- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: সংস্কৃতি হলো একটি সমাজের প্রাণ। এটি মানুষের জীবনযাপন, বিশ্বাস, রীতিনীতি ও মূল্যবোধকে গঠন করে। কিন্তু পৃথিবীতে নানা সংস্কৃতি পাশাপাশি বসবাস করায় সৃষ্টি হয় সংস্কৃতির সমন্বয়বাদীতার ধারণা। এটি বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সৌহার্দ্য ও সহাবস্থান গড়ে তোলে। আজকের বৈশ্বিক যুগে এই ধারণা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।সমন্বয়বাদীতা শব্দের অর্থ হলো বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে মিলন বা সামঞ্জস্য বিধান করা। সংস্কৃতির সমন্বয়বাদীতা বলতে বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও সহাবস্থানকে বোঝায়।
পরিচয়: –
সংস্কৃতির সমন্বয়বাদীতা হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়, পরস্পরকে প্রভাবিত করে এবং নতুন একটি সমন্বিত রূপ লাভ করে। এটি সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়ক।আমরা সাধারণত মনে করি, সংস্কৃতির সমন্বয়বাদীতা মানে হল বিভিন্ন সংস্কৃতির লোকেদের একসাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করা। যেমন, বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরের উৎসব ও সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করে।
১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “সংস্কৃতির সমন্বয় হলো বিভিন্ন স্রোতের মিলনমেলা, যেখানে বৈচিত্র্য এক নতুন সুর সৃষ্টি করে।” (“Cultural synthesis is the confluence of diverse streams, creating a new harmony.”)
২. মহাত্মা গান্ধী এর মতে, “সত্যিকরি সংস্কৃতি হলো সকল ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যে সমন্বয় সাধন করা।” (“True culture lies in harmonizing all religions and traditions.”)
৩. ড. আহমদ শরীফ বলেন, “সংস্কৃতির সমন্বয়বাদীতা হলো বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গ্রহণযোগ্যতা।” (“Cultural syncretism is mutual respect and acceptance between cultures.”)
৪. ই.বি. টাইলর (সমাজবিজ্ঞানী) এর সংজ্ঞায়, “সংস্কৃতির সমন্বয় হলো বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উপাদানের মিশ্রণ যা নতুন ঐতিহ্য গড়ে তোলে।” (“Cultural synthesis is the blending of diverse elements to form new traditions.”)
৫. ক্লিফোর্ড গির্টজ (নৃতত্ত্ববিদ) বলেছেন, “সংস্কৃতির সমন্বয় হলো অর্থপূর্ণ প্রতীকগুলির পারস্পরিক আদান-প্রদান।” (“Cultural integration is the exchange of meaningful symbols.”)
৬. ইমাম আল-গাজ্জালী এর মতে, “সকল সংস্কৃতির মাঝে ভালোটি গ্রহণ করাই হলো প্রজ্ঞা।” (“Wisdom lies in adopting the best from all cultures.”)
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, সংস্কৃতির সমন্বয়বাদীতা হলো বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, গ্রহণযোগ্যতা ও মিশ্রণের মাধ্যমে নতুন ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সৃষ্টি করা।
শেষাংশ: সংস্কৃতির সমন্বয়বাদীতা শুধু বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেয় না, বরং এটি বিশ্বশান্তি ও সম্প্রীতির পথ সুগম করে। আজকের যুগে গ্লোবাল ভিলেজের ধারণায় এটি অপরিহার্য। বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সমন্বয় না থাকলে সমাজে বিভেদ ও সংঘাত বাড়তে পারে। তাই আমাদের উচিত সকল সংস্কৃতিকে সম্মান করা এবং তাদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা।
“সংস্কৃতির সমন্বয়বাদীতা হলো বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক মেলবন্ধন ও সহাবস্থান।”
২০২১ সালের ইউনেস্কোর রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের ৭৫% দেশই বহুসংস্কৃতিবাদ নীতিকে সমর্থন করে। ২০১৯ সালের গ্যালাপ জরিপে দেখা গেছে, ৬৮% মানুষ বিশ্বাস করে যে সংস্কৃতির সমন্বয় শান্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে। ভারতে ১৯৪৭ সালে ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি গ্রহণের মাধ্যমে সংস্কৃতির সমন্বয়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর বহুসংস্কৃতির সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির মাধ্যমে এই ধারণাকে শক্তিশালী করছে।

