- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ভারত মহাসাগরের মুক্তার মতো সুন্দর দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা বর্তমানে এক নজিরবিহীন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চরম বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং গণ-বিক্ষোভের কারণে দেশটির স্বাভাবিক জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই গভীর অস্থিতিশীলতার মূলে রয়েছে বহু বছরের ভুল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা এবং সুদূরপ্রসারী নীতিগত ত্রুটি। এই নিবন্ধে আমরা সেই মূল কারণগুলো আলোচনা করব।
অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি। শ্রীলঙ্কার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও প্রশাসনে ভয়াবহ ভুল করেছে। বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ঋণ নিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হয়েছে, যার অনেকগুলোই দেশের অর্থনীতির জন্য ফলপ্রসূ হয়নি। এছাড়া, সরকার পরিচালনায় উচ্চ-পর্যায়ের দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে, যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। এই অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি সম্মিলিতভাবে দেশের আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়, যা বর্তমান সংকটের জন্ম দিয়েছে। (১)
বড় বিদেশি ঋণ ও দায়। শ্রীলঙ্কা সরকার অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য চীনসহ অন্যান্য দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে প্রচুর পরিমাণে ঋণ গ্রহণ করেছে। এই ঋণ পরিশোধের চাপ, বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারীর পরে পর্যটন খাত থেকে আয় কমে যাওয়ায়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত নিঃশেষ করে দেয়। বিপুল ঋণের কিস্তি এবং সুদ মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় ডলারের অভাবই বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণ, যা চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এই ঋণের বোঝা এক প্রজন্ম ধরে দেশের মানুষের উপর চেপে আছে। (২)
ভুল কর ও রাজস্ব নীতি। ২০১৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাকসে সরকার দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে এক বিশাল কর কমানোর নীতি ঘোষণা করে। ভ্যাট (VAT) এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ করের হার নাটকীয়ভাবে কমানো হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারের রাজস্ব আয় মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়, যা সরকারি ব্যয় মেটানো এবং ঋণ পরিশোধের ক্ষমতাকে আরও দুর্বল করে দেয়। এই ভুল রাজস্ব নীতি দেশের আর্থিক ঘাটতিকে বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে দেয়, যা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নাজুক করে তোলে। (৩)
পর্যটন শিল্পের পতন। শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি মূলত পর্যটন নির্ভর। ২০১৯ সালের ইস্টার বোমা হামলার পর পর্যটন খাত বড় ধরনের ধাক্কা খায়, যা থেকে পুনরুদ্ধার হওয়ার আগেই ২০২০ সালে শুরু হয় কোভিড-১৯ মহামারী। এই দুটি ঘটনা আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আগমন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, যার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎসটি প্রায় শুকিয়ে যায়। পর্যটন শিল্পের এই ধারাবাহিক পতন সরাসরি দেশের ডলার সংকটকে আরও তীব্র করে, যা মানুষের মধ্যে চরম হতাশা ও সরকারের প্রতি ক্ষোভ জন্ম দেয়। (৪)
কৃষিতে রাসায়নিক সারের নিষেধাজ্ঞা। সাবেক রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাকসে সরকার হঠাৎ করেই সম্পূর্ণভাবে রাসায়নিক সার আমদানি ও ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই সিদ্ধান্ত রাতারাতি দেশের কৃষি উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে এবং ধান, চা ও অন্যান্য প্রধান ফসলের উৎপাদন ব্যাপক হারে কমে যায়। অভ্যন্তরীণ বাজারে খাদ্যের ঘাটতি দেখা দেয় এবং চা রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে যায়। এটি সরাসরি খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দেয় এবং জন-অসন্তোষকে চরমে পৌঁছে দেয়। (৫)
মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় সরকার প্রয়োজনীয় খাদ্য, ওষুধ, ও জ্বালানি আমদানি করতে পারছিল না। এর ফলে বাজারে এসব পণ্যের চরম ঘাটতি দেখা দেয় এবং একই সাথে শ্রীলঙ্কার মুদ্রা (শ্রীলঙ্কান রুপি) অস্বাভাবিকভাবে অবমূল্যায়িত হয়। ফলস্বরূপ, মূল্যস্ফীতি আকাশ ছুঁয়ে যায়, এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। জীবনযাত্রার এই অসহনীয় ব্যয়বৃদ্ধি গণ-বিক্ষোভের মূল ইন্ধন জুগিয়েছে। (৬)
ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ ও পরিবারতন্ত্র। রাজাপাকসে পরিবার দীর্ঘদিন ধরে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে প্রভাবশালী ছিল। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবারের একাধিক সদস্য অধিষ্ঠিত ছিলেন। ক্ষমতার এই অতি-কেন্দ্রীকরণ এবং পরিবারতন্ত্রের কারণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব দেখা দেয়, যা দুর্নীতি ও ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ প্রশস্ত করে। জনগণের কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে পরিবারতন্ত্রের স্বার্থেই অনেক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা গণ-বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ। (৭)
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শূন্যতা। অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতার মুখে এবং জন-বিক্ষোভের চাপে রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাকসে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী মহিন্দা রাজাপাকসেও পদত্যাগ করেন। সরকারের শীর্ষ পদে এই দ্রুত পরিবর্তন এবং ক্ষমতার শূন্যতা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে। নতুন সরকার দ্রুত অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে না পারায় জনগণের আস্থা আরও কমে যায়, যা অস্থিরতা জিইয়ে রাখে। (৮)
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট। বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে সরকার অপরিশোধিত তেল আমদানি করতে পারছিল না, যার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করে। ফলে দেশজুড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং শুরু হয়। একইভাবে, পেট্রোল এবং ডিজেলেরও চরম ঘাটতি দেখা দেওয়ায় পরিবহন ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়ে। এই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে অসহনীয় করে তোলে এবং সরকারের উপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়। (৯)
বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভের অভাব। শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এতই কমে গিয়েছিল যে দেশটি তার আমদানি বিল মেটাতে বা আন্তর্জাতিক ঋণ পরিশোধ করতে পারছিল না। এই রিজার্ভ ঘাটতি মূলত ভুল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ এবং প্রধান আয়ের উৎস (পর্যটন, রেমিট্যান্স) দুর্বল হওয়ার ফল। রিজার্ভ শূন্য হওয়ায় শ্রীলঙ্কা শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) কাছে আর্থিক সাহায্যের জন্য আবেদন করতে বাধ্য হয়। (১০)
কোভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব। বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি বহুমুখী ক্ষতির সম্মুখীন হয়। মহামারীর ফলে বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পর্যটন শিল্প সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। একই সাথে, প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স প্রবাহও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এই দুটি প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের ডলার সংকট আরও প্রকট হয়, যা অর্থনৈতিক পতনের গতি বাড়িয়ে দেয় এবং রাজনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি করে। (১১)
দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর অর্থনীতি। শ্রীলঙ্কা ২০০৯ সালে দীর্ঘ এবং রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটায়। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দেশ পুনর্গঠনের জন্য ব্যাপক বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিল, যা মূলত ঋণের মাধ্যমে মেটানো হয়। এই সময়ে নেওয়া অনেক ঋণ এবং সেই ঋণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব অর্থনৈতিক কাঠামোর উপর দীর্ঘমেয়াদী চাপ সৃষ্টি করে। গৃহযুদ্ধের পরবর্তী অর্থনৈতিক নীতিগুলি স্থিতিশীলতার পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদী লাভকে বেশি গুরুত্ব দেয়। (১২)
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অসন্তোষ। দেশের সিংহলী-বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তামিল-মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে সব সময়ই প্রভাবিত করেছে। যদিও বর্তমান সংকট মূলত অর্থনৈতিক, তবে অতীতের জাতিগত সংঘাতের রেশ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ সরকারের প্রতি সামগ্রিক জন-অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই বিভাজনগুলি সংকটের সময় ঐক্যের পথে বাধা সৃষ্টি করে। (১৩)
আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারের অবিশ্বাস। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার দেশটির ওপর থেকে আস্থা হারিয়েছে। বিভিন্ন রেটিং এজেন্সি শ্রীলঙ্কার ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দেওয়ায় দেশটি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে নতুন করে ঋণ নেওয়া বা বন্ড বিক্রি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই অবিশ্বাসের কারণে শ্রীলঙ্কাকে চরম আর্থিক চাপ মোকাবিলা করতে হয়েছে, যা রাজনৈতিকভাবে সরকারকে কোণঠাসা করে ফেলে। (১৪)
রাজনৈতিক জবাবদিহিতার অভাব। দীর্ঘকাল ধরে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ব্যর্থতা বা দুর্নীতির জন্য কঠোর শাস্তি না হওয়ার একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। জনগণের কাছে মনে হয়েছে যে শাসকশ্রেণি তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো জবাবদিহিতা অনুভব করে না। এই জবাবদিহিতার অভাব এবং দায়মুক্তির মনোভাব সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে, যা শেষ পর্যন্ত ব্যাপক গণ-বিক্ষোভে রূপ নেয় এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটায়। (১৫)
দ্রুত নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব। কৃষি নীতিতে হঠাৎ করে জৈব সারে পরিবর্তন আনা বা কর নীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আনার মতো দ্রুত এবং অপরিকল্পিত নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞ পরামর্শ উপেক্ষা করে রাজনৈতিক তাড়নায় নেওয়া এই সিদ্ধান্তগুলো বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এই ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত জনগণের মধ্যে সরকারের উপর আস্থা হারানোর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে। (১৬)
দুর্বল সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ। শ্রীলঙ্কার সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসন অনেক সময়ই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ অন্যান্য আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা সঠিক অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করেছে। স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ না পাওয়ায় এই প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনৈতিক মন্দার পূর্বাভাস দিতে বা প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে, যা সামগ্রিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য দায়ী। (১৭)
উপসংহার: শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা একটি জটিল এবং বহুস্তরীয় সমস্যার ফল। অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণ, ভুল নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক পরিবারতন্ত্রের প্রভাব সম্মিলিতভাবে দেশকে এই গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই অস্থিতিশীলতা থেকে মুক্তি পেতে হলে শ্রীলঙ্কাকে জরুরি ভিত্তিতে কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য এই পদক্ষেপগুলো অপরিহার্য।

