- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা বর্তমানে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, চরম দুর্নীতি এবং একটি বিশেষ রাজনৈতিক পরিবারের ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ এই সংকটের জন্ম দিয়েছে। জনগণের ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হতে হয়েছে, যা দেশটির ইতিহাসে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
১।অর্থনৈতিক সংকট: অর্থনৈতিক সংকটই শ্রীলঙ্কার বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাতের মূল কারণ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শূন্য হয়ে যাওয়ায় দেশটি জ্বালানি, খাদ্য এবং ওষুধের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আমদানি করতে পারছে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় জনমনে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে, যা সরাসরি সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নিয়েছে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়েছে। এই অর্থনৈতিক বিপর্যয় দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ভুল নীতি ও অব্যবস্থাপনার ফল।
২।রাজাপাকসে পরিবারের প্রভাব: দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাধর রাজাপাকসে পরিবারের সদস্যদের হাতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো কেন্দ্রীভূত ছিল। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার একাধিক পদে একই পরিবারের সদস্যরা থাকায় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এই স্বজনপ্রীতি ও একচেটিয়া ক্ষমতা জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে এবং তাঁদের পতনের দাবিতে আন্দোলন তীব্র হয়েছে। এই পরিবারের ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়া বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাতের একটি বড় অংশ।
৩।গণবিক্ষোভের সূচনা: ২০২২ সালের মার্চ মাস থেকে শ্রীলঙ্কায় ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়, যা “আরাগালয়া” (Aragalaya – সংগ্রাম) নামে পরিচিত। এই আন্দোলনে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম অংশ নেয়। বিক্ষোভকারীরা সরকারের পদত্যাগ এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দাবি জানায়। এই অহিংস আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের দেশত্যাগ ও পদত্যাগে বাধ্য করে।
৪।ঋণের বোঝা: শ্রীলঙ্কার উপর বিশাল বৈদেশিক ঋণের বোঝা রয়েছে, যার মধ্যে চীন থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। এই ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় দেশটি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক ঋণে খেলাপি হয়। ঋণ পরিশোধ এবং নতুন ঋণ পাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর শর্ত পূরণ করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই আর্থিক চাপ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত করছে এবং সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে।
৫।রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পর দেশে রাজনৈতিক শূন্যতা ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তীতে রনিল বিক্রমাসিংহেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হলেও, তাঁর উপর জনগণের আস্থা কম। একটি কার্যকর এবং স্থিতিশীল সরকার গঠন করাই এখন দেশের প্রধান কাজ, যা অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে পারবে। সর্বদলীয় সরকারের আহ্বান জানানো হলেও, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের অভাব পরিলক্ষিত হয়।
৬।আইএমএফের শর্ত: অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য শ্রীলঙ্কা আইএমএফ-এর (International Monetary Fund) কাছ থেকে ঋণ সহায়তা চেয়েছে। তবে আইএমএফ ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কারের শর্ত দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কর বৃদ্ধি, ভর্তুকি হ্রাস এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানো। এই শর্তগুলো বাস্তবায়ন করলে স্বল্পমেয়াদে জনগণের উপর চাপ আরও বাড়তে পারে, যা নতুন করে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
৭।দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা: দেশের রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ব্যাপক দুর্নীতি ও দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা। বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে অর্থ অপচয় এবং কর হ্রাসের মতো ভুল অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়েও রাজনৈতিক নেতাদের অব্যবস্থাপনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে, জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রতিষ্ঠানের উপর আস্থা কমেছে।
৮।সাংবিধানিক সংস্কার: রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য বিক্ষোভকারীরা সাংবিধানিক পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা হ্রাস করে পার্লামেন্টকে শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কমানোর জন্য সংবিধানে একুশতম সংশোধনী আনা হয়েছে, যা সাংবিধানিক গণতন্ত্রের পথে এক ধাপ এগিয়েছে বলে মনে করা হয়। এই সংস্কারগুলো দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
৯।রাজনৈতিক দমন-পীড়ন: জনগণের ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে সরকার একসময় জরুরি অবস্থা ও কারফিউ জারি করেছিল। অনেক বিক্ষোভকারী ও অ্যাক্টিভিস্টকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমনকি নতুন প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহেও বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের উপর এই দমন-পীড়ন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য একটি হুমকি এবং এটি ভবিষ্যতে আরও সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।
১০।আন্তর্জাতিক প্রভাব: শ্রীলঙ্কার এই সংকট শুধু অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এর আন্তর্জাতিক প্রভাবও রয়েছে। ভারত এবং চীন উভয়ই শ্রীলঙ্কার ঋণদাতা এবং দেশটিতে তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। অর্থনৈতিক সহায়তার জন্য আইএমএফ-এর উপর নির্ভরতা এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে ঋণ পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনার কারণে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শ্রীলঙ্কার গুরুত্ব বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা সরকারের জন্য জরুরি।
১১।জাতীয় নিরাপত্তা: রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শ্রীলঙ্কার জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীকে মোতায়েন করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে উগ্রপন্থী গোষ্ঠী বা সুযোগসন্ধানী রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের ঝুঁকি তৈরি হয়, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও সংহতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
১২।খাদ্য ও জ্বালানি সংকট: বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে খাদ্য, জ্বালানি তেল (পেট্রোল, ডিজেল) ও গ্যাসের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর ফলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মানুষ জরুরি পণ্য পাচ্ছে না। এই সংকট জনগণের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলেছে, যা সরাসরি রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে সাহায্য করছে।
১৩।নতুন নেতৃত্ব ও চ্যালেঞ্জ: গোতাবায়া রাজাপাকসের পদত্যাগের পর রনিল বিক্রমাসিংহে দেশের নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক আস্থা ফিরিয়ে আনা। পার্লামেন্টে তাঁর দলের সমর্থন কম থাকায় নীতি প্রণয়ন ও সংস্কার বাস্তবায়ন করা তাঁর জন্য একটি কঠিন কাজ।
১৪।জাতিগত বিভেদ: অতীতে শ্রীলঙ্কায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলী বৌদ্ধ এবং সংখ্যালঘু তামিল ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতিগত সংঘাত বিদ্যমান ছিল। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মুখে প্রাথমিক পর্যায়ে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবাই আন্দোলনে যোগ দিলেও, অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে আবার জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিভেদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এই বিভেদ দূর করে জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করা দরকার।
১৫।রাজনৈতিক সংস্কৃতি: বিক্ষোভকারীরা কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, বরং দেশের পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন দাবি করেছে। দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করে একটি নতুন রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করাই তাদের মূল লক্ষ্য। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত জনগণের এই আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানিয়ে নতুন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়তা করা।
১৬।শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত: অর্থনৈতিক সংকটের ফলে শ্রীলঙ্কার একসময়কার শক্তিশালী শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাবলিক স্পেন্ডিং কমানোর ফলে এই খাতগুলোতে পরিষেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। শিশুদের পুষ্টিহীনতা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা জনগণের সামাজিক অধিকারকে ব্যাহত করছে।
১৭।নির্বাচনী পরিস্থিতি: নতুন সরকার গঠনের পর আগাম নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নির্বাচন করার অনুকূল নয়, কিন্তু জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য একটি নতুন ও জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকার গঠন জরুরি। একটি ন্যায্য ও অবাধ নির্বাচন বর্তমান সংকটের একটি রাজনৈতিক সমাধান দিতে পারে।
শেষকথা: শ্রীলঙ্কার বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাত আসলে একটি গভীর অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও দীর্ঘদিনের সুশাসনের অভাবের ফল। জনবিক্ষোভের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা একটি শক্তিশালী পরিবারের পতন হলেও, দেশের স্থিতিশীলতা এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। নতুন নেতৃত্বকে দুর্নীতি দমন, অর্থনৈতিক সংস্কার ও জনগণের আস্থা অর্জনের মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এই মুহূর্তে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দলগুলোর মধ্যে ঐক্যই দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একমাত্র পথ।

