজ করে। তাই, আইন প্রণয়ন এবং নীতি নির্ধারণে শাসন বিভাগের পরামর্শ ও খসড়া আইনগুলো প্রায়শই গৃহীত হয়, যা তাদের প্রভাব বাড়ায়।
জনগণের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা: আধুনিক জনগণ সরকারের কাছ থেকে দ্রুত এবং কার্যকর পরিষেবা প্রত্যাশা করে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা – এ সব বিষয়ে জনগণের দাবি মেটানোর জন্য শাসন বিভাগকে আরও বেশি ক্ষমতা ও স্বাধীনতা দেওয়া হয়। জনগণের আস্থা অর্জন এবং তাদের প্রত্যাশা পূরণের জন্য শাসন বিভাগকে প্রায়শই নীতিনির্ধারণে অধিকতর ভূমিকা পালন করতে হয়। বিভিন্ন জরিপও নির্দেশ করে যে, অনেক দেশেই সরকারের নির্বাহী বিভাগের উপর জনগণের নির্ভরতা বাড়ছে।
গণমাধ্যমের প্রভাব ও জনমত গঠন: আধুনিক গণমাধ্যমগুলো দ্রুত তথ্য প্রচার করে এবং জনমত গঠনে সহায়তা করে। শাসন বিভাগ প্রায়শই গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে তাদের নীতি ও কর্মসূচি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করে এবং জনসমর্থন আদায় করে। গণমাধ্যম ও জনমতের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে শাসন বিভাগ তাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে এবং তাদের সিদ্ধান্তগুলোকে বৈধতা দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতি: পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে শাসন বিভাগ সরাসরি জড়িত থাকে। এই কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের জন্য তাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং দেশের প্রতিনিধিত্ব করার প্রয়োজন হয়। এর ফলে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শাসন বিভাগের ক্ষমতা ও গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়, যা তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়েও প্রভাব ফেলে।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও দুর্বল বিরোধী দল: যখন দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থাকে বা বিরোধী দল শক্তিশালী ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে না, তখন শাসন বিভাগ আরও বেশি ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ পায়। এর ফলে, ক্ষমতা বিভাজনের নীতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শাসন বিভাগের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়, যা গণতন্ত্রের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
উপসংহার: শাসন বিভাগের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি অনিবার্য বাস্তবতা। রাষ্ট্রের পরিবর্তিত ভূমিকা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এবং জনগণের প্রত্যাশাসহ নানা কারণ এই ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। এই ক্ষমতা বৃদ্ধি যেমন রাষ্ট্রের কার্যকারিতা বাড়াতে পারে, তেমনি এর অপব্যবহার গণতন্ত্রের জন্য হুমকিও হতে পারে। তাই, শাসন বিভাগের ক্ষমতা বৃদ্ধিকে বিচক্ষণতার সাথে পর্যবেক্ষণ করা এবং ক্ষমতা বিভাজনের নীতি অনুযায়ী ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
- রাষ্ট্রের ভূমিকার পরিবর্তন: রাষ্ট্রের কাজ শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা থেকে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তাসহ অনেক নতুন দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
- অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও বিশ্বায়ন: বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক চুক্তি ও মান বজায় রাখতে শাসন বিভাগকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
- প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার: দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও বিতরণের ক্ষমতা শাসন বিভাগকে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এবং জনগণের কাছে সরাসরি পৌঁছাতে সাহায্য করে।
- জরুরি অবস্থা ও সংকট মোকাবিলা: প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী বা সন্ত্রাসবাদের মতো পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য শাসন বিভাগকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়।
- আইন প্রণয়নের জটিলতা ও কার্যকারিতা: আধুনিক আইনের জটিলতার কারণে আইনসভা প্রায়শই শাসন বিভাগকে বিস্তারিত বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা অর্পণ করে।
- আইনসভায় সময়স্বল্পতা ও বিশেষজ্ঞতার অভাব: আইনসভাগুলোর সীমিত সময় এবং বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের অভাবে শাসন বিভাগের পরামর্শ ও খসড়া আইন প্রায়শই গৃহীত হয়।
- জনগণের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা: জনগণ সরকারের কাছ থেকে দ্রুত ও কার্যকর পরিষেবা আশা করায় শাসন বিভাগকে বেশি ক্ষমতা ও স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
- গণমাধ্যমের প্রভাব ও জনমত গঠন: শাসন বিভাগ গণমাধ্যম ব্যবহার করে তাদের নীতি ও কর্মসূচি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করে এবং জনসমর্থন আদায় করে।
- আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতি: পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ ও আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে শাসন বিভাগের সরাসরি জড়িত থাকার কারণে তাদের ক্ষমতা ও গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও দুর্বল বিরোধী দল: যখন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থাকে বা বিরোধী দল দুর্বল হয়, তখন শাসন বিভাগ আরও বেশি ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ পায়।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় শাসন বিভাগের ক্ষমতা বৃদ্ধি একটি জটিল প্রক্রিয়া, যা কেবল অভ্যন্তরীণ কারণ নয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এবং প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি দ্বারাও প্রভাবিত। ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দা ও সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারীর মতো সংকটগুলো শাসন বিভাগকে অভূতপূর্ব ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ দিয়েছে, যা তাদের সক্ষমতা ও প্রভাবকে আরও স্পষ্ট করেছে। জনগণের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশাও সরকারের নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে।

