- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: ভারত মহাসাগরের মুক্তার মতো সুন্দর দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলংকা। তবে এর সৌন্দর্য বহু বছর ধরে এক মারাত্মক জাতিগত সংঘাতের অন্ধকারে ঢাকা পড়েছিল। প্রধানত সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলী এবং সংখ্যালঘু তামিল জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই সংঘাত দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এই জটিল সংঘাতের মূলে রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার, ভাষা ও ধর্মের রাজনীতি এবং ক্ষমতা বন্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ। একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশটিকে এই জাতিগত বিভেদের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে প্রায় তিন দশক ধরে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ চলেছে।
১।ঔপনিবেশিক বিভাজন: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা নিজেদের সুবিধা মতো শ্রীলংকার সমাজকে বিভাজিত করে শাসন করার কৌশল নিয়েছিল। তারা প্রশাসনে ও শিক্ষায় সংখ্যালঘু তামিলদের তুলনামূলকভাবে বেশি সুযোগ-সুবিধা প্রদান করত। এর ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলী সম্প্রদায়ের মধ্যে ধীরে ধীরে এক ধরনের বঞ্চনা ও বিদ্বেষের অনুভূতি জন্ম নেয়। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর সিংহলী জাতীয়তাবাদীরা ক্ষমতা গ্রহণের পর এই ঐতিহাসিক বৈষম্য দূর করতে গিয়ে নতুন করে তামিলদের বিরুদ্ধে বৈষম্য সৃষ্টি করে, যা সংঘাতের বীজ বপন করে।
২।ভাষাগত আধিপত্য: ১৯৫৬ সালে শ্রীলংকার সরকার সিংহলী ভাষা-কে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত আইন পাশ করে। এই আইনটি ছিল তামিল জনগোষ্ঠীর ওপর একটি চরম আঘাত, কারণ এতে করে সরকারি চাকরি, শিক্ষা এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে যায়। তামিল ভাষাভাষী মানুষেরা অনুভব করে যে তাদের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে অস্বীকার করা হচ্ছে। এই এক ভাষা নীতি সংঘাতকে তীব্র করে তোলে এবং তামিলদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের জন্ম দেয়।
৩।ধর্মীয় মেরুকরণ: শ্রীলংকার সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলী জনগণ প্রধানত বৌদ্ধ ধর্ম-এর অনুসারী, অন্যদিকে সংখ্যালঘু তামিলরা প্রধানত হিন্দু। স্বাধীনতার পর থেকেই সিংহলী জাতীয়তাবাদীরা রাষ্ট্রকে বৌদ্ধ ধর্মভিত্তিক একটি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালায়। সরকার এবং বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের মধ্যেকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সংখ্যালঘু তামিলদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি সৃষ্টি করে। ধর্মীয় এই বিভেদ জাতিগত সংঘাতের আগুনে ঘি ঢালার কাজ করেছে।
৪।নাগরিকত্ব আইন: স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই সরকার ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রায় ৭ লক্ষ তামিল শ্রমিককে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করে একটি কঠোর আইন পাশ করে। এই বিশাল সংখ্যক মানুষকে রাতারাতি রাষ্ট্রবিহীন করে দেওয়ার ঘটনা তামিলদের প্রতি রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের একটি চরম উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এর ফলে শ্রীলংকার সমস্ত তামিল জনগোষ্ঠীর মধ্যে সরকারের প্রতি অবিশ্বাস ও ভয়ের জন্ম হয়, যা তাদের অধিকারের জন্য লড়াই করার প্রেরণা যোগায়।
৫।শিক্ষায় বৈষম্য: ১৯৭০-এর দশকে শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে সরকার যে কোটা ব্যবস্থা চালু করে, তাতে সিংহলী ছাত্রদের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি সুযোগ সৃষ্টি হয়। এই নীতিটি তামিল ছাত্রদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। মেধাবী তামিল ছাত্ররা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুযোগ না পাওয়ায় তাদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম নেয়। এই শিক্ষাগত বৈষম্য তামিল যুবকদেরকে সশস্ত্র আন্দোলনে যোগ দিতে উৎসাহিত করে।
৬।ভূমি পুনর্বণ্টন: সরকার কিছু তামিল অধ্যুষিত এলাকায় সিংহলী অধিবাসীদের বসতি স্থাপনের উদ্যোগ নেয়, যা ভূমি পুনর্বণ্টন নামে পরিচিত। তামিলরা এটিকে তাদের ঐতিহাসিক ও পৈতৃক ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্ত হিসেবে দেখত। এই ধরনের পদক্ষেপের ফলে বিভিন্ন এলাকায় জনসংখ্যার কাঠামোতে পরিবর্তন আসে, যা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ ও উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে।
৭।রাজনৈতিক ক্ষমতা: দেশের ক্ষমতা কাঠামোতে তামিলদের যথাযথ প্রতিনিধিত্বের অভাব ছিল দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সিংহলী রাজনীতিবিদদের দ্বারা ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে তামিলদের রাজনৈতিক দাবি-দাওয়াগুলো প্রায়শই উপেক্ষিত হতো। স্বায়ত্তশাসন এবং ক্ষমতা ভাগাভাগির দাবি বারবার নাকচ হওয়ায় তামিলদের মধ্যে এই ধারণা দৃঢ় হয় যে সশস্ত্র সংগ্রামই তাদের অধিকার আদায়ের একমাত্র পথ।
৮।সামরিক দমননীতি: যখন তামিলরা তাদের অধিকারের দাবিতে অহিংস আন্দোলন শুরু করে, তখন সরকার এবং নিরাপত্তা বাহিনী প্রায়শই কঠোর সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তা দমন করার চেষ্টা করে। এই দমন-পীড়নমূলক নীতি তামিলদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তোলে এবং সহিংসতাকে অনিবার্য করে তোলে। সরকার ও সামরিক বাহিনীর আচরণ মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্ম দেয়, যা সংঘাতকে আরও রক্তক্ষয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
৯।এলটিটিই-এর উত্থান: লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল ঈলাম (LTTE) নামে একটি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর উত্থান সংঘাতকে নতুন মাত্রা দেয়। এটি তামিলদের অধিকার আদায়ের জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নেয় এবং একটি স্বাধীন তামিল রাষ্ট্র (ঈলাম) গঠনের দাবি জানায়। এলটিটিই-এর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং সরকারের পাল্টা সামরিক অভিযান শ্রীলংকাকে প্রায় তিন দশকব্যাপী গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।
উপসংহার: শ্রীলংকার জাতিগত সংঘাত বহু বছরের রাজনৈতিক, ভাষাগত, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের জটিল ফল। সিংহলী জাতীয়তাবাদের উগ্র রূপ এবং তামিলদের অধিকারের ন্যায্য দাবি অগ্রাহ্য করার ফলেই এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্ম হয়েছিল। সংঘাত শেষ হলেও, এর মূল কারণগুলো এখনো পুনর্মিলন ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যতের শ্রীলংকাকে একটি শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সকল জাতিগোষ্ঠীর সমান অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
- 💠 ঔপনিবেশিক বিভাজন: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা নিজেদের সুবিধা মতো শ্রীলংকার সমাজকে বিভাজিত করে শাসন করার কৌশল নিয়েছিল।
- 💠 ভাষাগত আধিপত্য: ১৯৫৬ সালে শ্রীলংকার সরকার সিংহলী ভাষা-কে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত আইন পাশ করে।
- 💠 ধর্মীয় মেরুকরণ: শ্রীলংকার সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলী জনগণ প্রধানত বৌদ্ধ ধর্ম-এর অনুসারী, অন্যদিকে সংখ্যালঘু তামিলরা প্রধানত হিন্দু।
- 💠 নাগরিকত্ব আইন: স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই সরকার ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রায় ৭ লক্ষ তামিল শ্রমিককে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করে একটি কঠোর আইন পাশ করে।
- 💠 শিক্ষায় বৈষম্য: ১৯৭০-এর দশকে শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে সরকার যে কোটা ব্যবস্থা চালু করে, তাতে সিংহলী ছাত্রদের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি সুযোগ সৃষ্টি হয়।
- 💠 ভূমি পুনর্বণ্টন: সরকার কিছু তামিল অধ্যুষিত এলাকায় সিংহলী অধিবাসীদের বসতি স্থাপনের উদ্যোগ নেয়, যা ভূমি পুনর্বণ্টন নামে পরিচিত।
- 💠 রাজনৈতিক ক্ষমতা: দেশের ক্ষমতা কাঠামোতে তামিলদের যথাযথ প্রতিনিধিত্বের অভাব ছিল দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
- 💠 সামরিক দমননীতি: যখন তামিলরা তাদের অধিকারের দাবিতে অহিংস আন্দোলন শুরু করে, তখন সরকার এবং নিরাপত্তা বাহিনী প্রায়শই কঠোর সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তা দমন করার চেষ্টা করে।
- 💠 এলটিটিই-এর উত্থান: লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল ঈলাম (LTTE) নামে একটি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর উত্থান সংঘাতকে নতুন মাত্রা দেয়।
এই সংঘাতের ইতিহাসে ১৯৪৮ সালে ইন্ডিয়ান ও পাকিস্তানি রেসিডেন্টশিপ অ্যাক্ট দ্বারা বহু তামিলকে রাষ্ট্রবিহীন করা হয়। ১৯৫৬ সালের সিনহালা ওনলি অ্যাক্ট ছিল সংঘাতের একটি প্রধান অনুঘটক। ১৯৮৩ সালের ব্ল্যাক জুলাই দাঙ্গা গৃহযুদ্ধের সূচনা করে, যেখানে হাজার হাজার তামিল নিহত হন। সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে ২০০৯ সালে এলটিটিই-এর সামরিক পরাজয়ের মাধ্যমে। বিভিন্ন জরিপ অনুসারে, গৃহযুদ্ধে প্রায় ১ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

