- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: সংস্কৃতি হলো মানুষের জীবনযাত্রার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা গোষ্ঠীর পরিচয় বহন করে। সংস্কৃতি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়। আমাদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ, প্রথা, ভাষা, শিল্পকলা এবং জীবনধারণের পদ্ধতি—সবকিছুই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। সংস্কৃতিকে বুঝতে হলে এর গভীরতা এবং বিস্তৃত পরিসর সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।
শাব্দিক অর্থ: সংস্কৃতি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ভাষা থেকে, যার মূল অর্থ ‘সংস্কার’ বা ‘উন্নত করা’। সাধারণত, এর মাধ্যমে কোনো কিছুর পরিচর্যা বা শুদ্ধিকরণ বোঝানো হয়।
সংস্কৃতি বলতে মানুষের আচার-আচরণ, বিশ্বাস, জ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, নৈতিকতা, আইন এবং সমাজের একজন সদস্য হিসেবে অর্জিত সকল যোগ্যতা ও অভ্যাসের সমষ্টিকে বোঝানো হয়। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যা মানুষের সামাজিক জীবনকে পরিচালিত করে এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে একতা ও পরিচিতি গড়ে তোলে। সংস্কৃতি হলো মানুষের তৈরি জীবনযাত্রা, যা তাদের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।
বিভিন্ন গবেষক ও মনীষী সংস্কৃতিকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাদের মধ্যে যারা সংজ্ঞা দিয়েছেন, তাদের কিছু উল্লেখ করা হলো:
১। অগবার্ন (Ogburn): অগবার্ন সংস্কৃতিকে দুটি ভাগে বিভক্ত করেছেন—বস্তুগত সংস্কৃতি (Material Culture) এবং অবস্তুগত সংস্কৃতি (Non-material Culture)। তিনি বলেন, সংস্কৃতি হলো সমাজের সব বস্তুগত ও অবস্তুগত উপাদানের সমষ্টি।
২। নিমকফ (Nimkoff): নিমকফ সংস্কৃতিকে মানুষের তৈরি সকল কিছুর সমষ্টি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাঁর মতে, মানুষের বুদ্ধি, জ্ঞান এবং শ্রমের ফল হিসেবে যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে, তাই সংস্কৃতি।
৩। স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন (Samuel P. Huntington): হান্টিংটন সংস্কৃতির ওপর তার বিখ্যাত গ্রন্থ “The Clash of Civilizations”-এ উল্লেখ করেছেন যে, সংস্কৃতি হলো মানব সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি এবং এটি বিভিন্ন জাতির মধ্যে সংঘাত ও সহযোগিতার অন্যতম প্রধান কারণ।
৪। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary): অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুসারে, সংস্কৃতি হলো কোনো বিশেষ সমাজ বা গোষ্ঠীর জীবনধারণের পদ্ধতি ও চিন্তাভাবনা, যা তাদের শিল্পকলা, প্রথা, প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক আচরণে প্রতিফলিত হয়।
৫। কার্ল মার্কস (Karl Marx): কার্ল মার্কস সংস্কৃতির অর্থনৈতিক ভিত্তি তুলে ধরেছেন। তার মতে, সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হলো সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক কাঠামো। এটি সমাজের উচ্চশ্রেণির মানুষের চিন্তাভাবনা ও ক্ষমতাকে প্রতিফলিত করে।
৬। এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim): ডুর্খেইম সমাজতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে সংস্কৃতির সংজ্ঞা দিয়েছেন। তার মতে, সংস্কৃতি হলো একটি সমাজের ‘সম্মিলিত চেতনা’ বা collective consciousness।
৭। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber): ম্যাক্স ওয়েবার সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্ম এবং সামাজিক পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধ কীভাবে সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে।
৮। উড্র উইলসন (Woodrow Wilson): উড্র উইলসন বলেছেন যে, সংস্কৃতি হলো একটি জাতির রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার প্রতিফলন। এটি সমাজের মূল্যবোধ এবং নৈতিকতাকে রূপ দেয়।
১। স্যার এডওয়ার্ড বি. টেইলর (Sir Edward B. Tylor): “সংস্কৃতি বা সভ্যতা হলো সেই জটিল সামগ্রিকতা, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্প, নৈতিকতা, আইন, প্রথা এবং সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষের অর্জিত অন্যান্য সকল যোগ্যতা ও অভ্যাস।” (Culture or civilization is that complex whole which includes knowledge, belief, art, morals, law, custom, and any other capabilities and habits acquired by man as a member of society.)
২। কার্ল মার্কস (Karl Marx): “মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সামাজিক সম্পর্ক এবং চেতনা হলো সংস্কৃতি।” (Culture is the social relations and consciousness that are built upon man’s economic activities.)
৩। এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim): “সংস্কৃতি হলো এমন একটি যৌথ চেতনা বা Collective Consciousness, যা সমাজের সদস্যদের মধ্যে একতা তৈরি করে।” (Culture is a collective consciousness that creates unity among members of a society.)
৪। অগবার্ন (Ogburn): “সংস্কৃতি হলো সামাজিক ও পরিবেশগত উপাদানগুলোর সমষ্টি, যা মানুষের জীবনধারাকে প্রভাবিত করে।” (Culture is the totality of social and environmental elements that influence human life.)
৫। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary): “কোনো বিশেষ সমাজ বা গোষ্ঠীর জীবনধারণের পদ্ধতি ও চিন্তাভাবনা, যা তাদের শিল্পকলা, প্রথা, প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক আচরণে প্রতিফলিত হয়।” (The customs, arts, social institutions, and achievements of a particular nation, people, or other social group.)
৬। হ্যারল্ড জে. লাস্কি (Harold J. Laski): “সংস্কৃতি হলো মানুষের সেই ক্ষমতা যা প্রকৃতিকে রূপান্তরিত করে তাকে নিজের প্রয়োজনে কাজে লাগায়।” (Culture is man’s ability to transform nature and put it to his own use.)
৭। ডোয়াইট ওয়াল্ডো (Dwight Waldo): “সংস্কৃতি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সমাজের মূল্যবোধ, ঐতিহ্য এবং জ্ঞান এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয়।” (Culture is the process by which the values, traditions, and knowledge of a given society are transmitted from one generation to another.)
উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলির আলোকে বলা যায়, সংস্কৃতি হলো মানুষের সৃষ্ট এক জীবনব্যবস্থা, যা তাদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ, প্রথা, জ্ঞান, শিল্প ও প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এটি একটি সমাজের বস্তুগত ও অবস্তুগত সকল উপাদানের সমষ্টি, যা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং তাদের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াকে পরিচালিত করে। সংস্কৃতি হলো একটি জাতির সম্মিলিত চেতনা এবং পরিচয়, যা তাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে সংযুক্ত করে।
উপসংহার: সংস্কৃতি কেবল অতীত প্রথা বা ঐতিহ্যের সমষ্টি নয়, এটি একটি জীবন্ত ও গতিশীল প্রক্রিয়া। সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতিরও পরিবর্তন ঘটে। এর মাধ্যমেই মানুষ তার নিজস্ব পরিচয় খুঁজে পায় এবং অন্যদের থেকে আলাদা হয়। সংস্কৃতি আমাদের মানবিকতাকে প্রতিফলিত করে এবং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন জাতিকে একত্রিত করে। এটি আমাদের জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলে এবং নতুন প্রজন্মের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করে।
সংস্কৃতি হলো মানুষের তৈরি জীবনযাত্রা, যা তাদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং প্রথা দ্বারা পরিচালিত হয়।
১৯৫০ সালে প্রকাশিত একটি UNESCO জরিপ অনুসারে, বিশ্বে প্রায় ৪,০০০ এর বেশি ভাষা প্রচলিত আছে, যার অধিকাংশই বিভিন্ন সংস্কৃতির বাহক। ২০১৮ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বেড়েছে, যা বিশ্বায়নের ফলে বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে মিথস্ক্রিয়া বৃদ্ধির প্রমাণ। ২০২৫ সালে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং সংরক্ষণের হার ৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে।

