- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ একটি অত্যন্ত জটিল ও সুদূরপ্রসারী অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে সামরিক শাসন ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ হস্তক্ষেপ দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করেছে। এই হস্তক্ষেপের ফলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সমাজনীতি, অর্থনীতি এবং বিচারব্যবস্থায় নেতিবাচক ও ইতিবাচক—উভয় ধরনের গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের ফলাফল:
১। গণতন্ত্রের বিপর্যয়: সামরিক হস্তক্ষেপের সবচেয়ে বড় কুফল হলো দেশের গণতান্ত্রিক ধারা বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়া। জনগণের ভোটের অধিকার এবং নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে সংবিধানকে স্থগিত করা হয়। এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও প্রতিষ্ঠানগুলো এই সামরিক শাসনের ফলে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
২। সংবিধানের বিকৃতি: সামরিক শাসকেরা ক্ষমতা দখল করেই নিজেদের স্বার্থে দেশের পবিত্র সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। বারবার সামরিক ফরমান ও অর্ডিন্যান্স জারির মাধ্যমে সংবিধানের মূল চেতনা ও আদর্শকে পরিবর্তন করা হয়। পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনীর মতো বিতর্কিত আইন পাস করে অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এর ফলে দেশের সর্বোচ্চ আইনের প্রতি জনগণের আস্থা বহুলাংশে হ্রাস পায়।
৩। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন: সামরিক শাসকেরা ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে কৃত্রিম উপায়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে। রাজনীতিকে সাধারণ মানুষের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে অর্থ ও পেশী শক্তির নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর ফলে নীতিহীন ও সুযোগসন্ধানী রাজনীতিবিদের জন্ম হয়, যা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আজো কলুষিত করছে। দল ভাঙা-গড়ার এই খেলা রাজনীতিকে চরমভাবে দেউলিয়া করে তোলে।
৪। বিচারহীনতার সংস্কৃতি: সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে এক ভয়াবহ বিচারহীনতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে খুনিদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল। এই ধরনের কালো আইন দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথকে সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে দেয়। অপরাধীরা রাষ্ট্রীয় মদদে পুনর্বাসিত হওয়ায় সমাজে চরম নৈরাজ্য ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়।
৫। মানবাধিকার লঙ্ঘন: সামরিক শাসনের অন্যতম কালো দিক হলো নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকার চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হওয়া। বিনা বিচারে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের আটক রাখা, গুম এবং নির্যাতনের ঘটনা এই সময়ে নিয়মে পরিণত হয়েছিল। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করে কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছিল, ফলে জনগণের বাকস্বাধীনতা সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়। মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো বুটের তলায় পিষ্ট হয়েছিল।
৬। অর্থনীতির সামরিকীকরণ: সামরিক বাহিনী সরাসরি ক্ষমতায় আসার পর বেসামরিক প্রশাসনের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক পদগুলোতে এবং বিভিন্ন লাভজনক সংস্থায় সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এর ফলে মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও সুষ্ঠু ব্যবসায়িক পরিবেশ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। সাধারণ উদ্যোক্তাদের চেয়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে বেশি সুবিধা লাভ করে।
৭। দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: সামরিক শাসনামলে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে অবৈধ অর্থ ঢেলে সমর্থন কেনার রাজনীতি শুরু হয়। এর ফলে দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। ঋণখেলাপি সংস্কৃতির সূচনা এই সময়েই হয়েছিল, যা দেশের ব্যাংকিং খাতকে এখনো পঙ্গু করে রেখেছে। যোগ্য ও সৎ মানুষেরা অবহেলিত হয়ে দুর্নীতিবাজেরা রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
৮। বিচার বিভাগের পরাধীনতা: সামরিক ফরমানের মাধ্যমে দেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে হরণ করা হয়েছিল। উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা এককভাবে সামরিক প্রধানের হাতে চলে যায়। এর ফলে আদালতগুলো স্বাধীনভাবে এবং নিরপেক্ষভাবে ন্যায়বিচার দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। শাসকের ইচ্ছাই তখন আইনের চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল, যা বিচার ব্যবস্থার মর্যাদা ধূলিসাৎ করে।
৯। সাম্প্রদায়িকতার উত্থান: সামরিক শাসকেরা তাদের অবৈধ ক্ষমতাকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে ধর্মের অপব্যবহার শুরু করে। ধর্মনিরপেক্ষতার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি বদলে সংবিধানে বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের অন্তর্ভুক্তি এর বড় প্রমাণ। এর ফলে দেশের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আবহ বিনষ্ট হয় এবং ধর্মীয় চরমপন্থার বীজ রোপিত হয়। সমাজের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে তৈরি হয় স্থায়ী বিভাজন।
১০। প্রশাসনের চেইন অফ কমান্ড বিনষ্ট: বেসামরিক প্রশাসনে সামরিক কর্মকর্তাদের অবাধ অনুপ্রবেশের ফলে আমলাতন্ত্রের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি ও শৃঙ্খলা নষ্ট হয়। জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার চেয়ে সামরিক আনুগত্যকে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার মাপকাঠি বানানো হয়। এর ফলে সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ এবং হতাশার সৃষ্টি হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি তখন হয়ে পড়েছিল একমুখী এবং আমলাতান্ত্রিকভাবে দুর্বল।
১১। সুশীল সমাজের বিভাজন: সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে দেশের বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক ও সুশীল সমাজের মধ্যে চরম বিভক্তি দেখা দেয়। একদল সুযোগসন্ধানী বুদ্ধিজীবী নিজেদের আখের গোছাতে সামরিক শাসকদের গুণগানে লিপ্ত হন। এর ফলে সমাজের বিবেক বলে পরিচিত এই গোষ্ঠীটির নৈতিক পতন ঘটে। তারা সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই থেকে দূরে সরে যান, যা জাতির জন্য এক বড় ক্ষতি।
১২। ছাত্র রাজনীতির কলুষায়ন: দেশের গৌরবময় ছাত্র রাজনীতিকে ধ্বংস করতে সামরিক শাসকেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্ত্র ও কালো টাকার অনুপ্রবেশ ঘটায়। ছাত্রদের পড়াশোনা থেকে দূরে সরিয়ে লেলিয়ে দেওয়া হয় নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে। এর ফলে ক্যাম্পাসে নিয়মিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, হল দখল এবং সেশন জটের মতো ভয়াবহ সমস্যা তৈরি হয়। মেধাভিত্তিক রাজনীতির বদলে অস্ত্রধারী ক্যাডারদের জয়জয়কার শুরু হয় এই সময়েই।
১৩। আন্তর্জাতিক মহলে ভাবমূর্তি সংকট: বারবার সামরিক অভ্যুত্থান ও গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো সামরিক সরকারকে সহজে স্বীকৃতি দিতে চায়নি, ফলে বৈদেশিক সাহায্য ও বিনিয়োগে স্থবিরতা নেমে আসে। বাংলাদেশকে একটি অস্থিতিশীল এবং স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করা হতো। এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অগ্রগতি দীর্ঘ সময়ের জন্য থমকে গিয়েছিল।
১৪। অবকাঠামোগত কিছু উন্নয়ন: নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি সামরিক শাসকদের নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর তাগিদে কিছু দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে দেখা গেছে। উপজেলা ব্যবস্থার প্রবর্তন, রাস্তাঘাট ও যাতায়াত ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এর মধ্যে অন্যতম। গ্রামীণ অঞ্চলের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ফলে সাধারণ মানুষের সরকারি সেবা পাওয়ার সুযোগ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছিল। তবে এই উন্নয়নগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা।
১৫। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ: সামরিক শাসনের প্রাথমিক দিনগুলোতে কঠোর সেনা নজরদারির কারণে দেশের সাধারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাময়িক উন্নতি ঘটেছিল। অপরাধী ও কালোবাজারিদের দমনে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে সমাজে এক ধরনের কৃত্রিম স্বস্তি তৈরি হয়। কিন্তু এই শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, কারণ আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে নেওয়া এই ব্যবস্থাগুলো সাধারণ মানুষের মনে স্থায়ী ভীতি ও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছিল।
১৬। জাতীয়তাবাদের নতুন বিতর্ক: সামরিক শাসনামলে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ এর পরিবর্তে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ এর ধারণা প্রবর্তন করা হয়। এই নতুন তত্ত্বের কারণে দেশের অভ্যন্তরে নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ ও অসন্তোষ গভীর হয়। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ ও অধিকারহীনতার জন্ম দেয়। এই জাতীয়তাবাদী বিতর্কটি দেশের রাজনীতিতে আজও এক বড় বিভাজনের রেখা।
১৭। আন্দোলনের নতুন ঐক্য: সামরিক স্বৈরাচারের অবসান ঘটাতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ভেদাভেদ ভুলে এক মঞ্চে আসতে বাধ্য হয়েছিল। আশির দশকের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন গণতান্ত্রিক মোর্চা গড়ে ওঠে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল এই ঐক্যেরই চূড়ান্ত ফসল, যা দেশে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছিল। এই আন্দোলন জনগণের মধ্যে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রতিরোধের মানসিকতা তৈরি করে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ সুফলের চেয়ে কুফলই বেশি বয়ে এনেছে। এটি সাময়িকভাবে কিছুটা শৃঙ্খলা বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন আনলেও, দীর্ঘমেয়াদে দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে পঙ্গু করে দিয়েছে। একটি স্বনির্ভর ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে সামরিক হস্তক্ষেপের এই কালো অধ্যায় থেকে শিক্ষা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। একমাত্র নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই দেশের টেকসই উন্নয়ন ও জনগণের প্রকৃত মুক্তি সম্ভব।