- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা ও রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো এর পবিত্র সংবিধান। ১৯৭২ সালে প্রণীত হওয়ার পর থেকে সময়ের দাবি, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে এই সংবিধানে বহু পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংবিধানের এই বিবর্তন ও প্রধান প্রধান সংশোধনীসমূহের একটি সহজ-সরল রূপরেখা নিচে আলোচনা করা হলো।
বাংলাদেশ সংবিধানের প্রধান প্রধান সংশোধনীসমূহ:
১। প্রথম সংশোধনী: ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে এই সংশোধনী পাস করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধী, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধী এবং অন্যান্য গণহত্যাকারীদের বিচার নিশ্চিত করা। এই সংশোধনীর মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের মৌলিক অধিকার স্থগিত রেখে তাদের দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ আইন প্রণয়নের সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল, যা দেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।
২। দ্বিতীয় সংশোধনী: ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই সংশোধনীটি জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়। এর মাধ্যমে সংবিধানে জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান এবং অন্তরীণ বা বিনা বিচারে আটকে রাখার নিয়ম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ গোলযোগ, অর্থনৈতিক সংকট বা বহিরাগত আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করার অজুহাতে এই পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এর ফলে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়।
৩। তৃতীয় সংশোধনী: ১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাসে এই সংশোধনীটি পাস করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পাদিত ঐতিহাসিক সীমান্ত চুক্তিকে আইনিভাবে কার্যকর করার জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে বেরুবাড়ী ইউনিয়নের দক্ষিণ পূর্বাংশ ভারতকে হস্তান্তর এবং বিনিময়ে ভারতের কিছু ছিটমহল বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি চূড়ান্ত ও বৈধতা লাভ করে।
৪। চতুর্থ সংশোধনী: ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে এই ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত সংশোধনীটি পাস হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা সংসদীয় পদ্ধতি থেকে একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতিতে পরিবর্তিত হয়। বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে ‘বাকশাল’ নামক একটি মাত্র জাতীয় দল গঠনের নিয়ম চালু করা হয়। একই সাথে এই সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে অনেকাংশে খর্ব করা হয়েছিল।
৫। পঞ্চম সংশোধনী: ১৯৭৯ সালের এপ্রিল মাসে এই সংশোধনীটি জাতীয় সংসদে পাস করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর থেকে ১৯৭৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক সরকারের সমস্ত অধ্যাদেশ ও কাজকে এর মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির-রাহমানির-রাহিম’ যুক্ত করা হয় এবং ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে পরিবর্তন করে মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করা হয়।
৬। ষষ্ঠ সংশোধনী: ১৯৮১ সালের জুলাই মাসে এই সংশোধনীটি সংবিধানে আনা হয়েছিল। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি যাতে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন, সেই আইনি জটিলতা দূর করার জন্যই মূলত এই সংশোধনীটি পাস করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে লাভজনক পদের সংজ্ঞায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
৭। সপ্তম সংশোধনী: ১৯৮৬ সালের নভেম্বর মাসে এই সংশোধনীটি জাতীয় সংসদে পাস করা হয়। ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বে জারি করা সামরিক শাসন এবং তার পরবর্তী সমস্ত অধ্যাদেশ ও আদেশকে এর মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। এই সংশোধনীর মূল লক্ষ্য ছিল সামরিক সরকারের যাবতীয় কর্মকান্ডকে আদালতের এখতিয়ারের বাইরে রেখে সেগুলোকে সাংবিধানিক সুরক্ষা প্রদান করা।
৮। অষ্টম সংশোধনী: ১৯৮৮ সালের জুন মাসে এই সংশোধনীটি পাস করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি পরিবর্তন আনা হয়, যার একটি হলো ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা। অন্য পরিবর্তনটি ছিল ঢাকার বাইরে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ৬টি স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন করা। তবে পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের বেঞ্চ ঢাকার বাইরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্তটিকে অবৈধ ঘোষণা করে।
৯। নবম সংশোধনী: ১৯৮৯ সালের জুলাই মাসে এই সংশোধনীটি সংবিধানে যুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও উপ-রাষ্ট্রপতির পদের মেয়াদ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। বিধান করা হয় যে, একজন ব্যক্তি পরপর সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে বা মোট ১০ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন। শাসনব্যবস্থায় ভারসাম্য বজায় রাখা এবং ক্ষমতার দীর্ঘমেয়াদী কেন্দ্রীকরণ রোধ করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
১০। দশম সংশোধনী: ১৯৯০ সালের জুন মাসে এই সংশোধনীটি জাতীয় সংসদে পাস হয়। এর মাধ্যমে জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের মেয়াদ আরও ১০ বছরের জন্য বৃদ্ধি করা হয়। সংবিধানে উল্লেখ করা হয় যে, পরবর্তী সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকে শুরু করে আগামী ১০ বছর পর্যন্ত নারীদের জন্য ৩০টি আসন সংরক্ষিত থাকবে। রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এটি করা হয়েছিল।
১১। একাদশ সংশোধনী: ১৯৯১ সালের আগস্ট মাসে এই সংশোধনীটি পাস করা হয়। গণ-আন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতনের পর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি যেন পুনরায় তার মূল পদ অর্থাৎ প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যেতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই এই বিশেষ সংশোধনীটি আনা হয়েছিল।
১২। দ্বাদশ সংশোধনী: ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীটি পাস হয়। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ১৬ বছর পর বাংলাদেশে পুনরায় সংসদীয় শাসনব্যবস্থা বা ক্যাবিনেট পদ্ধতির সরকার ফিরিয়ে আনা হয়। রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সরকারের নির্বাহী প্রধান করা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা এক নতুন যুগে পদার্পণ করে এবং সংসদ শক্তিশালী হয়।
১৩। ত্রয়োদশ সংশোধনী: ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে এই ঐতিহাসিক সংশোধনীটি জাতীয় সংসদে পাস করা হয়। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস দূর করতে এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে এর মাধ্যমে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা’ প্রবর্তন করা হয়। সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর একটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে ৯০ দিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান করা হয়েছিল।
১৪। চতুর্দশ সংশোধনী: ২০০৪ সালের মে মাসে এই সংশোধনীটি সংবিধানে আনা হয়েছিল। এর মাধ্যমে জাতীয় সংসদে নারীদের সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ৩০ থেকে বৃদ্ধি করে ৪৫ করা হয় এবং এর মেয়াদ আরও ১০ বছর বাড়ানো হয়। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর এবং সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বয়সসীমা বৃদ্ধি করা হয়েছিল।
১৫। পঞ্চদশ সংশোধনী: ২০১১ সালের জুন মাসে এই ব্যাপক ও যুগান্তকারী সংশোধনীটি পাস করা হয়। এর মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে প্রবর্তিত ত্রয়োদশ সংশোধনীর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল নীতি ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হয় এবং সংবিধানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের বিধান বাধ্যতামূলক করা হয়।
১৬। ষোড়শ সংশোধনী: ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই সংশোধনীটি জাতীয় সংসদে পাস হয়েছিল। এর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, যা ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট এই সংশোধনীটিকে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে, যা দেশের বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
১৭। সপ্তদশ সংশোধনী: ২০১৮ সালের জুলাই মাসে এই সংশোধনীটি সংবিধানে যুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৫০টি আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছরের জন্য বৃদ্ধি করা হয়। আইন পাসের সময় বলা হয় যে, এই সংশোধনী কার্যকর হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ২৫ বছর পর্যন্ত নারী আসনের এই কোটা ব্যবস্থা বহাল থাকবে, যাতে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে নারীদের কণ্ঠস্বর জোরালো থাকে।
উপসংহার: সংবিধান একটি জীবন্ত দলিল যা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের এই ১৭টি প্রধান সংশোধনী দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের উত্থান-পতন, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও সংকটের প্রতিচ্ছবি। কিছু সংশোধনী যেমন গণতন্ত্রকে সুসংহত করেছে, তেমনি কিছু সংশোধনী রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। পরিশেষে বলা যায়, জনগণের কল্যাণ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হোক সংবিধানের যেকোনো পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য।